ইতিহাস ঐতিহ্য

0
50

হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ পরামর্শ
একবার হযরত ওমর (রা.) বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে সাহাবায়ে কেরামের জন্যে কিছু ভাতা নির্ধারিত করে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে তিনি মোহাজের এবং আনসারের পরামর্শ গ্রহণ করেন। সবাই হযরত ওমর (রা.)-এর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তাদের ধারণা মতে, এতে করে সাহাবায়ে কেরাম সচ্ছলতার সাথে নিশ্চিন্ত মনে নিজেদের ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত রাখতে সম হবেন।
হযরত হাকীম (রা.)-এর পালা আসলে তিনি নিবেদন করলেন, আমীরুল মোমেনীন! আপনি কখনো এমনটা করতে যাবেন না। এতে কোরায়শের ধ্বংস আর বিনষ্টের উপকরণ নিহিত রয়েছে। কেননা, কোরায়শরা হচ্ছে পেশায় ব্যবসায়ী। আপনি যদি তাদের জন্যে মাসিক ভাতা নির্ধারণ করে দেন, তা হলে তারা ব্যবসায় ছেড়ে বসবে। অতপর আপনার পরবর্তী খলীফারা যদি নির্ধারিত ভাতা বন্ধ করে দেন, তা হলে কোরায়শরা মসিবতে নিপতিত হবে। তখন না তারা রাষ্ট্রীয় ভাতা পাবে আর না তাদের ব্যবসায় থাকবে। (তারীখে ইবনে আসাকের, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২১)
মানুষের নিজের হাতে অর্জিত কর্মফল
কোরআন করীমে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘জঙ্গলে ও লোকালয়ে ফাসাদ প্রকাশ পাচ্ছে সেসব গোনাহের দরুন, যা মানুষের হাতসমূহ করছে।’
(সূরা আর রোম, আয়াত ৪১)
হযরত আলী (রা.)-এর শাগরেদ হযরত ইবনে খায়রা (র.) বলেন-
গোনাহের শাস্তির কারণে মানুষের এবাদতে অলসতা অমনোযোগিতা সৃষ্টি হতে থাকে, জীবিকা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, স্বাদ আস্বাদনে সংকোচন সৃষ্টি হয়। লোকজন বললেন, স্বাদ আস্বাদনে সংকোচনের অর্থ কি? তিনি বললেন, যখন কোনো হালাল স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ আসে, তখন এমন কোনো কারণ এসে আপতিত হয়, যা হালাল স্বাদ তিক্ত করে দেয়।
আজকাল মুসলমান জীবিকার সচ্ছলতা, মানসিক শান্তি স্বস্তির অন্বেষায় প্রাচ্য পাশ্চাত্য শিরে বহন করে ফিরছে।
এ অবস্থার কারণ হচ্ছে, আজকাল মুসলমানরা ডাক্তার এবং আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের নির্দেশক্রমে নিজেদের রোগ নিরাময় করতে চায়। তাদেরই পদাংক অনুসরণে ইঙ্গিত উদ্দেশ্য অর্জনের চিন্তায় চিন্তানি¦ত থাকে। তবে একথাও মনে রাখা দরকার। কবির ভাষায়-
‘হে পথিক! যে পথ তুমি ধরেছো সে পথে তুমি কখনো কাবায় উপনীত হতে পারবে না। তোমার অনুসৃত পথ তো তুর্কিস্তান অভিমুখেই ধাবিত হচ্ছে।’
মুসলমানদের হৃদয়ঙ্গম করা উচিত, তাদের সচ্ছলতা এবং তাদের রোগমুক্তির গ্রন্থ একমাত্র তাই, যা তাদের মহান চিকিৎসক রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন। তাঁর আনীত গ্রন্থই তাদের রোগের নির্ভুল কারণসমূহ নির্দেশ করে এবং তাঁর ব্যবস্থাপত্রই তাদের রোগ নিরাময় করতে পারে। মুসলমানরা একমাত্র রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নির্দেশিত ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমেই দুনিয়াতে নিশ্চিন্ত শান্তি স্বস্তির জীবন যাপন করতে পারে।
প্রত্যেক ব্যক্তির গঠন প্রকৃতি ও মেযাজ যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি প্রত্যেকের রোগের কারণ এবং প্রতিবিধান ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। একইভাবে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সামগ্রিক মেযাজ প্রকৃতিও ভিন্ন ভিন্ন। প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর রোগের কারণ এবং প্রতিবিধান ব্যবস্থাও স্বতন্ত্র। যদি ইংরেজ জাতি আল্লাহর সত্তা এবং তাঁর বিধানের প্রতি বিমুখ ও তার প্রতি অমনোযোগী হয়ে, আত্মপূজা ও ধোকা প্রতারণার মাধ্যমে জাগতিক উন্নতির সর্বোচ্চস্তরে উপনীত হতে সম হয়, হিন্দু জাতি যদি মূর্তিপূজা এবং সুদখোরীতে নিমজ্জিত থেকে সুখ শান্তি ও সচ্ছলতার জীবন যাপন করতে পারে, তা হলে এটা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে না যে, ইংরেজ ও হিন্দু জাতির কর্মপন্থা অবলম্বনে মুসলমানরাও একই পদ্ধতিতে জাগতিক জীবনে শান্তি স্বস্তি ও উন্নতিলাভে সম হবে। মুসলমানদের ইহাজাগতিক শান্তি স্বস্তি, সম্মান মর্যাদা এবং উন্নতি মহান আল্লাহ তাঁর আনুগত্যের মাঝেই নিহিত রেখেছেন। পাপাচার মুসলমানদের জাতীয় মেযাজ প্রকৃতির জন্য জীবনসংহারী হলাহলতুল্য। শুধু আল্লাহর বিধানের আনুগত্য এবং তাঁর এবাদতই মুসলমানদের সর্বরোগের দাওয়াই।
যদি মুসলমানরা রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বাতলানো রোগ নিরাময় ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করে এবং এ ব্যবস্থাপত্রে বর্ণিত বিষয়সমূহ থেকে আত্মরক্ষা করে চলে, তবে তারা দেখতে পাবে, তাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় দুনিয়া তাদের গোলামে পরিণত হয়েছে এবং আরাম, শান্তি স্বস্তি ও সম্মান মর্যাদা তাদের মালিকানাধীন এক ধরনের জায়গীরদারীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
খলীফা মনসুরের দরবারে এক কয়েদী
উমাইয়া শাসন অবসানের পর আব্বাসী শাসক মনসুর আব্বাসীর আমলে একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে এসে সংবাদ দিলো, অমুক ব্যক্তির কাছে বনী উমাইয়ার বিপুল মালসম্পদ ও ধনভাণ্ডার রয়েছে, যা তার কাছে বনী উমাইয়ারা আমানত রেখেছিলো।
এ সংবাদ পেয়ে মনসুর আব্বাসী লোকটিকে দরবারে হাযির করার নির্দেশ দিলেন। অবিলম্বে তাকে বন্দী করে দরবারে হাযির করা হয়।
মনসুর বন্দীকে বললো, আমি শুনেছি, তোমার কাছে বনী উমাইয়ার অনেক ধনসম্পদ ও ধনভাণ্ডার আমানত রয়েছে, সেসব এখানে উপস্থিত করো। বাদীর বিস্ময়কর সাহস এবং নির্ভীকতা ছিলো দেখার মতো। সে নিতান্ত শান্ত সৌম্যভাবে মনসুরের নির্দেশের জবাব প্রদান করে। উভয়ের মধ্যকার কথোপকথন নিুে উল্লেখ করা হলো।
বন্দী . আমীরুল মোমেনীন! আপনি কি বনী উমাইয়ার কোনো ওয়ারিস ?
মনসুর . না।
বন্দী . যদি আপনি বনী উমাইয়ার ওয়ারিস বা ওছি (যার নামে অসিয়ত করা হয়) কোনোটাই না হন, তা হলে তাদের ধন-সম্পদ, ধনভান্ডার দাবী করার আপনার কি অধিকার রয়েছে?
মনসুর . (কিছুণ মাথা নিচু করে রেখে চিন্তা করার পর-) দেখো, বনী উমাইয়া মুসলমানদের ওপর যুলুম করেছে, অবৈধ পন্থায় মুসলমানদের ধনসম্পদ করায়ত্ত করেছে। বর্তমানে আমি মুসলমানদের অভিভাবক ও প্রতিনিধি। আমার বাসনা, বনী উমাইয়ার অবৈধ পন্থায় আহরিত ধন-সম্পদ তাদের কাছ থেকে নিয়ে সরকারী কোষাগারে জমা করবো।
বন্দী . আমীরুল মোমেনীন! আপনার এ ঘোষণা গ্রহণযোগ্য নয় যতোণ না আপনি এ ব্যাপারে শরীয়তসম্মত সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন না করবেন। আপনাকে শরীয়তসম্মতভাবে প্রমাণ দিতে হবে, আমার কাছে বনী উমাইয়ার যে মাল সম্পদ ধনভান্ডার রয়েছে তা তাদের সে সম্পদ, যা তারা যুলুম অত্যাচার করে অবৈধ পন্থায় করায়ত্ত করেছে। কেননা, এতে কোনো সন্দেহ নেই, বনী উমাইয়াদের নিজেদের মালিকানাধীন কিছু ধন-ভান্ডারও ছিলো, যা যুলুম অত্যাচার করে করায়ত্ত করা হয়নি
মনসুর . (কিছুণ মাথা ঝুঁকিয়ে রেখে চিন্তা ভাবনার পর উযির রবীকে সম্বোধন করে) হে রবী! এ ব্যক্তি কথা তো ঠিকই বলছে। নিসন্দেহে তার ওপর আমাদের কোনো অধিকার নেই। (এরপর সহাস্যে ও প্রশান্ত বদনে বন্দীর প্রতি নিবিষ্ট হয়ে বললো-) তোমার কি আমার কাছে কোনো প্রয়োজন আছে ?
বন্দী . হাঁ, আমার একটা প্রয়োজন আছে। আপনি অনতিবিলম্বে দূত মারফত আমার একটি চিঠি আমার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিন, তা হলে তারা আমার সুস্থতা ও নিরাপত্তার কথা জানতে পেরে নিশ্চিন্ত ও আশ্বস্ত হবে। কেননা, আমার আপনার এখানে উপস্থিতি পরিবারের লোকদের কঠোর পেরেশানীতে নিপতিত করেছে। আমার দ্বিতীয় প্রয়োজন হচ্ছে, আপনি সে লোককে আমার সম্মুখে ডেকে আনুন যে আমার সম্পর্কে আপনার কাছে চোগলখোরী করেছে। আল্লাহর কসম করে বলছি, আমার কাছে বনী উমাইয়ার কোনো ধনসম্পদ ধনভান্ডার নেই, কিন্তু যখন আমাকে আপনার সম্মুখে এনে দাঁড় করিয়ে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখন আমি সে জবাবই দিয়েছি যাকে আমি ত্বরিত মুক্তি পাবার উপযোগী বলে বুঝেছি।
মনসুর . (উযির রবীকে সম্বোধন করে-) সে লোককে ডেকে পাঠাও যে এ সংবাদ সরবরাহ করেছে। উযির অবিলম্বে নির্দেশ পালন করে এবং সংবাদদাতাকে দরবারে হাযির করা হয়।
বন্দী . (সংবাদদাতাকে দেখেই-) আমীরুল মোমেনীন! এ তো হচ্ছে আমার গোলাম। এ আমার তিন হাজার দীনার নিয়ে পালিয়েছে।
মনসুর . (ক্রোধভরে গোলামের উদ্দেশে-) সত্য করে বলো, ব্যাপার কি ?
গোলাম . (নিরুপায় হয়ে-) জাহাঁপনা, ব্যাপার তাই যা তিনি (বন্দী) বলেছেন। প্রকৃতই আমি তার গোলাম এবং তার কথিত অংকের দীনার নিয়ে পালিয়ে এসেছি।
মনসুর . (প্রথমে বন্দীকে উদ্দেশ করে-) এ গোলামকে মাফ করে দিতে আমি আপনাকে সুপারিশ করছি।
বন্দী . আমীরুল মোমেনীন! আমি তার অপরাধ মা করে দিয়েছি এবং আমার যে সম্পদ নিয়ে সে পালিয়েছে তাও মাফ করে দিয়েছি। উপরন্তু নিজ থেকে আরও তিন হাজার দীনার আমি তাকে দিচ্ছি।
মনসুর . (বিস্ময়ভরে-) এর চেয়ে বেশী আর কি হতে পারে!
এ ঘটনার পর মনসুর সর্বদাই এ ব্যক্তির ধৈর্য সহনশীলতা এবং তার মা ও দানশীলতার ওপর বিস্ময় প্রকাশ করে বলতেন, এটা সত্যিই মা ও দানশীলতার এক আজব উদাহরণ। (সামারাতুল আওরাক লিল হুমুবী আলা হামেশিল মোস্তাতরাফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৪)
হযরত সুফিয়ান সওরী (র.)-এর একটি উপদেশ
হযরত সুফিয়ান ইবনে ওয়ায়না (র.) বলেন, হযরত সুফিয়ান সওরী (র.)-এর মুত্যুর পর আমি তাকে একদিন স্বপ্নে দেখি। তখন আমি তার কাছে আবেদন জানালাম, আমাকে কোনো উপদেশ দিন। তিনি বললেন, মানুষের সাথে জানাশোনা পরিচয় একটু কম করবে। (কিতাবুর রূহ- আল্লামা ইবনে কাইয়েম)
জীবিকা আহরণের মহাফযীলত
হাফেয আবু নোয়াইম (র.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, এমন বহু গোনাহ আছে, নামায, হজ্জ, ওমরা কোনোটা দ্বারাই সে গোনাহর কাফফারা হয় না। সাহাবায়ে কেরাম নিবেদন করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম, সেসব গোনাহের কাফফারা তাহলে কিসের দ্বারা হয়? তিনি এরশাদ করলেন, জীবিকা আহরণে যে দুখ কষ্ট হয়, তা দ্বারাই কেবল সেসব অজ্ঞাত গোনাহসমূহের কাফফারা হয়।
(মোখতাসার তাযকেরায়ে কুরতুবী, পৃষ্ঠা-৪২)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY