হযরত দাউদ (আ.)-এর কান্না

0
122

আমাদের পূর্ববর্তীকালের লোকেরা ছিলেন অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। আল্লাহর নবীরা নিজের সন্তানের মৃত্যুতে কান্নাকে নবুওতের মর্যাদা পরিপন্থী মনে করতেন না। হযরত দাউদ (আ.) আল্লাহর দরবারে অঝোর ধারায় কাঁদতেন। তিনি বলতেন, আমার মাথা অশ্র“তে পরিপূর্ণ এবং আমার চোখ অশ্র“র ফোয়ারা।

বুযুর্গদের বক্তব্য

একজন বুযুর্গ বলেছেন, অবশ্যই আমাদের কান্নার অনুমতি রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কান্না পছন্দ করেন এবং খিলখিল করে হাসি অপছন্দ করেন। রসূল (স.)-এর সন্তানের মৃত্যুর পর তিনি কাঁদছিলেন। তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, দুঃখ কষ্টের সময় চোখের অশ্র“ প্রবাহিত হওয়া একটি স্বাভাবিক ব্যাপার।

স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর

কান্না চেপে রাখা স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর । এক মহিলা তার স্বামীর মৃত্যুর পরও কাঁদেনি। সেই স্বামীর সংগে ছয় বছর দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছে। এ সময়ে স্বামীর সংগে আনন্দেই কাটিয়েছিলো। তিন সন্তানের মা হলেও মহিলা ছিলো তখনো যৌবনবতী। স্বামীর সংগে তার দাম্পত্য জীবন কেটেছে প্রেম ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে। এ রকম ভালোবাসাপূর্ণ দাম্পত্য জীবনের উদাহরণ কমই পাওয়া যাবে। কিন্তু স্বামীর হঠাৎ মৃত্যুতে শোকে মহিলা পাথর হয়ে গেলো। সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় তার ছিলো দিশাহারা অবস্থা। এই শোক মহিলা ধৈর্যের সংগে সহ্য করছিলো। তিন মাস কেটে যাওয়ার পর আমি তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করলাম। মহিলা মানসিক কষ্টে যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছিলো। তার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। শোকে দুঃখে কষ্টে চোখের অশ্র“ প্রবাহিত করা আল্লাহর একটি নেয়ামত। এই মহিলা আল্লাহর সেই নেয়ামত থেকে নিজেকে এ কারণেই বঞ্চিত রাখলো যে, কান্নাকে সমাজের মানুষ ভালো চোখে দেখে না। কান্নাকে মানুষ মনে করে লজ্জাজনক কাজ। সমাজের এই রুসম রেওয়ায মানতে গিয়ে মহিলা নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলো। এর কুফল সেই মহিলাকে ভোগ করতে হয়েছিলো।

আমার এক বন্ধুর কাহিনী

কান্না সবার কাছে পছন্দনীয় নয়। এ কারণে আমার এক বন্ধু তার পনের বছর বয়স্কা কন্যার মৃত্যুতে একটুও কাঁদেনি। সে বিশ্বাসই করতে চায়নি যে, তার কন্যার মৃত্যু হয়েছে। তার হিতাকাক্সরাী তাকে কাঁদতে দিতে সবাইকে নিষেধ করেছিলো। মেয়ের লাশ কবরে নামানোর সময় তাকে মেয়ের মুখ দেখতে দেয়া হয়নি। আশংকা ছিলো মেয়ের চেহারা দেখে সে কাঁদতে শুরু করবে। আমার বন্ধুর হিতাকাঙ্ক্ষীরা তাকে সব সময় হাসি খুশী রাখতে চেয়েছিলো।

এর ফল কি হয়েছিলো? আমার বন্ধু তার মৃত কন্যার কটি ঠিক সেভাবে সাজিয়ে রেখেছিলো, যেভাবে মেয়েটি জীবদ্দশায় তার ক সাজিয়ে রাখতো।

সামাজিক দুরবস্থা

কান্নার ফলে মনের আগুন নিভে যায়, কান্না মনে শান্তি আনে। আমাদের সমাজে একটা প্রবণতা হচ্ছে যে, মানুষ কাউকে কাঁদতে দিতে চায় না। তারা চায় সবাই সব সময় খিলখিল করে হাসুক। কিন্তু তারা চিন্তা করে দেখে না যে, বেশী হাসলে মন মরে যায় অথচ কান্না মনের কলুষ কালিমা দূর করে মনকে সজীব করে তোলে। মানুষ দুঃখ কষ্টের সময় কাঁদবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষের স্বাভাবিক এই প্রবণতা রোধ করা কি বুদ্ধিমানের কাজ। চোখের গরম অশ্র“ ভালোবাসা এবং আবেগের প্রকাশ ঘটায়। আবেগের গলা টিপে হত্যা করার অবস্থা দেখে বলতে হয় সেই প্রাচীন প্রবাদ বাক্য। সেই বাক্যে বলা হয়েছে যে, দাঁড়ানোর চেয়ে বসা ভালো। বসার চেয়ে শুয়ে থাকা ভালো। স্বাভাবিক কান্নায় মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। আনন্দের সময় মানুষ যে কাঁদে, সেই কান্নাও স্বাভাবিক। আনন্দে মানুষ যখন কাঁদে তখন তার চেহারা খুশীতে ঝলমল করে। অশ্র“ হচ্ছে ভালোবাসার দর্পণ।

আল-কোরান একাডেমী পাবলিকেন্স

“সুন্নতে নববি ও আধুনিক বিজ্ঞান”(২য় খণ্ড)- বই থেকে নেওয়া ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY