কয়েকটি পুরনো ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার

0
129

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বই জ্ঞানের প্রতিক। বই পড়ে মানুষ জ্ঞান আহরণ করে। বই’র ভান্ডার কে গ্রন্থাগার বলে। গ্রন্থাগারের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। খৃষ্টপূর্ব কালেও আমরা গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। তখন তো হাতের লেখার বই হতো। ধীরে ধীরে এক সময় প্রিন্ট মেশিন আবিষ্কার হলো। তখন থেকে প্রিন্ট করা বই এর  ভাণ্ডার তৈরী হতে থাকলো। এখন আমরা আরেকটু  এডভান্স হয়েছি। আমরা এখন কম্পিউটার সফ্টওয়্যারে তৈরী অনেক বড়ো বড়ো লাইব্রেরী বা গ্রন্থাগার দেখতে পাই। তাছাড়াও অনেক অনলাইন লাইব্রেরীও এখন ইন্টারনেটে দেখা যায়। আসুন! আমরা গ্রন্থাগারের জগতটা একটু ঘুরে আসি।

প্রাচীন আলেক্সান্দ্রিয়া লাইব্রেরী

প্রাচীন এ লাইব্রেরীটি কে প্রতিষ্ঠা করেন? এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মতবিরোধী রয়েছে। অনেকে বলেন যিনি এ শহরের গোড়াপত্তন করেন তিনিই অর্থাত্ আলেক্সান্ডার-ই খৃষ্টপূর্ব ২৮৫ সালে এই ‘আলেক্সান্দ্রিয়া লাইব্রেরী’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যা ইতিহাসে Royal Library of Alexandrea নামে পরিচিত। অনেকে বলেন, বিখ্যাত দার্শনিক প্রথম ‘বাতলীমূস’ বা প্রথম ‘টলেমী’ এ লাইব্রেরীটি প্রতিষ্ঠা করেন। আবার অনেকে বলেন— দ্বিতীয় ‘বাতলীমুস’এটা প্রতিষ্ঠা করেন। কেউ কেউ বলেন— প্রথম ‘বাতলীমুস’ গ্রন্থগারটি প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন, এর জন্য অর্থও প্রদান করেন, কিন্তু এটা পরিপূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন করেন— দ্বিতীয় ‘বাতলীমুস’। খৃষ্টপূর্ব ৪৮ সালে ‘ইউলিউস কায়সারে’র অগ্নি সংযোগ এ লাইব্রেরীটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

পিরগামিস্ লাইব্রেরী (Library of pergamum)

এটা প্রাচীনতম লাইব্রেরীগুলোর একটি। ‘পিরগামিস’ বা ‘পিরগামুন’ শহরে ‘হিলনাসিতি’ যুগের পূর্বে খৃষ্টপূর্ব ৩৯৭ সালে এ গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। ‘পিরগামিস’ শহরটি প্রাচীন রোমানিয়ার একটি গুরুত্বপ–র্ণ শহর ছিলো। যে ভূখন্ড বর্তমান তুর্কিস্তানের অন্তরর্ভুক্ত। কুসতুনতুনিয়া বা ইসতাম্বুলের পতনের পর এটা ওসমানী খেলাফতের অংশে পরিণত হয়। ‘পিরগামিস লাইব্রেরীতে’ প্রায় বিশ লাখ গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিলো। ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, এর বিশাল এক ভবন ছিলো। পড়ার জন্য আলাদা বড়ো কক্ষ ছিলো। এছাড়াও  আরো কিছু কক্ষ ভবনটির অন্তরর্ভুক্ত ছিলো।

আশুরবানীপল লাইব্রেরী

আশুরিয়া এম্পায়ারের সর্বশেষ রাজা বানীপলের নামে ‘আশুরবানীপল লাইব্রেরীর’ নামকরণ করা হয়েছে। এটা ইরাকে অবস্থিত। হাজার হাজার মাটির তৈরী তাকে রক্ষিত ছিলো অগণিত শিলালিপি। তাতে খৃষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর বিভিন্ন তথ্যভান্ডার অংকিত ছিলো।

সেলসুস লাইব্রেরী (Library of celsus)

সেলসুস লাইব্রেরীটি প্রাচীন রোমানিয়ায় অবস্থিত। বর্তমানে এটা তুর্কিস্তানের সালজুকের অন্তরর্ভুক্ত তত্কালীন রোমানীয়ান জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৩৫ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর প্রতিষ্ঠার পেছনে যাদের অবদান ছিলো, তারা হলেন তিবিরউস’ইউলিউস ও সেলসুস। এ লাইব্রেরীতে প্রায় বারো হাজার হাতের লেখা পান্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিলো। ২৬২ খৃষ্টাব্দে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে এ লাইব্রেরীটিও ধ্বংস হয়ে যায়।

ট্রাইনিটি কলেজ লাইব্রেরী (Trinity callege library)

ট্রাইনিটি কলেজ লাইব্রেরী আয়ারল্যান্ডের বৃহত্তম একটি পাবলিক লাইব্রেরী, এটা ৮০০ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

দারুল হিকমাহ বাগদাদ লাইব্রেরী

দারুল হিকমাহ লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদ (মৃ-১৯৩ হি.)। এটা শুধু একটি গ্রন্থাগারই ছিলো না; বরং এটাকে একটি গবেষণাগারও বলা চলে। এখানে অনুবাদ, সংকলন, রচনা এবং পড়াশুনার জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ ছিলো। বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতগণ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদানও করতেন। এটা বাদশাহ মামুনের আমলে আরো উন্নতি লাভ করে। ৬৫৬ হিজরীতে মঙ্গোলিয়ান মুঘল রাজার বাগদাদ আক্রমনে ঐতিহাসিক এ গবেষনাগারটি ধ্বংস হয়ে যায়। তারা এ গ্রন্থাগারের গ্রন্থসম–হ দাজলা ও ফুরাত নদীতে ফেলে দেয়। কথিত আছে, এসব গ্রন্থের কালিতে তিন দিন পর্যন্ত নদীর পানি কালো ছিলো। ধ্বংসাবশেষের সাথে চাপা পড়ে থাকা গ্রন্থগুলোতে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

দারুল ইলম লাইব্রেরী

ফাতেমী খেলাফতের বাদশাহ আমরুল্লাহ ইবনে আজিজ বিল্লাহ ৩৯৫ হিজরী মোতাবেক ১০০৫ খৃষ্টাব্দে এ গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এতে গ্রন্থের সংখ্যা ছিলো প্রায় এক লক্ষ। এখানে আগত পাঠকদের সুবিধার জন্য কালি, কলম, কাগজ ইত্যাদি পরিবেশন করা হতো। ইসলামী দুনিয়ায় এ গ্রন্থাগারটি অতীতের সকল গ্রন্থাগারের চেয়ে সার্বিকভাবে অতুলনীয় ছিলো। এখানে অনেক দুস্প্রাপ  গ্রন্থের একটা ভান্ডার ছিলো। তাছাড়া জ্ঞানের প্রায় সকল শাস্ত্রের বই কিতাব সংরক্ষিত ছিলো। বর্ণিত আছে এ গ্রন্থাগারে শুধু চিকিত্সা বিজ্ঞানেরই বই ছিলো প্রায় ছয় হাজার। অনেকগুলো নির্দেশনা সম্বলিত একটি বিশ্ব মানচিত্র অংকিত ছিলো। তাতে মহাদেশগুলোকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো। সাগর মহাসাগর কে আলাদা করে চিহ্নিত করা ছিলো। শহর নগর, নদী নালা, পাহাড় পর্বত ইত্যাদি চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছিলো। দারুল ইল্মও বাগদাদের দারুল হিকমতের মতো শুধু একটি গ্রন্থাগারই ছিলো না। পরিপূর্ণ একটি ইউনিভার্সিটি ছিলো। এ গ্রন্থাগারের আরেকটি নাম ছিলো ‘মাকতাবা দারিল হিকমাহ ফাতিমিয়া’। এটা সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর আমলে ধ্বংস হয়ে যায়। সেখানে আরেকটি ইসলামী বিদ্যাপিঠ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

কর্ডোভা লাইব্রেরী

উমবী খেলাফতের আমীর আবদুর রহমান আন নাসির ইবনে হাকাম ২০৬ হিজরী মোতাবেক ৮২১ খৃষ্টাব্দে ঐতিহাসিক এ গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই গ্রন্থাগারের মাধ্যমে ইউরোপিয়ানরা ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ লাভ করে। আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইসলামী দুনিয়া থেকে এর জন্যে অসংখ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করেন। আমীর আবদুর রহমান ইবনে হাকাম স্পেনের কর্ডোভায় তার রাজ প্রাসাদের বিশাল চত্তরে এ গ্রন্থাগারের ভবন নির্মাণ করেন। এখানে অনুবাদ, রচনা ও গবেষণার জন্য সকল ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিলো। তত্কালীন বড়ো বড়ো জ্ঞানীজনদের মিলন মেলা ছিলো এ কর্ডোভা লাইব্রেরী। এটা মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 ব্রিটিশ লাইব্রেরী

এ লাইব্রেরীটি ১৭৫৩ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটা যুক্তরাজ্যের জাতীয় লাইব্রেরী। এ গ্রন্থাগারে প্রায় ১৫,৫০০,০০০ এর বেশী গ্রন্থ সংরক্ষিত আছে, প্রতি বছরই নতুন নতুন বই এতে যুক্ত হয়।

 আমেরিকান লাইব্রেরী অব কংগ্রেস

প্রেসিডেন্ট জন এ্যাডামস ১৮০০ খৃষ্টাব্দে এ গ্রন্থাগারটি স্থাপন করেন। এটা আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো একটি লাইব্রেরী। ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত এ লাইব্রেরীতে আছে বই, পান্ডুলিপি, মানচিত্র, এসবের মোট সংখ্যা ৩৩,০১২,৭৫০ টি।

রাশিয়ান স্টেট লাইব্রেরী

এ লাইব্রেরীটি ১৭৯৫ খৃষ্টাব্দে মস্কোতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটা রাশিয়ার সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম একটি গ্রন্থাগার। এর সংগ্রহে রয়েছে ১৪৭,৫০,০০০ এর চেয়ে বেশি বই।

মক্কা লাইব্রেরী

ইসলামের ইতিহাসে মক্কা লাইব্রেরী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইব্রেরী। এটা হেরেম শরীফে অবস্থিত। ১৬০ হিজরীতে আব্বাসী খলীফা আল মাহদী এটা প্রতিষ্ঠা করেন, এর সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় ৫০০,০০০। ৩৫০,০০০ টি শুধু গ্রন্থ ও পান্ডুলিপি রয়েছে।

মাকতাবায়ে শামেলা

এটি অনলাইন ভিত্তিক একটি ইসলামী লাইব্রেরী। এর সংগ্রহে লক্ষাধিক বই কিতাব রয়েছে। যা তাদের ওয়েবসাইডে গিয়ে পাঠ করা যায়। আবার আলাদা আলাদা কোনো বই কিতাব ডাউনলোড করেও নিজের ডিভাইসে সংরক্ষণ করা যায়, পড়া যায়। তাদের সাইডে ‘মাকতাবায়ে শামেলা’ নামে একটি সফটওয়্যারও রয়েছে। যাতে সর্বশেষ ভার্সনে প্রায় ১৬০০০ হাজার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বই কিতাব রয়েছে। সফ্টওয়্যারটি ফ্রী ডাউনলোড করা যায়। এদের ওয়েব ঠিকানা হলো— www.Shamela.ws

ইসলাম ওয়েব

এটি অনলাইন ভিত্তিক একটি ইসলামী লাইব্রেরী। এর সংগ্রহেও বিভিন্ন বিষয়ের লক্ষাধিক বই কিতাব ও প্রবন্ধমালা রয়েছে। যা পাঠ ও ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করা যায়। ইসলাম ওয়েবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ‘লাইব্রেরী সফ্টওয়্যার’ রয়েছে।

১. জাওয়ামিউল কালিম

২. মাওসুআতুত্ তাফাসীর ও উলুমিল কোরআন

৩. মাওসুআতু ফিকহিল ইসলামী

৪. মাওসুআতুল হাদীস

এ চারটি সফ্টওয়্যারই তাদের সাইট থেকে ডাউনলোড করা যায়। জাওয়ামিউল কালিমে ১৪০০ সহীহ হাদীসগ্রন্থ রয়েছে। তাদের ওয়েব ঠিকানা হলো— www.Islamweb.net

ইন্টারনেট আরকাইভ

এটা অনলাইন ভিত্তিক সাধারণ একটি লাইব্রেরী। মনে হয় অনলাইনের সবচেয়ে বিশাল লাইব্রেরী এটি। এখানে অডিও, ভিডিও, বই কিতাব, পান্ডুলিপি সবই সংরক্ষিত আছে। বিভিন্ন ভাষায় ইসলামী বইয়েরও বিশাল এক ভান্ডার এ লাইব্রেরীতে রয়েছে। এর ওয়েব ঠিকানা হলো— www.Internetarcive.org

——–

 

 

 

 

 

 

 

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY