মধ্য এশিয়ার ইসলামপ্রিয় মানুষের দেশ তাজিকিস্তান

0
95

কমিউনিজম ছিল আদর্শের ভিত্তি। মানুষের মাঝে এই আদর্শিক চেতনা সাময়িকভাবে স্পন্দন সৃষ্টি করতে পেরেছিল বলেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধু আয়তনে নয়, সমরশক্তির দিক দিয়েও বিশ্বের সেরা দু’টি শক্তির অন্যতম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কল্পনা দিয়ে যত শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি দাঁড় করানো হোক না কেন সত্যিকার অর্থে তা যে ঠুনকো কিছু, তা প্রমাণিত হয় খান খান হয়ে যায় কমিউনিজমের পতনের মধ্যদিয়ে। লেনিনের বিশাল মূর্তি ক্রেন দিয়ে নামানোর সময় একদিকে যেমন ভ্রান্ত একটি মতবাদের কবর রচিত হতে থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তে নীরবে প্রভুর দাসত্বকারী একটি দল বেরিয়ে আসতে থাকেন দীর্ঘ জুলুম, নির্যাতন, নিষ্পেষণের বন্ধ দুয়ার থেকে। পোল্যান্ড থেকে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে রোমানিয়া পেরিয়ে তার ঢেউ লাগে গিয়ে বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়নের গায়ে। মার্কসবাদ লেনিনবাদের সাময়িক দাপটে স্বাধীনতা হারানো বেশ কিছু প্রজাতন্ত্র এসময় বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। ককেশাস অঞ্চলের চেচেন ইঙ্গুশেতিয়া, তাতারস্তান স্বাধীনতার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে এখনো সফল না হলেও তা থেমে যায়নি। তবে মধ্য এশিয়ার যেসব দেশ স্বাধীনতা লাভ করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজার-বাইজান, উজবেকিস্তান ও কাজাকিস্তান।

ক্রমান্বয়ে এসব দেশের পরিচিতি এবং সেখানে মুসলমানদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ‘সোনার বাংলা’র পাঠকদের অবহিত করার প্রয়াস পাব ইন্শা আল্লাহ। তবে প্রথমেই এখানে উপস্থাপন করা হচ্ছে তাজিকিস্তানের অবস্থা।

তাজিকিস্তান : দক্ষিণ-পূর্ব মধ্য এশিয়ার স্থলবেষ্টিত প্রজাতন্ত্র তাজিকিস্তান। দেশটির উত্তরে কিরগিজস্তান, উত্তর ও পশ্চিমে উজবেকিস্তান, পূর্বে গণচীন এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান। দেশের সর্ববৃহৎ শহর দুশানবে। এটি দেশের রাজধানীও বটে। গোর্নো-বাদাখশান স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলটির অবস্থান তাজিকিস্তানেই। এটি দেশটির ৪৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থিত। দেশটির অধিকাংশ লোক তাজিক জাতিগোষ্ঠীর। এরা তাজিক নামের ফার্সি ধরনের একটি বিশেষ ভাষায় কথা বলে। এদের সংখ্যা দেশের জনসংখ্যার ৬২ ভাগ। এছাড়া উজবেক ভাষায় ১৬ শতাংশ এবং রুশ ভাষায় কথা বলে ৫ শতাংশ তাজিকিস্তানী। দেশটিতে ফার্সি ও পশতু ভাষায় কথা বলে এমন লোকও আছে। তবে অফিস-আদালতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রুশ এবং ইংরেজি ভাষারও প্রচলন আছে। দেশটির মুদ্রার নাম সোমোনি এবং দেশটির জনগণের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩শ’ ৮৮ ডলার।

১ লাখ ৪৩ হাজার ১শ’ বর্গকিলোমিটার আয়তনের তাজিকিস্তান ১৯২৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গ হয়ে যায়। তবে ১৯৯১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ফের স্বাধীনতা লাভ করে। এর পরপরই সাম্যবাদী সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। ১৯৯২ সালের দিকে ইসলামপন্থীরা কিছু সময়ের জন্য রাজধানী দুশানবে’র দখল নিলেও তা বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯৭ সালের জুন মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি হয়।

তাজিকিস্তানের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রশাসিত প্রজাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর গড়ে উঠেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট একাধারে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। প্রধানমন্ত্রী থাকলেও তার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার ও ৬০ সদস্যবিশিষ্ট দ্বিকাক্ষিক আইনসভা উভয়ের ওপর ন্যস্ত। ২০০৩ সালের নতুন সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্ট ৭ বছর মেয়াদের জন্য জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও ইমোমালি রাখমন দেশটি শাসন করছেন ১৯৯৪ সাল থেকেই। সংবিধান অনুযায়ী তাজিকিস্তানের বিচারবিভাগ সরকার থেকে পৃথক তথা স্বাধীন।

ভৌগলিক অবস্থান : প্রায় ৯০ শতাংশ পর্বতমালা নিয়ে গড়ে উঠেছে তাজিকিস্তান। আর দেশটির জলভাগের পরিমাণ আয়তনের মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ। দেশটির প্রধান দু’টি পর্বতমালার নাম পামির এবং আলায়। এসব পর্বতমালার হিমবাহ থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন পানির ধারা ও নদী দেশটির খামার ভূমিতে সেচ কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দেশটির উত্তর প্রান্তে মধ্য এশিয়ার আরেক প্রধান পর্বতমালা তিয়ানশানের একাংশ চলে গেছে। পর্বতগুলোর উত্তর ও দক্ষিণে রয়েছে দু’টি নি¤œভূমি অঞ্চল। এখানেই তাজিকরা ব্যাপকভাবে বসবাস করে।

মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল এলাকা সিরদরিয়া নদী বিধৌত ফেরগানা পর্বতমালা ও দক্ষিণে তুর্কিস্তান পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত। দক্ষিণের নিম্নভূমি এলাকাটিতে আমুদরিয়া ও পাঞ্জনদী প্রধান দু’টি নদী।

রাজধানী দুশানবে : দুশানবে একটি সুপ্রাচীন লোকালয়। ১৯২৯ সাল পর্যন্ত এটি মূলত একটি গ্রাম ছিল। ঐ বছর এটিকে নব্য-প্রতিষ্ঠিত তাজিক সোভিয়েত সাম্যবাদী প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বানানো হয় এবং এর নাম দেয়া হয় স্তালিনাবাদ। একই বছরে প্রধান রেলসড়কের সাথে শহরটিকে সংযুক্ত করা হয়। এরপর শহরটির দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটে। ১৯৬১ সালের এর নাম বদলে দুশান্বে রাখা হয় এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর শহরটি স্বাধীন তাজিকিস্তানের রাজধানীতে পরিণত হয়।

জনসংখ্যা : ২০১২ সালের পরিসংখ্যান মতে তাজিকিস্তানের জনসংখ্যা ৭৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮৫ জন। এদের মধ্যে ১৪ বছরের নিচের জনসংখ্যা ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ, ১৫ থেকে ২৪ বছরের ২০ দশমিক ৯ শতাংশ, ২৫ থেকে ৫৪ বছরের জনসংখ্যা ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ৫৫ থেকে ৬৪ বছরের ৪ দশমিক ৩ এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের জনসংখ্যা ৩ দশমমিক ৩ শতাংশ।

তাজিকিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৮২৩ শতাংশ। জন্মহার প্রতি হাজারে ২৫ দশমিক ৯৩ জন এবং মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৬ দশমিক ৪৯ জন। ২০১০ সালের জরিপ অনুযায়ী তাজিকিস্তানের ২৬ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে। ২০০৯ সালের জরিপ মতে দেশের রাজধানী দুশানবেতে ৭ লাখ ৪ হাজার লোক বাস করে। দেশটিতে ২০০৯ সালে হিসাব মতে এইডস রোগীর হার শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। সে সময় এইচআইভি ভাইরাস নিয়ে বেঁচে ছিলেন ৯ হাজার ১শ’ জন এবং ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেন ৫শ’র কিছু বেশি মানুষ।

তাজিকিস্তানের মোট ৯৪ শতাংশ মানুষ স্যানিটেশন সুবিধা ভোগ করেন। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ শহরের এবং ৯৪ শতাংশ গ্রামের মানুষ।

তাজিকিস্তানে খাদ্য ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেশি। এ রোগগুলো হচ্ছে, ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস এ এবং টাইফয়েড জ্বর। এছাড়া ম্যালেরিয়ারও প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

দেশটির ২০০০ সালের শুমারী অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৭৯ দশমিক ৯ ভাগ তাজিক, ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ উজবেক, ১ দশমিক ১ শতাংশ রাশিয়ান, কিরগিজ ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং বাকি ২ দশমিক ৬ শতাংশ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর।

১৫ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স এমন জনগোষ্ঠীর ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ তাজিকিস্তানী পড়তে ও লিখতে জানেন। ২০০৮ সালের হিসেবে মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশই বরাদ্দ ছিল শিক্ষাখাতে। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। মাতৃ মৃত্যুহার প্রতি লাখে ৬৫ জন। ২০০৬ সালের হিসাব মতে ডাক্তার ছিলেন প্রতি হাজারে ২ দশমিক ০১৩ জন। হাসপাতালের বেড সংখ্যা প্রতি হাজারে ৫ দশমিক ৪১টি।

অর্থনীতি : ১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে। যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি নির্ভর অর্থনীতি দেশটিকে সচল রেখেছিল তা একেবারেই ভেঙ্গে যায়। এখনো অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দেশটি। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে তাজিকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বেকারত্বের হার অনেক উঁচুতে। তাজিকদের প্রধান অর্থনৈতিক উৎস হচ্ছে রেমিট্যান্স। তারা মূলত রাশিয়ায় বিভিন্ন কাজে শ্রম দেয়। সেখান থেকেই পরিবারের কাছে অর্থ প্রেরণ করেন। তাজিকিস্তানের মাত্র ৭ শতাংশ জমি আবাদযোগ্য। প্রধান আবাদ হচ্ছে তুলা। সরকার গভীরভাবে নজরদারি করে তুলা উৎপাদনে। ২০০৭ সালে তাজিকিস্তানের ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থলগ্নিকারকদের নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঋণ দিলে আইএমএফ সেখানে তাদের কর্মসূচি স্থগিত করে দেয়। তবে পরবর্তীতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পুরনো ঋণ মওকুফ করে দিয়ে ফের ঋণ দিয়ে তাজিকিস্তানে ফিরে এসেছে আইএমএফ।

তাজিকিস্তানে সোনা, রূপা, ইউরেনিয়াম এবং কিছু দুষ্প্রাপ্য ধাতুর মজুদ রয়েছে। শিল্প বলতে বেশিরভাগই হালকা শিল্প এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও একটি বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম প্ল্যান্ট, পানিবিদ্যুত সুবিধা এবং  কিছু অপ্রচলিত ছোট কারখানা।

ধর্ম : তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যে এটিই একমাত্র দেশ যেখানে ইসলাম ২০০৯ সালে রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা লাভ করে। ২০০৯ সালের মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের হিসেব মতে, দেশটির জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ মুসলমান যাদের ৯৫ শতাংশ সুন্নী এবং ৩ শতাংশ শিয়া। এছাড়া রয়েছে কিছু সূফীবাদী। সুন্নীদের অধিকাংশই হানাফী মাযহাবের অনুসারী। তবে শিয়া মতাবলম্বীদের দাবি অনুযায়ী ২০১০ সালের পর ১ থেকে ২ বছরের ব্যবধানে বিস্ময়করভাবে শিয়া মতাবলম্বীদের হার ১১ থেকে বেড়ে ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে নিরপেক্ষ কোনো সূত্রে এ তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তাজিকিস্তানে ইসলাম : মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারকারী ধর্ম ইসলাম এসেছে সপ্তম শতাব্দীতে আরবদের মাধ্যমে। সে সময় থেকেই ইসলাম তাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়। ইসলামী ও পার্সিয়ান উভয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে স্থাপত্যশৈলী মধ্য এশিয়ায় ব্যাপক প্রসিদ্ধি অর্জন করে। তাজিক জাতির পিতা বলে খ্যাত ইসমাঈল সামানাই এ অঞ্চলে মুসলিম মিশনারীর কার্যক্রমে ব্যাপক সহায়তা করেন। মধ্য এশিয়ার জনগণ ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ শুরু করে, বিশেষ করে তারাজে-আধুনিক যুগে যাকে কাজাখস্তান বলে সবাই চেনে। সোভিয়েত আমলে সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হয়। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর সেখানে ধর্মচর্চার ব্যাপক প্রসার লাভ করে। জনগণকে বেশি বেশি ধর্ম পালনে মনোযোগী দেখা যায়। রমাযান মাসে সাওম পালনকারীর সংখ্যা ৯৯ শতাংশে গিয়ে পৌঁছে। অধিকাংশ শিয়া মুসলিম বিশেষত ইসমাঈলী সম্প্রদায়ের লোকেরা বাস করেন গোর্নো বাদাখশান অঞ্চল এবং উত্তর খাতলুন ও রাজধানী দুশানবেতে।

সুন্নীপন্থী মুসলিমদের তাজিকিস্তানে অবস্থান ১২শ’ বছর ধরে। আর শিয়াদের ক্ষুদ্র একটিগোষ্ঠী পামির ইসমাঈলী সম্প্রদায় যারা দশম শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশ করেছিল তারা এখনও টিকে আছে দূরের পামির পার্বত্যাঞ্চলে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ দিকে বিশেষ করে ১৯৮৯ সালে মিখাইল গর্বাচভের আমলে ইসলাম চর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয়। সে সময় ইসলাম এবং অর্থডক্স খ্রিস্টধর্মের চর্চা বেশ খোলামেলাভাবেই শুরু হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান চালু হয়, মসজিদগুলো খুলে দেয়া হয়, নতুন নতুন মসজিদ নির্মিত হয়। তাশখন্দকে ভিত্তি করে মধ্য এশিয়ায় ইসলামিক বোর্ড গঠিত হয়। বহু আলেম নিভৃতবাস থেকে বেরিয়ে এসে প্রকাশ্যে ওয়াজ নসিহত করতে থাকেন।

১৯৯০ সালে মুসলিম বোর্ড প্রধান সিনিয়র কাজী হাজী তুরাজোনজোদা একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। স্বাধীনতা লাভের পর তিনি দেশের রাজনীতিতেও ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তিনি সাম্যবাদী নীতি পরিহার করে তাজিকিস্তানের রাজনীতিকে ইসলাম নির্ভর করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তিনি তাজিকিস্তানে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠান দাবি তোলেন। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব এমনকি গৃহযুদ্ধ শুরু হয় দেশটিতে। এরপর ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তাকে দেশের উপ-প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি ইমোমালি রাহমন সরকারকে সমর্থন দেন।

তাজিকিস্তানের জনগণ ধর্মভিরু এবং তারা নিজেদের মত করে ধর্মচর্চা করে থাকেন। বিশেষ করে পাশে আফগানিস্তান থাকায় সেখানকার ভাবধারায় প্রভাবান্বিত হয়ে ধর্মচর্চার প্রভাব অত্যধিক। বহু পবিবারের শিশুরা বিদেশে বিশেষ করে আফগানিস্তানে গিয়ে মাদরাসায় শিক্ষাগ্রহণ করে। কিন্তু সরকারের জন্য এটা বিব্রতকর। পশ্চিমা ধাঁচের সরকার অন্য সব দেশের মতো সেখানেও জঙ্গি তালাশ করে থাকে। ২০১০ সালের পরবর্তী বছরগুলোয় সেখানে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন দেশের জনগণকে বিদেশী প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পড়ালেখা না করানোর জন্য পরামর্শ দেন। তার মতে, এর ফলে ভবিষ্যতে সন্তানরা সন্ত্রাসী হয়ে উঠতে পারে।

এর আগে ২০০৫ সালে দেশটির সেক্যুলার স্কুলগুলোয় মেয়েদের হিজাব পরিধানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু দেশটির মহিলারা নিজেদের ঐতিহ্য হিসেবেই হিজাব পরে থাকেন। তবে বয়স্কা মহিলা যারা সাবেক সোভিয়েত ভাবধারায় অভ্যস্ত তাদের মধ্যে হিজার পরিধানের প্রবণতা কিছু কম দেখা যায়। দেশের শিক্ষামন্ত্রী আব্দুদ জাবুর রাখমানভ সেসময় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘‘শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার পরিবর্তে মসজিদে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে। তারা এমনকি সন্ধ্যা বেলাও মসজিদে কাটায়। তাহলে তারা হোমওয়ার্ক করবে কী করে?” তিনি আরো বলেন, ‘‘রমাযান মাসে অনেকে জুমা সালাতের পর ক্লাসেও আসে না।” এসব কথা থেকে তাজিকিস্তানের জনগণের অবস্থা এবং সরকারের অবস্থার একটি মূল্যায়ন পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, তাজিক সরকার সেদেশের শত শত মসজিদকে অনিবন্ধিত হওয়ার অজুহাতে বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক মসজিদকে ধ্বংস করে দিয়েছে এমনকি কিছু মসজিদকে পার্লারে রূপান্তরের ঘটনাও জানা গেছে। সরকারের আশঙ্কা এসব মসজিদ ‘নিরাপদ’ নয় এবং ইমামগণ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে সক্ষম নন।

ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও তাজিকিস্তান সরকারের কিছু উদ্যোগ বিশ্বের মুসলিমদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, তাজিক সরকার ২০০৯ সালকে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ষ হিসেবে পালন করে। সে বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রথিতযশা আলিম-চিন্তাবিদদের আমন্ত্রণ জানায় একটি আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে। ২০১০ সালে বিশ্ব ইসলামী সংস্থা ওআইসির একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে। এতে বিশ্বের ৫৬টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিরা যোগদান করেন। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম একটি মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে রাজধানী দুশানবেতে। কাতারের অর্থায়নে এ মসজিদের নির্মাণকাজ আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY