আল্লাহর রসূলের আবির্ভাব পবিত্র জীবনের চল্লিশ বছর (রসূল (স.)-এর জন্ম)

0
150

 

আল্লাহর রসূলের আবির্ভাব

পবিত্র জীবনের চল্লিশ বছর

 

রসূল (স.)-এর জন্ম

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় বনী হাশেম বংশে ৯ই রবিউল আউয়াল সোমবার মোতাবেক ৫৭১ খৃস্টাব্দের ২ বা ২২ এপ্রিল জন্ম গ্রহণ করেন।(সীরাত বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ রসূল (স.)-এর জন্ম তরিখ ৯ই রবিউল আউয়াল বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। অনেক এ মতকে সঠিক এবং প্রবল মনে করেন। তবে আমাদের দেশে ১২ই রবিউল আউয়ালের অভিমতই সমধিক প্রচার ও প্রাধান্য পেয়েছে।) সে বছরই হাতীর যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। সে সময় পারস্য সম্রাট নওশেরওঁয়ার সিংহাসনে আরোহণের চল্লিশ বছর পূর্ণ হয়েছিলো। সাইয়েদ সোলায়মান নদবী, সালমান মনসুরপুরী এবং মোহাম্মদ পাশা ফালাকীর গবেষণার ফল এ রকমই।

ইবনে সা’দ-এর বর্ণনায় রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা বলেছেন, যখন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন তখন আমার দেহ থেকে একটি নূর বের হয়, সেই নূর দ্বারা শাম দেশের মহল উথ্বল হয়ে যায়। ইমাম আহমদ হযরত এরবায ইবনে ছারিয়া (রা.) থেকেও প্রায় এ ধরনেরই এক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।

কিছু কিছু রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে, রসূল (স.)-এর জন্মের সময় নবুয়তের পটভূমি হিসেবে কিছু ঘটনা প্রকাশ পেয়েছিলো। যেমন কেসরার রাজপ্রাসাদের চৌদ্দটি পিলার ধসে পড়েছিলো, অগ্নি উপাসকদের অগ্নিকুন্ড নিভে গিয়েছিলো। বোহায়রা পাদ্রীর কূপ শুকিয়ে গিয়েছিলো এবং তার গির্জা ভূমিসাৎ হয়ে পড়ে ছিলো। এটা বায়হাকীর বর্ণনা, কিন্তু মোহাম্মদ গাযালী এ বর্ণনা বিশুী বলে সমর্থন করেননি।

জন্মের পর তার মা দাদা আবদুল মোত্তালেবের কাছে পেথত্রের জন্মের সুসংবাদ পাঠন। এ খবর পেয়ে তিনি অত্যান্ত আনন্দিত মনে ঘরে আসেন এবং তাঁকে কাবা ঘরে নিয়ে গিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া ও শোকর আদায় করেন। এ সময় তিনি তাঁর নাম রাখেন মোহাম্মদ। এ নাম আরবে পরিচিত ছিলো না। এরপর আরবের নিয়ম অনুযায়ী সপ্তম দিনে খতনা করান।

মায়ের পর আবু লাহাবের দাসী সুওয়ায়বা প্রথম তাঁকে দুধ পান করান। এ সময় সুওয়ায়বার কোলের শিশুর নাম ছিলো মাছরুহ। রসূল (স.)-এর দুধপান করানোর আগে সুওয়ায়বা হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব, তার পরে আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদ মাখযুমীকেও দুধ পান করিয়েছিলেন।

বনী সা’দ গোত্রে

আরবের শহুরে নাগরিকদের রীতি ছিলো, তারা তাদের শিশুদের শহরের অসুখ বিসুখ থেকে দূরে রাখার জন্যে দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিত বেদুঈন নারীদের কাছে সমর্পণ করতেন। যাতে শিশুদের দেহ শক্তিশালী এবং পেশীগুলো মযবুত হয়ে গড়ে ওঠে। এর আরেক উদ্দেশ্য হলো, দোলনা থেকেই যেন তারা বিশুদ্ধ আরবী ভাষা শিখতে পারে। এ রীতি অনুযায়ী আবদুল মোত্তালেব ধাত্রীর খোঁজ করে তাঁর দেথহিত্রকে হালিমা বিনতে আবু যুওয়ায়বের হাতে তুলে দেন। হালিমা ছিলেন বনী সা’দ ইবনে বকর গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তার স্বামী ছিলেন হারেস ইবনে আবদুল ওযযা, ডাক নাম আবু কাবশা। তিনিও ছিলেন বনী সা’দ গোত্রেরই মানুষ।

দুগ্ধপান সম্পর্কের কারণে হারেসের সন্তানরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাই বোন ছিলো। তাদের নাম হলো- আবদুল্লাহ, ওনায়সা, হোযাফা বা জুযামা। হোযাফা বা জুযামার উপাধি ছিলো শাইমা এবং এ নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোলে নিতেন। হালিমার সন্তানদের ছাড়া রসূল (স.)-এর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোত্তালেবও হালিমার মাধ্যমে তাঁর দুধ ভাই ছিলেন। তাঁর চাচা হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবকেও দুধপান করানোর জন্যে বনু সা’দ গোত্রের এক মহিলার কাছে ন্যস্ত করা হয়েছিলো। হালিমার কাছে থাকার সময় এ মহিলাও একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুধ পান করিয়েছিলেন। এ দিক থেকে তিনি এবং হামযা উভয়ে দুই সূত্রে দুধ ভাই ছিলেনÑ সুওয়ায়বার সূত্রে এবং বনু সা’দ গোত্রের এ মহিলার সূত্রে।

দুধ পান করানোর সময় হযরত হালিমা নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতের এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন যাতে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বিস্তারিত বিবরণ তাঁর মুখেই শোনা যাক। ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে হযরত হালিমা বলেন, আমি আমার স্বামীর সাথে আমাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ বনী সা’দ গোত্রের কয়েকজন মহিলার সথে নিজেদের শহর ছেড়ে দুগ্ধপানকারী শিশুর তালাশে বের হই। সময়টা ছিলো দুর্ভিক্ষের, চারদিকে অভাব অনটন। ব্যাপক দুর্ভিক্ষ কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি। আমি সাদা রংয়ের একটি মাদী গাধার পিঠে সওয়ার ছিলাম। আমাদের কাছে একটি উটনীও ছিলো, কিন্তু সেটি থেকে এক ফোঁটা দুধও বের হতো না। ওই দিকে ক্ষুধার জ্বালায় দুধের শিশু ছটফট করতো। আমরা রাতভর ঘুমাতে পারতাম না। আমার বুকেও দুধ ছিলো না, উটনী ও নিজের বাচ্চা খাদ্য সরবরাহ করতে পারছিলাম না। বৃষ্টি এবং সচ্ছলতার অপেক্ষায় আমরা দিন কাটাচ্ছিলাম। মাদী গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় সেটি এতো ধীরে চলছিলো, যাতে কাফেলার সবাই বির৩ হয়ে যায়। যাক, অবশেষে যে কোনোভাবে হোক, আমরা দুীপায়ী শিশুর সন্ধানে মক্কায় গেলাম। আমাদের কাফেলার যতো মহিলা ছিলো, সকলের কাছেই রসূল (স.)-কে পেশ করা হয়েছিলো, কিন্তু এতিম পিতৃহীন হওয়ায় সবাই তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে থাকে। কেননা আমাদের সবাই সন্তানের পিতা থেকে ভালো দান দক্ষিণা পাওয়ার আশা করছিলাম, একজন বিধবা মা কি আর দিতে পারবে? এ কারণেই আমরা কেউ তাঁকে নিতে রাযি হইনি।

এদিকে আমাদের কাফেলার প্রত্যেক মহিলাই কোন না কোন শিশু পেয়ে গেলো। আমি কোন শিশুই পেলাম না। ফেরার সময় আমি স্বামীকে বললাম, আমার বান্ধবীরা সবাই দুগ্ধপায়ী শিশু নিয়ে যাবে আর আমি খালি হাতে ফিরে যাবো, আল্লাহর কসম, এটা আমার ভালো লাগছে না। আমি বরং সেই এতিম শিশুকেই নিয়ে যাই। স্বামী রাযি হলেন। বললেন, হয়তো ওর উসিলায় আল–াহ তায়ালা আমাদের বরকত দেবেন। এরপর আমি গিয়ে শুধু এ কারণে তাকে নিয়ে নেই যে, অন্য কোনো শিশু পাচ্ছিলাম না।

হযরত হালিমা (রা.) বলেন, শিশুকে নিয়ে আমি যখন ডেরায় ফিরে এলাম তখন আমার উভয় স্তন ছিলো দুধে পূর্ণ, শিশুটি এবং তার সথে তার দুধ ভাইও পেট ভরে দুধ পান করে। এরপর উভয়ে স্বস্তির সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। অথচ এর আগে আমার সন্তান ক্ষুধার জ্বালায় ঘুমাতে পারত না। এদিকে আমার স্বামী উটনী দোহন করতে গিয়ে লক্ষ্য করলো, সেটির স্তন দুধে পরিপূর্ণ। তিনি এতো দুধ দোহন করলেন যে, আমরা তৃপ্তির সাথে পান করে বড় আরামে রাত কাটাই। সকালে আমার স্বামী বললেন, আল–াহর কসম, হালিমা, তুমি একটি বরকতময় শিশু গ্রহণ করেছো। আমি বললাম, আমারও তাই মনে হয়।

হালিমা বলেন, এরপর আমাদের কাফেলা রওয়ানা হলো। আমি দুর্বল গাধার পিঠে সওয়ার হলাম। শিশুটি ছিলো আমার কোলে। তখন আমাদের আগের দুর্বল গাধাটি কাফেলার সবাইকে অতিক্রম করে এতো দ্রুত সামনে চলে যায় যে, অন্য কোনো গাধাই সেটিকে ধরতে পারেনি। এমনকি আমার বান্ধবীরা বলতে লাগলো, ও আবু যুওয়ায়বের কন্যা, কি আশ্চার্য ব্যাপার! আমাদের দিকে একটু তাকাও। যে গাধায় সওয়ার হয়ে তুমি এসেছিলে, এটা কি সেই গাধা? আমি বললাম, হাঁ, সেটিই। তারা বললো, এর নিশ্চয়ই বিশেষ কোন ব্যাপার রয়েছে।

এরপর আমরা বনু সা’দ গোত্রে নিজেদের ঘরে চলে এলাম। তখন আমাদের এলাকার চেয়ে বেশি অভাবগ্রস্ত দুর্ভিক্ষ কবলিত অন্য কোন এলাকা ছিলো কিনা আমি জানতাম না। আমাদের ফিরে আসার পর বকরীগুলো চারণভূমিতে গেলে ভরা পেট ও ভরা স্তনে ফিরে আসতো। আমরা দুধ দোহন করে পান করতাম। অথচ সে সময় অন্য কেউ এক ফোঁটা দুধও পেতো না। তাদের পশুদের স্তনে কোন দুধই থাকত না। আমাদের কওমের লোকেরা রাখালদের বলতো, হতভাগার দল, তোমরা তোমাদের বকরী সে এলাকায় চরাও যেখানে আবু যুওয়ায়বের কন্যার রাখাল তার বকরীগুলো চরাতে নিয়ে যায়, কিন্তু তবুও তাদের বকরীগুলো খালি পেটেই ফিরে আসতো। একফোঁটা দুধও সেূলোর স্তনে পাওয়া যেতো না। অথচ আমার বকরীগুলো ভরা পেটে এবং ভরা স্তনে ফিরে আসতো। এমনি করে আমরা আল্লাহর রহমত ও বরকত প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম । এমনকি শিশুর বয়স দুই বছর হওয়ার পর আমরা তাকে দুধ ছাড়ালাম। অন্যান্য শিশুদের চেয়ে এ শিশু ছিলো অধিক হৃষ্টপুষ্ট এবং মোটাসোঁটা। এরপর আমরা শিশুটিকে তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম, কিন্তু আমরা তার যে বরকত প্রত্যক্ষ করেছিলাম, তাই চাচ্ছিলাম, শিশুটি আমাদের কাছেই থাকুক। তাই শিশুর মাকে আমি এ ইচ্ছার কথা জানিয়ে বললাম, ছেলেটিকে আপনি আমার কাছেই থাকতে দিন, সে আরো সবল হোক। আমি তার ব্যাপারে মক্কার মহামারীর আশংকা করছি। আমাদের পুন পুন অনুরোধে বিবি আমেনা শিশুকে পুনরায় আমার কাছেই ফিরিয়ে দেন।

বুক ফাড়ার ঘটনা

দুধ ছাড়ানোর পরও শিশু মোহাম্মদ বনু সা’দ গোত্রেই ছিলেন। তাঁর বয়স যখন চার অথবা পাঁচ বছর তখন ‘বুক ফাড়ার’ ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, হযরত জিবরাঈল (আ.)রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আগমন করেন। এ সময় তিনি অন্য শিশুদের সাথে খেলা করছিলেন। জিবরাঈল (আ.) তাঁকে শুইয়ে বুক চিরে দিল বের করে তা থেকে র৩পিন্ড বের করে বললেন, এটা আপনার মাঝে শয়তানের অংশ। এরপর দিল একটি তশতরিতে রেখে যমযম কূপের পানি দিয়ে ধুয়ে তারপর যথাস্থানে স্থাপন করেন। ওই দিকে অন্য শিশুরা ছুটে গিয়ে  তার ধাত্রীমাতা হালিমাকে বললো, মোহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ কথায় পরিবারের লোকেরা ঝটপট ছুটে এসে দেখলো, তিনি বিবর্ণ মুখে বসে আছেন।

মায়ের স্নেহকোলে

এ ঘটনার পর বিবি হালিমা ভীত হয়ে তাঁকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এলেন। ছয় বছর বয়স পর্যথ— তিনি মায়ের স্নেহছায়ায় কাটান।

এদিকে হযরত আমেনার ইচ্ছা হলো, তিনি পরলোকগত স্বামীর কবর যেয়ারত করবেন। পুত্র মোহাম্মদ, দাসী উম্মে আয়মান এবং শ্বশুর আবদুল মোত্তালেবকে সথে নিয়ে তিনি প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় পেঁথছেন। একমাস সেখানে অবস্থানের পর মক্কার পথে রওয়ানা হন। মদীনা থেকে রওয়ানা করে শুরুতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে এ অসুস্থতা কঠিন আকার ধারণ করে। অবশেষে মক্কা ও মদীনার মাঝামাঝি আবওয়া নামক জায়গায় এসে বিবি আমেনা ইথে—কাল করেন।

দাদার স্নেহছায়ায়

আবওয়ায় মা আমেনার ইন্তেকালের পর বৃদ্ধ আবদুল মোত্তালেব পৌত্রকে সথে নিয়ে মক্কায় পেঁথছলেন। পিতৃমাতৃহীন পেথত্রের জন্যে তাঁর মনে ছিলো ভালোবাসার উত্তাপ। তিনি নতুন করে যে আঘাত পেলেন তা অতীত আঘাতের কথা জাগিয়ে তোলে। পিতৃমাতৃহীন পেথত্রকে তিনি যতোটা ভালোবাসতেন, এতো ভালোবাসা তার নিজ পুত্র কন্যা কারো জন্যেই ছিলো না। ভাগ্যের লিখন বালক মোহাম্মদকে নিসংগতার যে প্রান্তরে এনে দাঁড় করিয়েছিলো, আবদুল মোত্তালেব তাঁকে সে নিসথতার ময়দানে একা ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি পৌত্রকে নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন এবং বড়োদের মতো সন্মান করতেন। ইবনে হেশাম বলেন, আবদুল মোত্তালেবের জন্যে কাবা ঘরের ছায়ায় বিছানা পেতে দেয়া হতো। তার সব সন্তান সে বিছানার চারদিকে বসতো, আবদুল মোত্তালেব আসলে কেবল তিনিই বিছানার ওপর বসতেন। তাঁর সন্মান মর্যাদার কারণে সন্তানদের কেউই এ বিছানায় বসতেন না, কিন্তু রসূলুল্লাহ (স.) এলে দাদা আবদুল মোত্তালেবের জন্যে পাতা বিছানায়ই বসতেন। এ সময় তিনি ছিলেন অল্প বয়স্ক শিশু। চাচারা তাঁকে বিছানা থেকে সরিয়ে দিতেন, কিন্তু আবদুল মোত্তালেব বলতেন, ওকে সরিয়ে দিয়ো না, ওর মর্যাদা অসাধারণ। এ কথা বলে তিনি তাকে নিজের পাশে বসাতেন। শুধু বসানোই নয়, তিনি প্রিয় দেথহিত্রের পিঠে হাত বুলাতেন। বালক মোহাম্মদের কাজকর্ম তাঁকে আনন্দ দিতো।

আট বছর দুই মাস দশ দিন বয়স হওয়ার পর দাদার স্নেহের ছায়াও উঠে যায়। তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি পুত্র আবু তালেবকে অসিয়ত করে গেলেন, তিনি যেন ভ্রাতু?ুত্রের বিশেষ যত্ননেন। আবু তালেব এবং আবদুল্লাহ ছিলেন একই মায়ের সন্তান।

চাচার স্নেহবাৎসল্যে

আবু তালেব ভ্রাতুষ্পুত্রকে গভীর স্নেহ-মমতার সাথে প্রতিপালন করেন। তিনি তাঁকে নিজ সথন্তানদের অন্তর্ভু৩ করে নেন; বরং সন্তানদের চেয়ে ভাতিজাকেই তিনি বেশি স্নেহ করতেন। চল্লিশ বছরের বেশি সময় পর্যথ— তিনি প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে সহায়তা দেন। আবু তালেব ভ্রাতুষ্পুত্র এর প্রতি লক্ষ্য রেখেই মানুষের সাথে শত্রুতা মিত্রতার বন্ধন স্থাপন করতেন।

চেহারার বরকতে রহমতের বৃষ্টি প্রার্থনা

ইবনে আসাকের জুলহামা ইবনে আরফাতা থেকে বর্ণনা করেন, আমি মক্কায় এলাম। মানুষ দুর্ভিক্ষের কারণে চরমভাবে সংকটাপন্ন ছিলো। কোরায়শ বংশের লোকেরা আবু তালেবকে বললো, মক্কা উপত্যকা দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে আছে। আমাদের সন্তানাদি দুর্ভিক্ষ কবলিত। চলুন, বৃষ্টির জন্যে দোয়া করুন। আবু তালেব একটি বালককে সথে নিয়ে বের হলেন। বালকটিকে দেখে মেঘে ঢাকা সূর্য মনে হচ্ছিলো। আশেপাশে অন্যান্য বালকও ছিলো। আবু তালেব বালকের হাত ধরে নিয়ে তাকে কাবা ঘরের দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসিয়ে দেন। বালক আবু তালেবের আথুল ধরে রেখেছিলেন। সে সময় আকাশে এক টুকরো মেঘও ছিলো না, কিন্তু দেখতে দেখতে এদিক ওদিক থেকে মেঘ আসতে শুরু করে এবং এমন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়, যাতে সমগ্র উপত্যকা সয়লাব হয়ে যায় এবং শহর প্রান্তর সজীব হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে আবু তালেব এ ঘটনার প্রতি ইথিত করে বলেছিলেন, ‘তিনি সুদর্শন, তাঁর চেহারার বরকতে বৃষ্টি প্রত্যাশা করা হয়। তিনি এতিমদের আশ্রয় এবং বিধবাদের রক্ষাকারী।’

পাদ্রী বোহায়রা

সূত্রগত মর্যাদায় সন্দেহ সংশয়পূর্ণ কিছু রেওয়ায়াত মোতাবেক নবী মোহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামর বয়স যখন বারো বছর, মতান্তরে বারো বছর দুই মাস দশ দিন,১৬ তখন আবু তালেব তাঁকে সথে নিয়ে ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়ায় রওয়ানা হন এবং বোসরা পেঁৗছার পর এক জায়গায় তাঁবু স্থাপন করেন। বোসরা সিরিয়ার এক জায়গার নাম এবং হূরানের কেন্দ্রীয় শহর। সে সময় বোসরা আরব উপদ্বীপের রোম অধিকৃত অঞ্চলের রাজধানী ছিলো। এ শহরে জরজেস নামে একজন পাদ্রী অবস্থান করতেন। তিনি বোহায়রা উপাধিতে সমধিক পরিচিত ছিলেন। কাফেলা তাঁবু স্থাপনের পর বোহায়রা গির্জা থেকে বের হয়ে কাফেলার লোকদের কাছে আসেন এবং তাদের মেহমানদারী করেন। অথচ পাদ্রী বোহায়রা এর আগে কখনো তার গির্জা থেকে বের হতেন না। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর গুণবৈশিষ্ট্যের আলোকে চিনে ফেলেন এবং তাঁর হাত ধরে বললেন, তিনি সাইয়েদুল আলামীন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে রাহমাতুল লিল আলামীন হিসেবে প্রেরণ করবেন। আবু তালেব বোহায়রাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এটা কিভাবে বুঝলেন? তিনি বললেন, আপনারা এ দিকে আসার সময় এ বালকের সন্তানে সব গাছপালা এবং পাথর সাজদায় নত হয়েছে। এূলো নবী ছাড়া অন্য কাউকে সাজদা করে না। তাছাড়া মোহরে নবুয়ত দ্বারা আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি। তাঁর কাঁধের নীচে নরম হাড়ের পাশে এটি  ‘সেব’ ফলের মতো মজুদ রয়েছে। আমরা তাঁর উল্লেখ আমাদের ধর্মীয় গ্রথে’ও দেখতে পাই।

এরপর পাদ্রী বোহায়রা আবু তালেবকে বললেন, ওকে মক্কায় ফেরত পাঠিয়ে দিন। সিরিয়ায় নেবেন না। তার ব্যাপারে ইহুদীদের তরফ থেকে ভয় রয়েছে। এ পরামর্শ অনুযায়ী আবু তালেব কয়েকজন ভৃত্যের সথে প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে মক্কায় পাঠিয়ে দেন।

untitled-22চলবে…..

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY