ওযু ও আধুনিক বিজ্ঞান

0
166

আযানের মাধ্যমে মূলত আদেশ দেয়া হয় যে, তুমি সেসব কাজ থেকে বেরিয়ে এসো যেসব কাজ তোমার ভেতর বাইর ক্লেদাক্ত করেছে। আযান আদেশ দেয়, ওইসব কাজ থেকে বিরত হও যেসব কাজ তোমাকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে রোগীতে পরিণত করেছে। এবার মসজিদে আসো, আল্লাহর সান্নিধ্যে উপস্থিত হও। তোমার ভেতরের বাইরের পরিচ্ছন্নতা এখন একান্তই জরুরী হয়ে পড়েছে। বাইরের দিকটা তুমি পরিষ্কার করতে চেষ্টা করো, আল্লাহ তায়ালা তোমার ভেতরের দিক পরিষ্কার করে দেবেন। ওযু ইসলামের এমন বৈশিষ্ট্যমন্ডিত বিধান যা অন্য কোনো জীবনব্যবস্থায় পাওয়া যায় না। ওযুর মাধ্যমে দেহের সে সকল অংশ পরিষ্কার করা হয় যেসব অংশ দিয়ে দেহে রোগ প্রবেশ করে। এ অংগ-প্রত্যংগের মাধমে রোগ দেহে প্রবেশের পর আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করে। কাজেই রোগ দেহে প্রবেশ এবং রোগের বিস্তার ঘটার পথ বন্ধ করে দিয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা অধিক প্রয়োজন। আর স্বাস্থ্যের জন্যে শত্র“ যেসব রোগ রয়েছে সেসব রোগ থেকে ওযু মানুষকে আল্লাহর ইচ্ছায় রক্ষা করে। ইসলাম উন্নতির নাম নাকি অবনতির নাম? ইসলামী বিধান পালন করলে মানুষের জীবন আলোকিত হয়, নাকি অন্ধকারাচ্ছন্ন? ইসলামের বিধান কি সুস্থতা দেয়, নাকি রোগ সৃষ্টি করে? যদি বুঝতে পারেন তবে বুঝে নিন, যদি বুঝতে না পারেন বিবেকের মুখোমুখি হয়ে এ বইয়ের লেখা মনোযোগ দিয়ে পাঠ করুন। বুঝতে পারবেন ইসলাম কী বলে, বিজ্ঞান কী চায় আর ফ্যাশন মানুষকে কী দেয়।

হাত ধোয়া

ওযু করার সময় প্রথমে হাত ধুতে হয়। কারণ হাত ধোয়ার পর কুলি করতে হবে। যদি হাতই অপরিষ্কার থাকে তবে হাতের মাধ্যমে রোগজীবাণু মুখে প্রবেশ করবে। ফলে নানারকম রোগ দেখা দেবে। বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে মানুষের ব্যস্ততার শেষ নেই। মানুষ নানারকম কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কখনো কখনো কাজ করার সময় হাতে বিভিন্ন ধরনের ক্যামিকেল লেগে যায়। এ ক্যামিকেল দীর্ঘ সময় হাতে লেগে থাকলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা নানা জিনিসে হাত লাগায়। যদি সেসব জিনিসের সাথে আসা জীবাণু হাতে লেগেই থাকে তবে খুব শীঘ্রই তারা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়বে। ওযুর মাধ্যমে যদি নিয়মিত হাত না ধোয়া হয় তবে যেসব রোগের আশংকা থাকে সেসব রোগ হচ্ছে, স্কিন ডিজিজ, একজিমা, প্রিকলি হিট, স্কীন ইনফেকশন, ফাংগাশ ইত্যাদি। যখন আমরা ওযু করার উদ্দেশে হাত ধুই তখন আমাদের আংগুলের গোড়া থেকে বের হওয়া রশ্মি একপ্রকার বৃত্ত সৃষ্টি করে। এর ফলে আমাদের মধ্যে সুপ্ত থাকা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তীব্র হয়। এ বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে হাতের সৌন্দর্য বেড়ে যায়, আংগুলের মধ্যে কমনীয়তা সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা বেড়ে যায়।

কুলি করা

কুলি করার আগে মেসওয়াক করতে হয়। মেসওয়াক সম্পর্কে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কুলির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, আমরা যে পানি ব্যবহার করছি সে পানির স্বাদ, রং এবং গন্ধ কেমন। আমরা খাবার খেলে কিছু না কিছু খাদ্যকণা দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকে। তারপর সেই খাদ্যকণা পচে বিষাক্ত হয়ে ওঠে। মুখের লালার সাথে মিশে সেই পচা খাদ্যকণা পাকস্থলীতে পৌঁছে যায়। কুলি এবং মেসওয়াক করা হলে বিষাক্ত খাদ্যকণা দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকতে পারে না। ফলে রোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। বাতাসে থাকা বহু রোগজীবাণু আমরা চোখে দেখতে পাই না, কিন্তু বাতাসের মাধ্যমে অনেক রোগজীবাণু আমাদের মুখের ভেতর প্রবেশ করে এবং লালার মাধ্যমে পেটে চলে যায়। যদি কুলি না করা হয় তবে সেসব জীবাণু যেসব রোগ সৃষ্টি করতে পারে যা নিুরূপ।

মুখের অসুখ

এইডস-এর প্রাথমিক লক্ষণ মুখেও প্রকাশ পায়। মুখের কিনারা ফেটে যায়, মুখে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। মোটকথা, কুলি এমন একটি আমল যার মাধ্যমে মানুষ এমন অনেক রোগ থেকে রক্ষা পায়, যে রোগে আক্রান্ত হলে মানুষের দ্বীন দুনিয়া কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কুলির সময়ে গরগরা করা হলে গলায় টনসিল এবং অন্যান্য রোগ হয় না। গলার ভেতরে বার বার পানি পৌঁছানো হলে গলার ক্যান্সার থেকে মানুষ রক্ষা পায়।

নাকে পানি দেয়া

নাক হচ্ছে নিশ্বাস নেয়ার একমাত্র পথ। যে বাতাস থেকে আমরা নিশ্বাস নিই সে বাতাসে অসংখ্য রোগজীবাণু ভেসে বেড়ায় এবং রোগ মনব দেহে খুব সহজে প্রবেশ করে। কারণ বাতাসবাহিত জীবাণু সব সময় আমাদের নিশ্বাসের সাথে দেহের ভেতর প্রবেশের সুযোগ পায়। ফলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মারাত্নক রোগ সংক্রমণের আশংকা থাকে। এমনকি স্থায়ী সর্দিতে নাকের জখম দেখা দেয়। এ রকম রোগীদের জন্যে ওযুর সময়ে নাকে পানি দেয়া বিশেষ উপকারী। ওযুর কারণে প্রতিদিন আমরা পাঁচবার নাকে পানি দিয়ে থাকি। কাজেই নাকের ভেতর কোনো প্রকার রোগজীবাণু আস্তানা গাড়তে পারে না। নাক মানব দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংগ। নাকের মাধ্যমে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করা যায়। নাকের ছিদ্রে আংগুল ঢুকিয়ে কথা বললেই এর নানারকম শব্দ তৈরী হয়। নাক পরিষ্কার করা হলে এর প্রভাব ফুসফুসের ওপর পড়ে। প্রত্যেক মানুষের দেহের ভেতর নাসিকা ছিদ্র দিয়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচশ ঘনফুট বাতাস প্রবেশ করে। বরফাবৃত দিনে বা শুকনো দিনে বরফঢাকা মাঠে স্ক্যাটিং শুরু করুন। দেখবেন আপনার ফুসফুস শুষ্ক বাতাস গ্রহণ করছে না; বরং সিক্ত বা ভেজা ভেজা বাতাস গ্রহণের জন্যে ফুসফুস উন্মুখ হয়ে আছে। ফুসফুস যে বাতাস গ্রহণ করে তার মধ্যে শতকরা আশি ভাগ সিক্ততা এবং শতকরা নব্বই ভাগ উষ্ণতা থাকা আবশ্যক। ফুসফুস চায় জীবাণু, ধোঁয়া, ধুলোবালি থেকে মুক্ত বাতাস। এরকম বাতাস সরবরাহকারী সাধারণ একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এয়ার কন্ডিশনার, যা একটি ছোটো ট্রাংকের সমান হয়ে থাকে, কিন্তু নাকের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা সেই এয়ার কন্ডিশনার ফিট করে দিয়েছেন। অথচ নাকের উচ্চতা মাত্র কয়েক ইঞ্চি। বাতাসকে সিক্ত করে গ্রহণ করার জন্যে নাক প্রতিদিন এক গ্যালনের এক চতুর্থাংশ সিক্ততা তৈরী করে। পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য কাজ আঞ্জাম দেয় নাকের ভেতরের পর্দা। নাকের ভেতর সেই যন্ত্রের মাধ্যমে পাকস্থলীতে পৌঁছানো বাতাসকে জীবাণুমুক্ত করা হয়। নামাযী মানুষ ওযুর সময় যখন নাকে পানি দেয় তখন এক প্রকার বিদ্যুৎ প্রবাহ নাকের ভেতরের পর্দাকে শক্তিশালী করে। এর ফলে নাক যাবতীয় জটিল রোগ থেকে নিরাপদ থাকে।

মুখ মন্ডল ধোয়া

আমার একজন রোগী ছিলো, যার চেহারা সব সময় গরম থাকতো। ঠান্ডা ওষুধ এবং এন্টি এলার্জি ওষুধ ব্যবহার করেও কোনো উপকার পায়নি। আমি তাকে নিয়মিত নামায আদায করার পরামর্শ দিলাম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জন্যে নতুন ওযু করতে বললাম। ওযু করার পর দরুদ শরীফ পাঠ করে দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে চেহারায় মালিশ করতে বললাম। অল্প কয়েকদিন এ আমল করার ফলে রোগী সুস্থ হয়ে গেলো। মুখমন্ডল ধোয়ার ফলে বহু রকম রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। যেমনঃ

ক্যামিক্যালস থেকে সাবধানতা

বর্তমান আণবিক যুগে চারদিকে আণবিক বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা পরিবেশ সুস্থ ও নির্মল রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। হাত মুখ বার বার ধোয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন যেন ক্যামিক্যালস, ধুলোবালি মুখে হাতে জমে থাকতে না পারে। এসব সমস্যা থেকে আত্নরক্ষার একমাত্র উপায় হচ্ছে ওযু। ধোঁয়ার মধ্যে নানা রকমের বিপজ্জনক ক্যামিকেলস বিদ্যমান থাকে, যেমন সীসা, লেদ ইত্যাদি। বাতাসবাহিত এসব কেমিক্যালসের জীবাণু বেশী সময় ত্বকে জমে থাকলে এলার্জি এবং অন্যান্য রোগ দেখা দেয়।

মুখের ব্রণ

মুখমন্ডল নিয়মিত ধোয়া হলে মুখে ব্রণ উঠতে পারে না, অথবা ওঠার সম্ভাবনা কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যতো রকমের ক্রিম, লোশন বাজারে পাওয়া যায় এগুলো ব্যবহার করা হলে চেহারায় দাগ পড়ে। চেহারার সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্যে বার বার মুখমন্ডল ধোয়া আবশ্যক। আমেরিকান কাউন্সিল ফর বিউটির পরিচালক লেডী বিচার একটি বিস্ময়কর কথা বলেছেন। তিনি বলেন, মুসলমানদের কোনো প্রকার রাসায়নিক লোশন ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। ইসলামী মতে ওযু করার মাধ্যমে মুখমন্ডল ধোয়া হলে তারা বিভিন্ন ধরনের রোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।

চেহারার এলার্জি

চেহারার এলার্জির রোগীরা যদি নিয়মিত ওযু করে তাহলে এলার্জি হওয়ার আশংকা কমে যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন, এলার্জি থেকে আত্নরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর নিয়ম হচ্ছে নিয়মিত মুখ ধোয়া। ওযুর মাধ্যমেই এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।

চেহারার ম্যাসেজ

ওযুর সময় তিন বার মুখমন্ডল ধোয়ার কথা বলা হয়েছে। মুখমন্ডল ধোয়ার সময় তিন বার হাত দিয়ে মুখ ম্যাসেজও করা হয়। এ সময় মুখে রক্ত চলাচল বেড়ে যায় এবং মুখের ধুলো ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়। এতে চেহারার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। চেহারা তিন বার ধোয়ার যৌক্তিকতা হচ্ছে, প্রথমবার মুখে পানি দিয়ে ময়লা নরম করা হয়। দ্বিতীয় বার পানি দিলে ময়লা দূর হয়ে যায়। তৃতীয় বার পানি দেয়ায় ময়লা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়।

ভ্রুতে পানির প্রভাব

ওযুর মাধ্যমে ভ্রুতে পানি লেগে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ভ্রু ভেজা থাকলে চোখের এমন মারাত্নক রোগ থেকে মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে পারে, যেসব রোগে চোখের দৃষ্টিশক্তি পর্যায়ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। একবার আমার কাছে একজন অন্ধ রোগী এসে জানালো, কয়েক মাস থেকে আমার চোখের দৃষ্টি কমে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, চোখের রস এবং সিক্ততা কমে যাওয়ার কারণেই এ রকম অবস্থা হয়েছে।

চক্ষুরোগ থেকে বাঁচুন

আপনাদের ঘরে কারো চোখে ব্যথা হলে আপনারা চোখে পানির ছিটা দেয়ার পরামর্শ দেন। এটা একটা ভালো ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে চোখের অসুখ কমে যায়। চোখে পানি দেয়া হলে ধোঁয়া, ধুলোবালি ধুয়ে যায়। ধুলোবালি, ধোঁয়া নাক চোখকে প্রভাবিত করে। পানি দিয়ে ধোয়া হলে চোখ নানা রকম অসুখ থেকে রক্ষা পায়।

চোখ, পানি ও স্বাস্থ্য

ইউরোপের একজন ডাক্তার চোখ, পানি এবং স্বাস্থ্য নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। সেই প্রবন্ধে তিনি প্রতিদিন কয়েকবার পানি দিয়ে চোখ ধোয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি লিখেছেন, তোমরা প্রতিদিন একাধিকবার মুখ ধোও, তা না হলে তোমরা মারাত্নক রোগে আক্রান্ত হবে।

ওযুর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

ইঞ্জিনিয়ার নকশেবন্দী তার রচিত মাওয়ায়েযে লিখেছেন, মহানবী (স.) প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ওযু করতেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের যুগে বলা হয়েছে, ঘুমোবার পর চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে চোখে পিচুটি জমে। এতে চোখ বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হচ্ছে ঘুম থেকে উঠেই চোখে পানির ছিটা দিতে হবে। যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদের জন্যে উঠবে এবং ওযু করবে, তারপর ফজরের জন্যে উঠবে এবং ওযু করবে, এভাবে একাধিকবার ওযু করা হলে চোখের রোগ ভালো হয়ে যায়। তা ছাড়া মুখমন্ডল ধোয়া হলে দেহের বিভিন্ন অংগ প্রত্যংগের উপকার হয়।

দাড়ি খেলাল করা

দাড়ি যেহেতু খুব ঘন হয়ে থাকে, এ কারণে শরীয়তের নির্দেশ হচ্ছে, দাড়ি খেলাল করে তার ভেতরে পানি পৌঁছাতে হবে। দাড়ির ভেতরে পানি পৌঁছানো হলে দাড়ির গোড়া মযবুত হয়ে যায়। সাধারণ যেসব জীবাণু সংক্রমণের আশংকা থাকে সেসব সংক্রমণ হয় না। সেসব জীবাণু পানির সাথে ধুয়ে যায়। দাড়ি খেলাল করা না হলে তাতে উকুন হওয়ার আশংকা থাকে। এছাড়া দাড়িতে পানি ব্যবহার করার ফলে ঘাড়ের মাসল, থাইরয়েড গ্লান্ডে এবং গলায় রোগ সংক্রমণের কোনো প্রকার সম্ভাবনা থাকে না। (ডক্টর প্রফেসর জর্জ এল বাই- সায়েন্টিফিক ওয়ার্ল্ড)

কনুই পর্যন্ত ধোয়া

দেহের এ অংশ সব সময় অনাবৃত থাকে। তাই এ অংশে যদি পানির স্পর্শ না লাগে তবে মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অংগ প্রত্যংগের অসুখ দেখা দেয়। কনুইতে তিনটি বড়ো শিরা রয়েছে। সেই শিরার সম্পর্ক মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিন্ডের সাথে। কনুই ধোয়া হলে উল্লিখিত তিনটি অংগই শক্তি লাভ করে এবং রোগ থেকে নিরাপদ থাকে। এছাড়া কনুই ধোয়ার ফলে হৃৎপিন্ডের সাথে সংযুক্ত আলোর সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আলোর সেই বিচ্ছুরণের কারণে হাতের পেশী ও শিরা শক্তিশালী হয়।

মাসেহ করা এবং ফ্রান্সের একটি ঘটনা

ইঞ্জিনিয়ার নকশেবন্দী তার রচিত মাওয়ায়েযে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের এক বন্ধু ফ্রান্সে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে নিজের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করে বলেন, ‘সেখানে একদিন আমি ওযু করছিলাম। একজন লোক গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি তাকে লক্ষ্য করলেও ওযু করতে থাকলাম। ওযু শেষ করার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে? আমি বললাম, আমি একজন মুসলমান। জানতে চাইলেন, আমি কোত্থেকে এসেছি? আমি জানালাম, পাকিস্তান থেকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, পাকিস্তানে কয়টি পাগলা গারদ রয়েছে। বিস্ময়কর প্রশ্ন। আমি বললাম, দুই চারটি থাকতে পারে, আমি ঠিক জানি না। তিনি বললেন, এ মাত্র আপনি কী করেছেন? আমি বললাম কেন, ওযু করেছি। বললেন, এভাবে কি প্রতিদিন করেন? আমি বললাম প্রতিদিন অন্ততঃ পাঁচ বার করি। তিনি বললেন, তিনি ওখানকার একটি মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসক। তারপর তিনি বলেন, আমি চিন্তা গবেষণা করি, কেন মানুষ পাগল হয়। আমার গবেষণা হচ্ছে, মানুষের মস্তিষ্ক থেকে সিগনাল সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আমাদের দেহের অংগ প্রত্যংগ কাজ করে। আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় ফ্লুইডের ভেতর ফ্লোয়াট করে। এ কারণে আমরা কর্মব্যস্ত সময় কাটাই, ছুটোছুটি করি। মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতি হয় না। আমাদের মস্তিষ্ক থেকে কতিপয় শিরা উপশিরা বাহক হয়ে আমাদের সারা দেহে যোগাযোগ স্থাপন করে। আমি গবেষণা করে দেখেছি, চুল লম্বা করে রেখে ঘাড়ের অংশ শুকনো রাখলে শিরাসমূহে শুষ্কতা দেখা দেয়। কয়েকবার এরকমও হয়ে থাকে যে, মানুষের মস্তিষ্ক কাজ করা ছেড়ে দেয়। এ কারণে আমি চিন্তা করলাম, ঘাড় মাসেহ করার জায়গা দিনে কয়েকবার ভেজা রাখা দরকার। আপনাকে ওযু করতে এবং মাসেহ করতে দেখেছি। আমি মনে করলাম, আপনারা কিভাবে পাগল হতে পারেন? ঘাড় মাসেহ করা হলে সানস্ট্রোক এবং ঘাড়ের জ্বর ভালো হয়ে যায়। চিন্তা করার বিষয় হচ্ছে, একজন চিকিৎসক সারাজীবন একটি মোস্তাহাব আমল নিয়ে গবেষণা করে কাটিয়ে দিলেন। সুতরাং সুন্নত ওয়াজেব ফরয নিয়ে গবেষণার ফল কেমন হবে তা সহজেই বোঝা যায়।

হাবলুল অরিদের রহস্য

রূহানিয়াত বিশেষজ্ঞরা মানব দেহকে ছয় ভাগে বিভক্ত করে থাকেন। একটি অংশ হচ্ছে হাবলুল অরিদ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি তোমাদের শাহরগের চেয়েও সন্নিকটে অবস্থান করছি। এ শাহরগ মাথা ও ঘাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত। ঘাড় মসেহ করা হলে মানব দেহে একপ্রকার সতেজতা সজীবতা অনুভব করা যায়। দেহের প্রতিটি জোড়ার সাথে এ শাহরগের সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। নামাযী ব্যক্তি অযুর যখন ঘাড় মাসেহ করে তখন হাতের স্পর্শে বিদ্যুৎ প্রবাহ শিরায় গিয়ে জমা হয় এবং দেহের অংগ প্রত্যংগে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সারাদেহে সজীবতা অনুভূত হয়।

পা ধোয়া

একজন ডাক্তার ডায়াবেটিসের রোগীদের বলেছেন, আপনারা যেভাবে নিজেদের চেহারার হেফাযত করেন একইভাবে পায়ের হেফাযত করুন। কারণ ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ে ইনফেকশন বেশী হয়। অধিকাংশ সময় পা থাকে জুতোর ভেতর, শুধু সকাল সন্ধ্যাায় জুতো খোলা হয়। ইউরোপের প্রগতিশীল লোকেরা কয়েকদিন পর্যন্ত জুতো পায়ে রাখে। এমনকি রাতে জুতো পায়ে রেখেই ঘুমায়। এ রকম অভ্যাসের ফলে তারা খুব সহজেই পায়ের অসুখে আক্রান্ত হয়। আমাদের পায়ে ধুলোবালি ময়লা সবচেয়ে বেশী লাগে। ফলে রোগ জীবাণু তৈরী হয়। ইনফেকশন হয়। ইসলাম দিনে পাঁচ বার পা ধোয়ার এবং খেলাল করার ব্যবস্থা করেছে। এতে পায়ে কোনো প্রকার জীবাণু জড়িয়ে থাকার সুযোগ পায় না। পা ধোয়ার কারণে মানুষ অনেক রকমের রোগ থেকে মুক্ত থাকে। যেমন ডিপ্রেশন, অস্থিরতা, মস্তিষ্কের শুষ্কতা, অনিদ্রা ইত্যাদি।

ওযু ও উচ্চ রক্তচাপ

শরীয়তের আদেশ রয়েছে, তোমরা ক্রোধান্বিত হলে ওযু করবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে যখন রক্তচাপ বেড়ে যাবে তখন ওযু করবে। এ উভয় বিধান লক্ষ্য করলে গবেষণার নতুন পথ খুলে যায়। ক্রোধের সময় রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। হৃদরোগ যখন উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয় তখন ওযু করা হলে রক্তচাপ কমে যায়।

একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের অভিমত

একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে ওযু করাতে হবে। ওযু করানোর পর রক্তচাপ পরিমাপ করা হলে নিশ্চিতভাবে দেখা যাবে, রক্তচাপ কমে গেছে। এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন মনস্তত্ত্ববিদ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সালামত আযিয। তিনি বলেন, ওযু হৃদরোগ আরোগ্য হওয়ার একটি উত্তম উপায়। পাশ্চাত্যের মনস্তত্ত্ববিদরা প্রতিদিন ওযুর মতো করে কয়েকবার দেহে পানি লাগানোর পরামর্শ দেন, কিন্তু এসব জ্ঞান গবেষণার কয়েকশ’ বছর আগেই ইসলাম ওযুর বিধান প্রবর্তন করেছে। ওযু করার সময়ে প্রথমে হাত ধোয়া, এরপর কুলি করা, তারপর নাকে পানি দেয়া, তারপর মুখ ধোয়া, তারপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অংগ প্রত্যংগ ধোয়ার বিধান রয়েছে। পর্যায়ক্রমিক এ রকম ধৌতকরণের মধ্যেও বিজ্ঞানসম্মত যৌক্তিকতা রয়েছে।

ওযু করার পর অবশিষ্ট পানি

হাদীস গ্রন্থসমূহে রয়েছে, ওযু করার পর অবশিষ্ট পানি পান করা হলে সুস্থ থাকা যায়। এ বিষয়ে ডাক্তার ফারুক আহমদ গবেষণা করে বলেছেন, ওযু করার পর অবশিষ্ট পানি পান করার সুফল প্রথমে কিডনি লাভ করে। এ পানি পান করার ফলে প্রস্রাব স্বাভাবিক হয়ে যায়। এছাড়া ওযুর অবশিষ্ট পানি পান করা হলে অবৈধ যৌন সংসর্গের ইচ্ছা মনে জাগে না। যেসব রোগীর ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব হয় তাদের এ সমস্যা দূর হয়ে যায়। এছাড়া ওযুর পর অবশিষ্ট পানি পান হৃৎপিন্ড, কিডনি, পাকস্থলীর শুষ্কতা দূর করে দেয়।

পশ্চিম জার্মানীতে একটি সেমিনার এবং ওযু

মুলতানের নিশতার মেডিকেল কলেজের ডাক্তার নূর আহমদ বলেছেন, পাশ্চাত্যের দেশসমূহে ডিপ্রেশন বা অবসাদ রোগ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে প্রতিটি মহল্লায় পাগল চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে মানসিক রোগের চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশী ব্যস্ততার মধ্যে থাকেন। পক্ষান্তরে মুসলমানদের মধ্যে এ রোগ খুব কম লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত যেসব মুসলমান ধর্মীয় বিধি বিধান পালন করেন তাদের মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে খুব একটা দেখা যায় না। পাশ্চাত্যের চিকিৎসকরা এর কারণ জানার চেষ্টা করেছেন। কয়েক বছর আগে আমি ফয়সালাবাদ গিয়েছিলাম। সেখানে পাঞ্জাব মেডিকেল কলেজের সামনে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট দোকান খুলেছেন। আমি তার সাথে দেখা করলাম। পশ্চিম জার্মানী থেকে তিনি ডিপ্লোমা করেছেন। তিনি বলেন, জার্মানীর ডাক্তাররা তাকে জানিয়েছেন, অবসাদের চিকিৎসা তারা গতানুগতিক ওষুধের মাধ্যমে নয়; বরং অন্য ব্যবস্থায় পেয়েছেন। পশ্চিম জার্মানীতে এ বিষয়ে একবার একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিলো। আলোচ্যসূচী ছিলো অবসাদের চিকিৎসা ওষুধ ব্যতীত অন্য কী উপায়ে করা যায়? একজন ডাক্তার জানালেন, তিনি অবসাদের রোগীদের কয়েকজনের ওপর পরীক্ষা করেছেন। তাদের প্রতিদিন পাঁচ বার মুখ ধুতে বলেছেন। কয়েক মাস পর দেখা গেলো তারা সুস্থ হয়ে গেছে। সেই ডাক্তার পরে মানসিক রোগীদের আলাদা একটি দল গঠন করেছেন। তাদের হাত পা মুখ দৈনিক পাঁচ বার ধোয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে তাদের মানসিক রোগ দূর হয়ে গিয়েছিলো। আলোচনার শেষ দিকে তিনি এ সিদ্ধান্তে আসেন, হতাশা রোগ মুসলমানদের কম হয়। কারণ তারা প্রতিদিন পাঁচ বার হাত মুখ ধোয়, অর্থাৎ ওযু করে।

সুএ: সুন্নতে নববী ও আধুনিক বিজ্ঞান

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY