সমাজ গঠনে একজন নারীর ভূমিকা

0
113

আলোচনার শুরুতে আমি একথা আপনাদের কাছে নিবেদন করেছিলাম যে, সমাজ গঠনে আমাদের নারীরা মূল্যবান কিছু অবদান রাখতে পারে। নারীরা ইচ্ছে করলে সমাজের গোটা কাঠামোটাকে বদলে দিতে না পারলেও বিরাট রকম একটা ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজন শুধু নারীদের দায়িত্বানুভূতির। আমরা যদি মুহূর্তের জন্যেও নিজেদের বিশাল দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হই, তাহলে এ ক্ষয়িষ্ণু সমাজেও আমরা সমাজ গড়ার কাজে হাত দিতে পারি। আজ সর্বাগ্রে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, আমরা আমাদের জীবনের বিভিন্ন স্তরে আল্লাহর তরফ থেকে আরোপিত তথা ইসলাম নির্দেশিত কর্মসূচীসমূহ মেনে চলবো। জীবনের বিভিন্ন স্তরে নারী হিসাবে এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন কিভাবে সম্ভব চলুন এবার সে ব্যাপারে কিছু আলোচনা করা যাক।

আপনার প্রথম জীবন
আপনার প্রথম জীবনে আপনি একজন অবিবাহিতা। আপনার এখনো ঘর-সংসার বিয়ে-শাদী কিছুই হয়নি। একপাল ছেলে-সন্তান ও একটি বিরাট সংসারের দায়িত্ব এখনো আপনার কাঁধে দেয়া হয়নি। এ জীবনে আপনি কিশোরী, উচ্ছল, প্রাণচঞ্চল। আপনার সামনে যে বিশাল ভবিষ্যত আছে, তারই যোগ্য নাগরিক হিসেবে আপনাকে এ সময়ে তৈরী হতে হবে। এ জীবনে আপনাকে আগামী দিনের জন্যে যথার্থ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখবেন, এ সময়ের সামান্য অবহেলাও আপনার জীবনে বিরাট রকমের অভিশাপ বয়ে আনতে পারে।কিশোর বয়সে আপনি একটি মুসলিম পরিবারের সদস্য। আপনি স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। আপনাকে এ সময় যে বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে তা মোটামুটি এইঃ
ক. আপনার এ জীবন যেহেতু প্রস্তুতি গ্রহণের সময়, তাই এ সময়ে আপনাকে নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-চরিত্র সব ক্ষেত্রেই পরবর্তি জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এ সময়ে আপনাকে ক্লাশের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কোরআন হাদীসের চর্চা করতে হবে। পারিবারিক পরিবেশে যদি কোরআন হাদীস পড়ার তেমন সন্তোষজনক কোনো ব্যবস্থা না থাকে তাহলে আপনাকে নিজের থেকেই এ কাজে অগ্রসর হতে হবে। যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে আপনাকে স্কুল জীবনের মধ্যেই শুদ্ধ করে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত শিখতে হবে। যাতে করে কলেজ জীবনে পা দেয়ার আগেই কোরআনের অর্থ বোঝার দিকে মনোযোগী হওয়া যায়। কেননা কলেজ জীবন শেষ করার আগেই আপনাকে অর্থ বোঝার সাথে সাথে তাফসীর অর্থাৎ কোরআনের ব্যাখ্যা বুঝার চেষ্টা করতে হবে। হেদায়াতের এই মহা গ্রন্থটিকে তার মৌল অর্থ ও ব্যাখ্যা সহ পড়া না হলে তা আপনার জীবনে তেমন কোনো কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
কোরআন শরীফের অনুবাদ ও তাফসীর অধ্যয়নের পাশাপাশি আপনি হাদীসের চর্চাও শুরু করবেন। কারণ, হাদীস হচ্ছে মূলত কোরআনেরই ব্যাখ্যা। তাই ইসলামকে সঠিক অর্থে অনুধাবনের জন্যে আপনাকে হাদীসের অধ্যয়ন অবশ্যই চালু রাখতে হবে। এ জন্যে আল্লাহর মেহেরবানীতে এখন কোরআনের যুগোপযোগী বাংলা তাফসীর যেমন বাজারে পাওয়া যায় তেমনি বড়ো বড়ো হাদীসগ্রন্থেরও বাংলা অনুবাদের বাজারে কোনো অভাব নেই।
খ. কোরআন, হাদীস অধ্যয়নের সাথে ইসলামকে এ যুগের জীবন জিজ্ঞাসার আলোকে বুঝার জন্যে আপনাকে ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপক পড়াশুনা করতে হবে। আপনাকে বয়সের এই প্রথমার্ধেই বুঝে নিতে হবে যে, ইসলামই হচ্ছে পৃথিবীর বুকে সর্বোৎকৃষ্ট জীবন বিধান। মানুষের চলার জন্যে যতোগুলো মত ও পথ আছে তন্মধ্যে ইসলামই হচ্ছে চির আধুনিক ও চির প্রগতিশীল। মানুষকে শান্তি ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে দুনিয়ার মানুষেরা যুগে যুগে (বিশেষ করে গত দু’শ’ বছরে) সব মতাদর্শ রচনা করেছে তার কোনোটাই মানুষকে শান্তির ইস্পীতি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। এসব মতবাদ দিনে দিনে মানব সন্তানকে অশান্তির অনলেই নিক্ষেপ করেছে। বিশেষ করে নারী জাতির মুক্তি ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র“তি নিয়ে যেসব মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে তা সবই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।
এ কথাটি ভালো করে জানতে হবে যে, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সব মতবাদেই নারী হচ্ছে পুরুষের নিছক কামনার বস্তু। তাদের নিত্য নতুন ভোগের একটি শারীরিক উপকরণ মাত্র। নারীদের মুক্তি প্রদর্শনের নামে এসব মতাদর্শ নারীত্বের অবমাননা করে পুরুষদের দীর্ঘস্থায়ী গোলামীতেই বরং তাকে আটকে দিয়েছে। এ অবস্থায় মহানবী (স.) প্রদর্শিত ইসলামী মতাদর্শই একমাত্র ব্যবস্থা যেখানে নারী জাতির জন্যে কল্যাণ ও মর্যাদার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। নারী জাতির উচিৎ বাইরের উৎকট চাকচিক্যে মুগ্ধ না হয়ে ইসলামের কল্যাণ ও শান্তির দিকেই এগিয়ে আসা। জীবনের প্রথম বয়সে একথাগুলো বুঝবার জন্যে আপনাকে ইসলামী সাহিত্যের আশ্রয় নিতে হবে।
দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে তা কোনোমতেই ইসলামী শিক্ষা নয়। যদি শিক্ষা ব্যবস্থা ইসলামী হতো তাহলে আপনাকে ইসলাম সম্পর্কে এ সব জ্ঞান অর্জনের জন্যে আজ বাইরে সময় ব্যয় করতে হতো না। আপনি ক্লাশের সিলেবাস থেকেই এসব বিষয় জানতে পারতেন। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় যখন এগুলো নেই তখন আপনাকে মুসলিম ঘরের মেয়ে হিসাবে ইসলামের দাবী ও অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্যে এ সব ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করতেই হবে। তাছাড়া ইসলামী সাহিত্য না পড়লে আপনি ইসলামের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সম্পর্কে কিছুই তো জানতে পারবেন না। এক কথায় ইসলামকে জানা ও বোঝার জন্যে আপনাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইসলামী সাহিত্য পড়াশোনা করতে হবে। আমার এ কথায় কেউ যেন মনে না করেন যে, আপনাকে আপনার ক্লাশের পড়াশোনা সব বাদ দিয়ে রাত দিন শুধু এসব বই নিয়েই পড়ে থাকতে হবে। না, আপনার সময়ের সবটুকু এতে ব্যয় করার দরকার নেই। আপনাকে আপনার দৈনন্দিন সময়সূচী থেকে কিছুটা সময় অন্তত কোরআন, হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য পাঠে ব্যয় করতে হবে। যে বৈদেশিক শিক্ষা আপনার নিছক দুনিয়াবী চাকুরী বাকুরী, মান সম্মান তথা পার্থিব সুযোগ সুবিধা লাভের জন্যে জরুরী, তার জন্যে যেখানে ১৭-১৮ ঘন্টা ব্যয় করেন সেখানে মাত্র ১টি ঘন্টাও কি আপনি কোরআন, হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য পর্যালোচনা তথা পরকালের আসল কল্যাণের জন্যে ব্যয় করতে পারবেন না?
গ. আপনার তৃতীয় কাজ হবে ইসলামী অনুশাসন মোতাবেক নিজের জীবন গঠন করা। শরীয়তের ফরয, ওয়াজেব ও সুন্নাতসমূহকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে আদায় করতে হবে। সাথে সাথে কবিরা গুনাহ থেকে নিজেকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ছোট ছোট পাপ থেকেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করবেন। ছোট-খাট গুনাহ বারবার করলে তাও গুনাহে কবীরায় রূপান্তরিত হয়। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও শরীয়তের হুকুম আহকাম মেনে চলার মাধ্যমে নৈতিক উৎকর্ষ সাধন সম্ভব। এতে আপনার মনে ও বাহ্যিক জীবনে এমন এক তাকওয়া ও দায়িত্বানুভূতি সৃষ্টি হবে, যার আলোকে আপনি ইসলামের ইস্পিত পূর্ণাংগ মানুষে পরিণত হতে পারবেন।
মনে রাখতে হবে, আপনার নিজের জীবনে যদি ইসলাম পুরোপুরি পালিত না হয় তা হলে আপনি অন্যকে কি করে ইসলামের আহ্বান জানাবেন? সুতরাং সর্বাগ্রে আপনার নিজকে একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ঘ. ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ও সে মোতাবেক আমলের কর্মসূচী শুরু করার পর আপনার কাজ হবে আপনার ভাই-বোনদের সত্যের পথে আনার চেষ্টা করা। আপনি যে সত্যের সন্ধান নিজে লাভ করেছেন, যে সত্য আপনার জীবনে এতো বড়ো বিপ্লব সাধন করলো তাকে অন্যদের জীবনেও প্রতিফলিত করার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখবেন এ ব্যাপারে আপনার সবচাইতে কাছের মানুষ হলো আপনার ভাইবোন। আপনার যে ভাইটি স্কুলে যায়, যে বোনটি স্কুল পেরিয়ে সবেমাত্র কলেজে পা দিয়েছে, সর্বোপরি যে ভাইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে তাদের সবার ব্যাপারে আপনার কিছু না কিছু করণীয় আছে। আপনি ইচ্ছে করলে এদের সবাইকে ভালো মানুষে পরিণত করার ব্যাপারে কিছুটা হলেও সহযোগিতা করতে পারেন। ছেলে-মেয়েরা স্কুল কলেজে কতোক্ষণ সময়ই বা কাটায়, খুব বেশী হলে সাত আট ঘন্টা। দিনের বাকী ১৫-১৬ ঘন্টাই সে কাটায় ঘরে, একান্ত আপনারই পাশে। সুতরাং আপনি যদি আপনার কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা ও আপনার নৈতিক চরিত্র দিয়ে তাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন তবে সেইটাই হবে আদর্শ বোন হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড়ো কাজ। এভাবে আপনি যদি আপনার আন্তরিক চেষ্টাকে এ কাজে লাগান তাহলে আপনি আপনার ভাইবোনদের বাইরের পৃথিবীর কুৎসীত ও নোংরা আবহাওয়া থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিতে পারবেন। এমনও হতে পারে যে, একদিন দেখা যাবে বাইরের শত নোংরামী সত্ত্বেও আদর্শ বোনের সাহায্য নিয়ে আপনার ভাইটির চরিত্র আপনি বদলে দিতে পারবেন। মনে রাখবেন, বাইরের পৃথিবীতে চলার জন্যে একটি খাঁটি মুসলিম ভাই কিংবা বোন যদি আপনি সরবরাহ করতে পারেন তাহলে কেয়ামতের দিন আপনার নাজাতের জন্যে তাই হবে যথেষ্ট।
ঙ. ভাইবোনদের পরে আসে আপনার পিতা-মাতা। এ কথা ঠিক পিতা-মাতার ওপর আপনার কোনো হুকুম চলে না। তারা যদি স্পষ্টত অন্যায় করছে বলে আপনি দেখেন তাহলে বলার পরিবেশ না থাকলে আপনি মনে প্রাণে এ অবস্থাকে ঘৃণা করবেন এবং ছোট-বড়ো ভাইবোনদের এ কুৎসীত স্বভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা করবেন, আর যদি বলার পরিবেশ থাকে তাহলে ভদ্র ও নম্রভাবে প্রথমে মৃদু প্রতিবাদ করবেন। যদি অনুভব করেন আপনার মৃদু প্রতিবাদ ফলপ্রসু হচ্ছে তাহলে আপনি খোলাখুলি তাদের সাথে বিষয়টি আলাপ করে নেবেন। তবে এ কথা জেনে রাখতে হবে, পিতা-মাতা আপনার শ্রদ্ধেয়। তাদের সাথে কিছুতেই বেয়াদবী করা যাবে না। তবে কোনো অবস্থায়ই আপনি আল্লাহর নির্ধারিত হারামের ব্যাপারে তাদের আনুগত্য করবেন না। কারণ, আল্লাহর হুকুমের চেয়ে কারো হুকুমই বড়ো নয়।
চ. এর পর আসে আপনার বান্ধবী, সহপাঠী ও আত্নীয় স্বজনের কথা। এদের ক্ষেত্রেও একই কথা। যে ভাবে যাকে পারা যায় তাকেই সঠিক পথের সন্ধান দিতে হবে। আপনি নিজে যে সত্যের সন্ধান লাভ করেছেন তা তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা আপনার দায়িত্ব। কেউ আপনার কথা শুনুক আর নাই শুনুক- আপনাকে আপনার কাজ করেই যেতে হবে। এদের সবার সামনে আপনাকে উন্নত নৈতিক চরিত্রের নমুনা পেশ করতে হবে। এভাবে দিনে দিনে তাদের জীবনেও ইসলাম সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা ও এর প্রতি আকর্ষণ উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে।
আপনার দ্বিতীয় জীবন
আপনার এ জীবনে আপনি একজন বিবাহিতা। এখনো আপনার অনেক কয়টি ছেলে-মেয়ে হয়নি। সংসারের দায়িত্ব এখনো আপনার ঘাড়ে পুরোপুরি এসে চাপেনি। আপনি হয় সদ্য বিবাহিতা, সন্তান হয়নি অথবা আপনি মাত্র দু একটি সন্তানের মা। আপনার ছেলে-মেয়েরা এখনো স্কুল কিংবা কলেজে আসা যাওয়া শুরু করেনি। উভয় অবস্থায় আপনার পরিবারের সদস্য সংখ্যা হবে সীমিত। স্বামী, দেবর, ভাসুর, ননদ ও শ্বশুর-শাশুড়ী এই নিয়েই হয়তো আপনার সংসার। আপনি এ সংসারেরই একজন সদস্য। ছেলে-মেয়ে হলে সে অবস্থায় দু’একটি ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের সদস্য সংখ্যা সামান্য কিছু বৃদ্ধি পাবে। এ উভয় অবস্থায় আপনার জরুরী কিছু কর্তব্য আছে। এসব কর্তব্য আপনাকে যথাযথভাবে পালন করতে হবে। আপনার মনে রাখতে হবে আপনি বাপের বাড়ি থেকে একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে নতুন জায়গায় এসেছেন। এখানে সবাই আপনার কাছে নতুন। এরা সবাই আপনার আচার ব্যবহার সম্পর্কে উৎসাহী। সবার দৃষ্টিই থাকবে আপনার স্বভাব চরিত্রের দিকে। আপনার কথাবার্তা, আপনার আচরণ সব কিছুই এরা লক্ষ্য করবে। এ অবস্থায় সর্ব প্রথম আপনাকে আপনার প্রথম জীবনের অর্জিত শিক্ষানুযায়ী এদের সামনে যদ্দুর সম্ভব উন্নত চরিত্রের নমুনা পেশ করতে হবে।

এ জন্যে আপনার কর্মসূচী
ক. এ পরিবারে সর্ব প্রথম আপনার সম্পর্ক হচ্ছে আপনার স্বামীর সাথে। তার সাথে আপনাকে আপনার বিয়ের আগের জীবনের অর্জিত সমস্ত শিা অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে, তাকে যথোপযুক্ত মর্যাদা প্রদর্শন করতে হবে। প্রীতি ও ভালোবাসা দিয়ে স্বামীর হৃদয় জয় করা, তার সুখে দুঃখে সমভাগী হওয়া আপনার একান্ত কর্তব্য।
আপনার স্বামীই হচ্ছেন আপনার প্রথম ল্য। তাকে সঠিক পথে পরিচালনা করা। তিনি যদি আগে থেকেই সঠিক পথের অনুসারী হয়ে থাকেন তবে তাকে তার পথে অবিচল থাকাতে উৎসাহ ও প্রেরণা যোগানো আপনার এ মুহূর্তের বড়ো একটি কাজ। মনে রাখবেন, আপনি চাইলে আপনার স্বামীকে সহজেই সুপথে আনতে পারেন কিংবা তাকে সুপথে রাখতে পারেন। আপনি যদি তাকে আপনার বিলাস দ্রব্য, ভালো শাড়ী, সোনা গয়না ও অন্যান্য প্রসাধনীর জন্যে বাধ্য না করেন তাহলে স্বভাবত আপনার স্বামী হালাল রোযগারে উৎসাহ পাবে। যদি আপনি সর্বদা এসব জিনিসের জন্যে তাকে উত্যক্ত করেন তাহলে অনিচ্ছা সত্বেও আপনার স্বামী অন্যায় পথে পা বাড়াবে, আর এ ধরনের কিছু করলে তার দায়িত্ব সর্বাংশে কিন্তু আপনাকেই বহন করতে হবে। সুতরাং সর্ব প্রথম আপনি শপথ নেবেন যে, আপনি আপনার স্বামীকে সুপথে রাখার চেষ্টা করবেন। কোনো স্বামীকে সুপথে রাখার জন্যে প্রীতি ও ভালোবাসা দিয়ে তার স্ত্রী যে কাজটুকু করতে পারে অন্য কারো পে তার শতাংশও আঞ্জাম দেয়া সম্ভব নয়।
আপনি আপনার স্বামীর চিন্তাধারা বদলানোর ব্যাপারেও যথেষ্ট সাহায্য করতে পারেন। অবশ্য আল্লাহ তায়ালা না করুন, তেমন কোনো স্বামী যদি আপনার ভাগ্যে থাকে তাহলেই আপনাকে এ কাজ করতে হবে। আপনি আপনার যুক্তি প্রমাণ ও চরিত্র দিয়ে যদি একবার স্বামীর সামনে যথার্থভাবে ইসলামী আদর্শের ছবি তুলে ধরতে পারেন তাহলে আপনার পে এ কাজ করা অনেকটা সহজ হবে।
অনেক সময় এমনও দেখা গেছে, স্বামী বেচারী বিয়ের আগে থেকেই ভালো, সৎ ও দ্বীনদার মানুষ, বিয়ে হয়েছে হয়তো কোনো আধুনিকা নারীর সাথে। অল্প দিনের মধ্যেই দেখা গেলো স্বামীর দ্বীন, ঈমান, ধর্মকর্ম সবই শেষ হয়ে গেছে। আধুনিকা স্ত্রীকে খুশী রাখার জন্যে তিনি তার দ্বীন ধর্ম সবই বিসর্জন দিলেন।
আবার এমনও দেখা গেছে যে, স্বামী বিয়ের আগে ছিলো নিতান্ত বৈষয়িক, ধর্ম বিমুখ-ত্রে বিশেষে ধর্ম বিরোধীও। কিন্তু ন্যায়পরায়ন সতী স্বাধ্বী স্ত্রীর সাহায্যে অল্প দিনের মধ্যেই তার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিলো। এ সবই সম্ভব একজন নারীর সাহায্যে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নারী স্বামীকে যেমন খারাপ করতে পারে তেমনি তাকে ভালো মানুষও বানাতে পারে। আপনাকে প্রতি মূহূর্তেই এ মৌলিক কথাটি স্মরণ রাখতে হবে।
খ. এ পর্যায়ে আপনার দ্বিতীয় সম্পর্ক স্বামীর ছোট ভাইবোনদের সাথে। এদের ব্যাপারেও আপনাকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, এরা কিন্তু কেউ আপনার আপন ভাই বোন নয়, অথচ আল্লাহ তায়ালার বিধান মতে এদের সবাইকেই আপনার আপন করতে হবে। নিজের øেহ মমতা দিয়ে এদের মনে শ্রদ্ধার আসন সৃষ্টি করে নিতে হবে। এদের সুবিধা অসুবিধার খোঁজ খবর নেয়ার মাধ্যমেই আপনি নিজের জন্যে এদের মনে সে আসনটি সৃষ্টি করতে পারেন।
এদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করা ও দুনিয়ার নোংরামী থেকে দূরে রাখা আপনার দায়িত্ব। আপনার নিজের ভাইবোনদের যেমন আপনি বিয়ের আগে সঠিক পথে পরিচালিত করেছিলেন এখানেও আপনাকে একই দায়িত্ব পালন করতে হবে। স্কুল-কলেজগামী দেবর ননদদের ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়ার জন্যে তাদের ইসলামী সাহিত্য পড়তে দিতে পারেন।
এখানে আপন জা’দের কথাও আপনি চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু এদের সবার ব্যাপারে কিছু সাবধানতাও অবলম্বন করা দরকার। বিশেষ করে দেবরদের সম্পর্কে শরীয়তের বিধি নিষেধ ও সীমারেখা সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক হবার প্রয়োজন আছে। এভাবে যদি আপনি আপনার ভাইবোনদের মতো এদেরও ভালো মানুষ করার েেত্র কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন তাহলে তা হবে আপনার জন্যে বড়ো রকমের একটা সাফল্য।
গ. এ পর্যায়ের সর্বশেষ সম্পর্ক হবে আপনার শ্বশুর শাশুড়ীর সাথে। আপনার শ্বশুর শাশুড়ী আপনার শ্রদ্ধেয় মুরুব্বী, নিজের পিতা মাতার সমান। নিজের মা বাপকে যেমন সুন্দর ও ভদ্র ভাষায় আপনি সঠিক পথের কথা বলতেন, এখানেও সে পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে দেখতে পারেন।
আল্লাহ তায়ালা না করুণ তারা যদি ইসলামী আদর্শের প্রতিকূল হন তবেই এ প্রশ্ন আসবে। তাদের কিছু বলার আগে অবশ্যই আপনাকে এ বিষয়টি আপনার স্বামীর সাথে পরামর্শ করে নিতে হবে। তিনি যদি আপত্তি করেন তবে এ ব্যাপারে আপনার অগ্রসর না হওয়াই ভালো। খেয়াল রাখবেন এরা কিন্তু আপনার জন্ম দাতা মা বাপ নয়, এদের ওপর বাপ মায়ের সমান দাবী ও আবদার আপনার চলবে না। সুতরাং আদব লেহাজের কথা চিন্তা করে সময়োপযোগী ব্যবস্থাই আপনাকে নিতে হবে।
ঘ. আপনার কচি কচি বাচ্চাগুলোর সম্পর্কেও এখন থেকেই আপনার সজাগ থাকা দরকার। শিশু অবস্থায় তাদের ওপর যেন অন্য কোনো কুপ্রভাব পড়তে না পারে সে ব্যাপারে আপনি সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। বিশেষ করে যখন বাচ্চা কথা বলতে শিখবে তখন আপনার চেষ্টা থাকবে যেন আপনার সন্তান বাজে ও অশুদ্ধ কথা না শিখে। তাদের আপনি আল্লাহ, রসূল, ভালো ভালো নাম ও ছোট ছোট টুকরো গল্প শুনাতে পারেন।
পরিবেশের প্রভাবে যাতে তারা কোন গালি গালাজের ভাষা শিখতে না পারে তার দিকেও আপনি ল্য রাখবেন। অবশ্য শত চেষ্টা করেও আপনি এ সমাজের আপনার নিজের সন্তানদের পরিবেশের কু প্রভাব থেকে বাঁচাতে পারবেন না। কারণ, এখানকার পরিবেশ এতোই বিষিয়ে উঠেছে যে, ছেলেমেয়ে দু’তিন বছর বয়স থেকেই খারাপ কথা শিখতে ও বলতে শুরু করে। আপনাকে আপনার চেষ্টা করে যেতে হবে, যেটুকু পারবেন না সেটুকুর জন্যে আল্লাহর দরবারে পানাহ চাইবেন। কারণ, সমগ্র পরিবেশকে তো আপনি আমি রাতারাতি বদলে দিতে পারবো না। সে চেষ্টা করার জন্যে আল্লাহ তায়ালাও আমাদের বাধ্য করেননি।
আপনার তৃতীয় জীবন
প্রথম ও দ্বিতীয় জীবন পেরিয়ে এবার আপনি তৃতীয় জীবনে উপনীত হলেন। এ জীবনে আপনি একজন পূর্ণ গৃহিনী। আপনার সংসারে আপনিই এখন ছেলেমেয়ের মা। শ্বশুর শাশুড়ী বেঁচে থাকলেও তারা হয়তো সংসারের দৈনন্দিন দায় দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কার্যত সংসারের ভার এখন আপনার ওপরই। এ জীবনে আপনাকে আগের জীবনের মতো একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হবে না। সাধারণত তেমন একটা প্রয়োজনও দেখা দেয় না। কারণ, আপনার ভাই বোন ও পিতা-মাতা যাদের সাথে আপনি প্রথম সময়গুলো কাটিয়েছেন, দেবর, ভাসুর, ননদ, জা, যাদের সাথে দ্বিতীয় পর্যায়ের জীবন কাটিয়েছেন, এরা কেউই কিন্তু এখন আর আপনার সাথে নেই। এখন আপনার সংসারে তাদের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের দায়িত্ব কিছুটা হ্রাস পেলো।
এ সময় আপনাকে একটা দায়িত্বই বিশেষ গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। সংখ্যার দিক থেকে দায়িত্বের পরিমাণ যদিও কম; কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে অতীতের সবগুলো দায়িত্বের চেয়ে এর মূল্য বেশী। কারণ, এরই ওপর আপনার বিগত জীবনের সমস্ত চেষ্টা সাধনা ও শিার ফলাফল নির্ভর করে। তাই এ সময়টাকে আপনি প্রাকটিক্যাল পরীা বলেই ধরে নিতে পারেন। এ জীবনে আপনার প্রধানতম দায়িত্ব হলো আপনার সন্তানদের মানুষ করা।

সুএ:মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যuntitled-22

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY