মেসওয়াক এবং আধুনিক বিজ্ঞান

0
271

 

স্বভাব বা ফেতরাত কখনো মানুষের প্রতিকূলে যায় না। এই স্বভাব বা ফেতরাত পথভ্রষ্ট মানুষকে দুনিয়ার আরাম আয়েশ থেকে এক সময় ফিরিয়ে আনে। বিভিন্ন ধরনের ধোঁকা প্রতারণার কারণে এদিক সেদিক গেলেও আবার স্বভাব বা প্রকৃতির কাছেই তারা ফিরে আসে। মেসওয়াকের উদাহরণ ঠিক একই রকমের। কেননা, মেসওয়াক শুরু থেকেই শেষ পর্যন্ত মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্যে সহায়ক হয়ে থাকবে।
এই নেয়ামত যখন থেকে আমরা হাতছাড়া করেছি তখন থেকেই মানুষ উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। হাজার হাজার টাকা ব্যয় করছে। তবুও তার স্বাস্থ্য প্রকৃত অবস্থায় ফিরে আসছে না। একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যেদিন থেকে আমরা মেসওয়াক ত্যাগ করেছি সেদিন থেকেই দাঁতের ডাক্তার বা ডেন্টাল সার্জনের উৎপত্তি হয়েছে।
আসুন আমরা পর্যালোচনা করে দেখবো সুন্নত প্রতিটি মানুষের স্বভাবসম্মত কি না। এ সুন্নত কি আমাদের উন্নতি অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করে? এ সুন্নত আমাদের প্রস্তর যুগের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না উন্নতি অগ্রগতির স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিচ্ছে?
এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব আপনাদের ওপর ন্যস্ত। আপনারা চিন্তা করুন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
মেসওয়াক
মহানবী (স.) রাতে উঠে মেসওয়াক করতেন। (যাদুল মায়া’দ)
মহানবী (স.)-এর অভ্যাস ছিলো, তিনি রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে মেসওয়াক করতেন। (যাদুল মায়া’দ)
ইঞ্জিনিয়ার নকশবন্দী তাঁর ওয়াযে বলেছেন, ‘আমেরিকার ওয়াশিংটনে একজন ডাক্তার আমাকে বলেছেন, রাতে ঘুমাবার সময় মেসওয়াক করে ঘুমাবেন। আমি জানতে চাইলাম, কেন? ডাক্তার বললেন, আধুনিক চিকিৎসায় বলা হয়েছে, মানুষ যা কিছু খায় সেসব মুখের ভেতর প্লাজমা হয়ে থাকে। সেই প্লাজমা শুধু কুলি করলে পরিষ্কার হয় না। সাধারণতঃ রাতে ঘুমের মধ্যেই দাঁত খারাপের যতো অসুখ দেখা দেয়। কারণ মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন মুখ বন্ধ থাকে। মুখের নড়াচড়া বন্ধ থাকে। দিনের বেলায় মানুষ কথা বলে, খাবার খায় পানীয় পান করে কিন্তু রাতে মুখ বন্ধ থাকে। এ কারণে এ সময় প্লাজমা মুখের ভেতর কাজ করার সুযোগ পায়। তাই দাঁতের অসুখ অধিকাংশই রাতে দেখা দেয়। সকালে দাঁত সাফ করতেও পারেন, না-ও করতে পারেন, কিন্তু রাতে ঘুমুতে যাওয়ার সময় অবশ্যই মেসওয়াক করবেন।
ডাক্তারের কথা শুনে আমি বললাম, সকল প্রশংসা আল্লাহর। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার সময় মেসওয়াক করা আমাদের নবীর সুন্নত। তিনি মেসওয়াক না করে কখনো ওযু করতেন না। মানুষ যে কোনো খাবারই গ্রহণ করুক ওযু করার সময় যেন মেসওয়াক করে। এতে সে দাঁতের সমূহ তি থেকে রেহাই পাবে। মহানবী (স.) সব সময়ই খাওয়া দাওয়ার পর কুলি করতেন। অথচ বর্তমানে দেখা যায়, মানুষ খাবার খেয়ে এমনিতেই উঠে যায়। অথচ সে মিষ্টি খাবার খেলে তার কুলি না করার কারণে সে মিষ্টির প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, কিন্তু খাবার খাওয়ার পরপরই কুলি করার অভ্যাস হয়ে গেলে যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়। তাছাড়া দিনে পাঁচবার ওযু করার সময় মুখ পরিষ্কার করা হয়। কেননা ওযুর সময়ে হাত মুখ পা ইত্যাদি অংগ প্রত্যংগ পরিষ্কার হয়ে যায়।
নামাযের আগে মেসওয়াক
সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করার আগে মুখ পরিষ্কার করা অবশ্য কর্তব্য। কেননা খাদ্য গ্রহণের পর মেসওয়াক না করে ওযু করা হলে কিছু না কিছু খাদ্যকণা দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকাটা স্বাভাবিক। এ কারণে মুখে তখনো খাদ্যের স্বাদ অনুভূত হয়। ফলে অনেক সময় নামাযের একাগ্রতা বিনষ্ট হয়।
নামাযী ব্যক্তির মুখে যদি দুর্গন্ধ থাকে তবে অন্যরা তাকে ঘৃণা করবে। তাছাড়া একজনের মুখের দুর্গন্ধের কারণে অন্য নামাযীদের কষ্ট হবে। কাজেই নামাযীদের উচিত নামাযের পূর্বে মেসওয়াক করার মাধ্যমে মুখের দুর্গন্ধ দূর করা। তাছাড়া মেসওয়াক করলে মুখে এমন লহরী সৃষ্টি হয় যাতে কোরআন তেলাওয়াত ও তসবীহ পাঠে মজা পাওয়া যায়।
নামাযের সময় একজন বান্দাকে সরাসরি সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হয়। আর এ সময় যদি তার মুখ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকে তবে তো এটা খুবই লজ্জার কথা।
মেসওয়াক, চিকিৎসক ও সুইজারল্যান্ডের একটি ঘটনা
আমার বন্ধু মনসুর সাহেব একজন সৎ ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘একবার সুইজারল্যান্ড সফরের সময় একজন নওমুসলিমের সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। তাকে আমি একটি মেসওয়াক দিলাম। সে মেসওয়াকটি তার চোখে ছোঁয়ালো এবং তার চোখ অশ্র“সজল হয়ে উঠলো। তারপর সে পকেট থেকে রুমালে জড়ানো একটি ছোটো মেসওয়াক বের করলো। সাইজে পাঁচ ইঞ্চির চেয়েও ছোটো সেই মেসওয়াক দেখিয়ে সে বললো, ‘আমার ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানরা উপহার স্বরূপ আমাকে এ মেসওয়াকটি দিয়েছিলো। আমি যতœ সহকারে এটি ব্যবহার করি। য়ে গিয়ে ছোটো হয়ে গেছে। আপনি এ মেসওয়াক দিয়ে আমার বিশেষ উপকার করেছেন।’
তারপর সেই নওমুসলিম বললো, ‘ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমি দাঁত এবং মাঢ়ির এতো কঠিন রোগে আক্রান্ত ছিলাম যে, ডাক্তাররা চিকিৎসা করতে পারছিলেন না। ইসলাম গ্রহণের পর আমি মেসওয়াক ব্যবহার করতে শুরু করলাম। কিছুদিন পর ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার আমার দাঁত এবং দাঁতের মাঢ়ি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। জানতে চাইলেন, আমি কী ওষুধ ব্যবহার করেছি যার ফলে এতো তাড়াতাড়ি আমার দাঁত এবং মাঢ়ির রোগ দূর হয়ে গেছে। আমি বললাম, আপনার দেয়া ওষুধ ব্যবহার করার ফলেই সুস্থ হয়েছি। তিনি বিশ্বাস করলেন না। বললেন, আমি জানি আমার দেয়া ওষুধে এতো তাড়াতাড়ি আপনার রোগ ভালো হতে পারে না। তারপর আমি তাঁকে মেসওয়াক ব্যবহারের কথা জানালাম এবং মেসওয়াক দেখালাম। ডাক্তার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি তারপর মেসওয়াক নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন।
মেসওয়াকের প্রতি গুরু নানকের গুরুত্বারোপ
গুরু নানক সম্পর্কে জনশ্র“তি রয়েছে, তিনি হাতে মেসওয়াক রাখতেন এবং মাঝে মাঝে মেসওয়াক করতেন। তিনি বলতেন, হয়তো এই গাছের ডাল অর্থাৎ মেসওয়াক গ্রহণ করো অথবা রোগ গ্রহণ করো।
কী গভীর তত্ত্বকথা। কারণ তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, মেসওয়াক যদি না করা হয় তবে অবধারিতভাবে দাঁতের অসুখে কষ্ট পেতে হবে।
মেসওয়াক এবং মুখের দুর্গন্ধ
এক লোক মুখের দুর্গন্ধ দূর করার জন্যে উন্নতমানের টুথপেষ্ট ব্যবহার করেছিলেন, অনেক ধরনের এ্যান্টিসেপ্টিক ওষুধও ব্যবহার করেছেন, কিন্তু কোনো উপকার পাননি। অনেক দিন পর দেখা গেলো, তিনি লোকদের পিলুর মেসওয়াক ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ তিনি কোনো এক বন্ধুর পরামর্শে এর মেসওয়াক ব্যবহার শুরু করেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় এতেই তিনি সুস্থ হয়ে যান। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, ব্যবহার করা অংশ প্রতিদিন কেটে ফেলে নতুন আঁশ ব্যবহার করতে। কারণ এরকম না করা হলে প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া নাও যেতে পারে।
হৃৎপিন্ডে পুঁজ এবং মেসওয়াক
হাকীম এস এম ইকবাল সাপ্তাহিক ‘আখবারে জাহান’ পত্রিকায় লিখেছেন, আমার কাছে এ রকম একজন রোগী এসেছিলো যার হৃৎপিন্ডের কোষে পুঁজ জমে ছিলো। নানারকমের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেও তার সেই গুরুতর রোগ ভালো হয়নি। অপারেশন করে পুঁজ বের করে ফেলার পর দেখা গেলো পুনরায় পুঁজ জমে গেছে। আমি নানা কথা জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, তার দাঁতের মাঢ়ি খারাপ এবং মাঢ়িতে পুঁজ জমে গেছে। সেই পুঁজের প্রভাব পড়েছে হৃৎপিন্ডে। অন্য চিকিৎসকরাও একথা জানার পর রোগের প্রকৃত উৎস সম্বন্ধে একমত পোষণ করলেন। আমি তাকে দাঁতের মাঢ়িতে ব্যবহার করার জন্যে কিছু ওষুধ দিয়ে পিলুর মেসওয়াক ব্যবহার করার পরামর্শ দিলাম। অল্প কিছুদিন পর জানা গেলো রোগী আরোগ্য লাভ করেছে।
দন্তরোগ ও দশ হাজার দেরহাম
সউদী আরব থেকে একজন রোগী লিখেছেন, দীর্ঘদিন যাবত আমি দাঁতের অসুখে কষ্ট পাচ্ছি। এ যাবত দশ হাজার দেরহাম ব্যয় করেছি, কিন্তু কোনো সুফল পাইনি। আমি এ রোগীর চিঠির জবাবে লিখেছি, আপনি পিলুর মেসওয়াক ব্যবহার করুন। দুইমাস যাবত পাঁচওয়াক্ত নামাযের আগে পাঁচবার এবং তাহাজ্জুদ নামাযের আগে একবার এবং অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করবেন না। আল্লাহর রহমতে এ ব্যবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করার ফলে রোগী সুস্থ হয়ে গেছে।
মুখের স্বাদ এবং মেসওয়াক
এক লোক কিছু খেয়ে কোনো স্বাদ পেতো না। তার জিহ্বার স্বাদ অনুভব শক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। অনেক চিকিৎসা করেও কোনো ফল পায়নি। এক ব্যক্তি তাকে পরামর্শ দেয়, জিহ্বায় জোঁক রাখুন, তাহলে স্বাদ ফিরে আসবে। তিনি এ ব্যবস্থাও নিয়েছেন, কিন্তু তবু কিছু হয়নি। আমি তাকে একমাস যাবত পিলুর তাজা মেসওয়াক ব্যবহার করার পরামর্শ দিলাম। একমাস পর তিনি সুস্থ হয়ে আমাকে জানালেন, এতো রকম ওষুধ ব্যবহারেও বিন্দুমাত্র উপকার পাইনি, অথচ এক টাকার পিলুর মেসওয়াকে রোগ মুক্ত হয়েছি। আমার জিহ্বার স্বাদ ফিরে পেয়েছি।
মেসওয়াক ও গলা
টনসিলের রোগীদের নিয়মিত মেসওয়াক ব্যবহার করানো হলে তারা খুব শীঘ্র রোগমুক্ত হয়ে যায়।
গলগন্ড রোগে কষ্ট পাওয়া একজন রোগীকে তুতের শরবত পান করতে এবং পিলুর (এক প্রকার গাছের ডাল) তাজা মেসওয়াক ব্যবহার করতে বলা হলো। মেসওয়াক কেটে টুকরো করে গরম পানিতে সিদ্ধ করে গরগরা করানো হলো। অল্পদিনের মধ্যে গলগন্ড রোগ থেকে রোগী মুক্তি লাভ করলো।
একটি বিস্ময়কর ঘটনা
এক ব্যক্তির ঘাড়ে ও গলায় ব্যথা ছিলো এবং তার কণ্ঠস্বর বসে গিয়েছিলো। ধীরে ধীরে তার স্মৃতিশক্তিরও হ্রাস ঘটছিলো। মাথা ঘুরছিলো। ব্রেইন স্পেশালিস্ট এবং জেনারেল ফিজিশিয়ানকে দিয়ে চিকিৎসা করানো হলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। এরপর রোগীকে মেসওয়াক কেটে গরম পানিতে সিদ্ধ করে গরগরা করানো হলো এবং পিলুর মেসওয়াক ব্যবহার করতে দেয়া হলো। গলদেশের নীচে ওষুধের প্রলেপ দেয়া হলো। অল্পদিনের মধ্যে রোগী আরোগ্য লাভ করলো।
প্রকৃতপে এই রোগীর থাইরয়েড গ্লান্ডে ইনফেকশন হয়েছিলো। এতে তার সারাদেহ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আমি যে ব্যবস্থা দিয়েছিলাম তাতে রোগী অল্পদিনের মধ্যে সেরে ওঠে।
মেসওয়াক ও মুখের ফোস্কা
গরম এবং ফোস্কার কারণে অনেকের মুখে ফোস্কা পড়ে এবং বিশেষ ধরনের রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। এরকম রোগ দেখা দিলে নিয়মিত মেসওয়াক করতে হবে এবং মেসওয়াকের সময় নিসৃত লালা জিহ্বা দিয়ে ভেতরের ত্বকে ঘষতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় অল্পদিনের মধ্যেই রোগী আরোগ্য লাভ করে।
মেসওয়াক ও দাঁতের হলদে ভাব
অনেকে অভিযোগ করেন, তাদের দাঁত হলুদ হয়ে যায় এবং দাঁতের (হোয়াইটনেস) সাদা ভাব দূর হয়ে যায়। তারা জেনে নিন, মেসওয়াকের নতুন নতুন আঁশ দাঁতের হলদে ভাব দূরীকরণে ফলদায়ক।
মেসওয়াক ও জীবাণু
মেসওয়াক হলো একটি উন্নতমানের এন্টিসেপটিক। মেসওয়াক ব্যবহার করলে মুখের ভেতরের রোগজীবাণু হত্যা করে। যাতে নামাযী ব্যক্তি অসংখ্য রোগ থেকে সুরতি থাকে। এমনকি কিছু কিছু রোগজীবাণু মেসওয়াক এবং মেসওয়াকের মধ্যে থাকা এন্টিসেপটিক উপাদানের কারণে মরে যায়।
মেসওয়াক ও মস্তিষ্ক
হযরত আলী (রা.) বলেছেন, মেসওয়াক করার ফলে মস্তিষ্ক সজীব সতেজ হয়। প্রকৃতপে মেসওয়াকের মধ্যে ফসফরাস থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে মাটিতে ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস বেশী থাকে সেখানে পিলু গাছ বেশী বেশী জন্মে। কবরস্থানে মুর্দাদের হাড় গলে যাওয়ার কারণে সেখানকার মাটিতে ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস বেশী থাকে। এ কারণে কবরস্থানে পিলু গাছ বেশী জন্মে। দাঁতের জন্যে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস বিশেষ উপকারী। পিলু গাছের শেকড়ের মধ্যে এ উপাদান অধিক পরিমাণে থাকে। অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে, পিলুর মেসওয়াক তাজা অবস্থায় চিবানো হলে তার মধ্যে থেকে এক রকমের তিক্ত এবং ভেজাল রস বের হয়। এ উপাদান মেসওয়াকের মাঝে রোগজীবাণুর উৎপাদন বন্ধ করে এবং দাঁতকে রোগ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। কাজেই পিলুর মেসওয়াকের আঁশ কাটতে থাকবে, তাহলে নতুন আঁশ ব্যবহৃত হবে এবং তেতো উপাদান ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্যে উপকারী হবে।
কানির, বাবুল এবং নিম গাছের মেসওয়াক
বাবুল গাছ এবং নিমগাছের উপকারিতা ও কল্যাণকারিতা সম্পর্কে অবগত নয় এমন কেউ নেই। কিন্তু আমি এখানে কানির গাছের মেসওয়াকের আলোচনা করবো। কানির দু’রকমের হয়ে থাকে। এর একটার ফুল লাল এবং আরেকটার ফুল সাদা। এ গাছ সাধারণত পার্কে এবং বাগবাগিচায় পাওয়া যায়। বাগানের মালী থেকে জেনে নিয়ে এ মেসওয়াক সংগ্রহ করা যেতে পারে।
এক ভদ্রলোক দাঁতের চিকিৎসায় দশ হাজার দেরহাম ব্যয় করেছেন। ইনি আরব দেশে থাকেন। অবশেষে তাঁকে কানির এবং পিলু গাছের মেসওয়াক ব্যবহার করানো হলে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যান। সম্মানিত চিকিৎসকগণ এবং এ অধম পাইওনিয়ার রোগীদের দীর্ঘকাল থেকে কানির গাছের মেসওয়াক ব্যবহার করাচ্ছি। এতে দুরারোগ্য রোগী সুস্থ হয়ে গেছে।
মেসওয়াক প্রথমে গ্লাসের পানিতে ভিজিয়ে রাখবেন। এরপর চিবিয়ে আঁশ বের করবেন এবং দাঁতের ওপর থেকে নীচে এবং নীচে থেকে ওপরে মেসওয়াক করবেন। কানির গাছের মেসওয়াক যদিও খুবই তেতো হয়, কিন্তু তা দাঁতের রোগের জন্যে খুবই উপকারী। এতে এমন সব উপাদান রয়েছে যা দাঁতকে সুদৃঢ়, চমকদার করে এবং এসব উপাদান পাইওরিয়ার-এর মত ধ্বংসকর রোগ প্রতিরোধে মহৌষধ।
দাঁত এবং মস্তিষ্ক
অপরিচ্ছন্ন, ময়লা এবং পুঁজযুক্ত দাঁত মস্তিষ্ক রোগের কারণ হয়। মানসিক রোগসমূহ যেমন উন্মাদনা, মস্তিষ্ক বিকৃতি এবং অন্যান্য ধ্বংসকর রোগসমূহ এসবের শামিল। এক ভদ্রলোকের স্ত্রীর মস্তিষ্কের সমস্যা ছিলো। জটিল পরীা নিরীার পর জানা যায়, তার মস্তিষ্কের পর্দার ওপর পুঁজ জমে গেছে এবং রোগিনী দীর্ঘদিন থেকে পাইওরিয়া রোগে ভুগছিলো। আর পাইওরিয়াজনিত পুঁজই তার মস্তিষ্ক রোগের কারণ হয়েছে। অনুরূপ পুঁজের প্রতিক্রিয়া অস্থিমজ্জা অথবা পিস্টুরি গ্ল্যান্ডের জন্যে ধ্বংসকর হয়।
দাঁত এবং কান
যাদের কান ফোলা, কানে পুুঁজ, খৈল এবং ব্যথা রয়েছে, এমন রোগীদের সম্পর্কে চিকিৎসকদের প্রত্য অভিজ্ঞতা হচ্ছে, অনেক চিকিৎসার পরও কিন্তু তা মোটেও ভালো হয়নি। গবেষণা ও পরীা নিরীার পর জানা গেছে, রোগীর মাঢ়িতে পুঁজ জমেছে। মাঢ়ির চিকিৎসা করা হলে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়।
দাঁত এবং দৃষ্টিশক্তি
দৃষ্টিশক্তি এবং চোখের রোগের সাথে দাঁতের রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দাঁতে পুঁজ হলে অথবা দাঁতের ফাঁকে খাদ্যকণা আটকে গিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত হলে চোখ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। তখন দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, অন্ধত্ব সৃষ্টি হয়। আজকাল দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতার যেখানে অনেকগুলো কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে একটি কারণ হচ্ছে, দাঁতের প্রতি উদাসীনতা অমনোযোগীতা। দাঁত যদি পরিষ্কারও করা হয় তবে তা করা হয় ব্রাশ দিয়ে। ব্রাশ দাঁতের জন্যে উপকারী না তিকর, সামনে সে সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করা হবে।
দাঁত ও পাকস্থলী
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সব অভিজ্ঞতা এবং গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, শতকরা আশিভাগ রোগ পাকস্থলী এবং দাঁতের রোগের কারণে হয়ে থাকে। পাকস্থলীর রোগ বর্তমানে বেশ ব্যাপকতা লাভ করেছে। দাঁতের মাঢ়িতে জমে থাকা পুঁজ খাদ্যদ্রব্যের সাথে বা মুখের লালার সাথে যখন পাকস্থলীতে পৌঁছে, তখন এ পুঁজই রোগ সৃষ্টি হয়। ভালো খাবারের ক্রিয়াও নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই পাকস্থলীর চিকিৎসার আগে দাঁতের সুস্থতার প্রতি বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। তাহলে পাকস্থলীর রোগের দ্রুত এবং স্বতন্ত্র চিকিৎসা সম্ভব।
দাঁত ও সমাজ
মানুষ যখন কোনো সামাজিক মজলিসে কথা বলে বা কোনো যানবাহনের যাত্রী হয়, তখন তার মুখে যদি দুর্গন্ধ থাকে তাহলে তা অন্যদের জন্যে বেশ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত জাহাজে আরোহী হলে তার শ্বাস প্রশ্বাস থেকে দুর্গন্ধ অনুভূত হয়। এরকম সহযাত্রীর যদি হাঁচি শুরু হয়ে যায়, তাহলে তো পুরো পরিবেশই দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়। সর্বাগ্রে দাঁতের প্রতি ল্য রাখতে হবে। কারণ দাঁতই অধিকাংশ দুর্গন্ধের কারণ হয়ে থাকে। নয় তো পাকস্থলীর চিকিৎসা করাতে হবে।
মোট কথা, দেহের সুস্থতার প্রয়োজনে দাঁতের সুস্থতা অত্যাবশ্যক। কেননা ভালো দাঁত ও সুস্থ দাঁত সবল জীবন নিশ্চিত করতে পারে। স্বাস্থ্য রার ব্যাপারে যারা উদাসীন তারা সফল জীবন যাপন করতে পারে না।
ব্রাশ ও মেসওয়াকের মধ্যে পার্থক্য
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়, দাঁতের পরিচ্ছন্নতা এবং সংরণের জন্যে ব্রাশ ব্যবহার আবশ্যক নাকি মেসওয়াকই ব্যবহার করতে হবে? প্রথমে আমি ব্রাশের কল্যাণকারিতা অথবা তি সম্পর্কে আলোচনা করবো।
ব্রাশ
জীবাণু বিশেষজ্ঞদের বছরের পর বছরের গবেষণায় একথা পূর্ণতার স্তরে উপনীত হয়েছে যে, যে ব্রাশ একবার ব্যবহার করা হয়, পুনরায় তা ব্যবহারে স্বাস্থ্যের তি হয়। কেননা, একবার ব্যবহারের পরই তা রোগ-জীবাণুর স্তর জমে যায়। তা পানি দ্বারা ধুয়ে ফেললেও ক্রিয়াশীল থাকে। তাছাড়া ব্রাশ ব্যবহার করা হলে দাঁতের ওপরের চমকদার সাদা স্তর নষ্ট হয়ে যায়। ফলে দাঁতের মাঝে ফাঁক তৈরী হয় এবং ধীরে ধীরে দাঁত মাঢ়ি থেকে আলাদা হয়ে যায়। দাঁতের ফাঁকে খাদ্যকণা আটকে গিয়ে মাঢ়ি এবং দাঁতের তির কারণ হয়।
মেসওয়াক
এমন প্রত্যেক গাছের মেসওয়াক দাঁতের জন্যে উপযোগী, যে গাছের আঁশ নরম। দাঁতের মাঝের ফাঁক বাড়ায় না এবং মাঢ়ি জখম করে না। তবে এর মধ্যে পিলু, নিম অথবা বাবুল গাছ এবং কানির গাছের মেসওয়াক দাঁতের জন্যে খুবই উপকারী।
পিলুর মেসওয়াক
মেসওয়াক মহানবী (স.)-এর সুন্নত। প্রত্যেক নামাযের আগে ওযুর সময় মেসওয়াক ব্যবহার করা দ্বীন ইসলামে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর অত্যাবশ্যক সুন্নত। পিলুর মেসওয়াকের উপকারিতা ল্য করলে দেখা যাবে তা নরম আঁশযুক্ত তাতে ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস থাকে। পাঞ্জাবের লবণাক্ত বিরানভূমিতে পিলুর গাছ পাওয়া যায়। ভূতাত্ত্বিকদর নবতর গবেষণায় প্রমাণিত হয়, মেসওয়াকের ফসফরাস এবং ক্যালসিয়াম লালার মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। ফলে মস্তিষ্ক শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
স্থায়ী সর্দি ও মেসওয়াক
যেসব রোগীর সর্দি লেগেই থাকে, মেসওয়াক ব্যবহার করলে তাদের সর্দি বেরিয়ে যায় এবং মগয হালকা হয়।
একজন প্যাথলজিস্ট বলেছেন, আমার অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে, স্থায়ী সর্দির রোগীর জন্যে মেসওয়াক বিশেষ ফলপ্রদ। মেসওয়াক ব্যবহার করা হলে এ রকম রোগীদের নাক এবং গলার অপারেশনের প্রয়োজন কমে যায়।
জীবনের অভিজ্ঞতার নির্যাস
হাসি মানুষের মনের প্রফুল্লতা এবং আনন্দ প্রকাশ করে, কিন্তু এ হাসিও মানুষের মনে ঘৃণার উদ্রেক করতে পারে। সুন্দর চেহারার, উত্তম চরিত্রের একজন মানুষের হাসিও দাঁতের কারণে অসুন্দর এবং নোংরা হতে পারে। অপরিষ্কার দাঁত যখন দুই ঠোটের ফাঁক দিয়ে প্রকাশ পায় তখন লজ্জার শেষ থাকে না।
স্বাস্থ্য রা এবং দীর্ঘজীবী হওয়ার জন্যে মানুষ জীবনের শুরু থেকেই চেষ্টা করে থাকে, কিন্তু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং স্পর্শকাতর অনুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তির দাঁতও যদি অপরিষ্কার থাকে তবে অস্বস্তির শেষ থাকে না। অপরিষ্কার দাঁত বহু রোগের বিস্তার ঘটায়, একথা অভিজ্ঞতায় এবং গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
দাঁতের জন্যে তৈরী করা মাজনে যদি কোনো ক্যামিক্যাল জাতীয় পাওয়ারফুল ওষুধের সংমিশ্রণ না করা হয় তাহলে সেই মাজন ব্যবহারেও উপকার পাওয়া যায়। তবে পিলু, নিম এবং কানির বৃরে শাখা ও শিকড় দিয়ে তৈরী মেসওয়াকে যে উপকার রয়েছে, অন্য কোনো কিছুর মধ্যে তা পাওয়া যায় না।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY