হযরত মুহাম্মদ সা.-এর অর্থনীতি ও সংস্কার প্রক্রিয়া

0
75

সৃষ্টির সেরা জীব সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, নবীকুলের শিরোমনি, বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, পথহারা পথিকের পথ প্রদর্শক, ক্ষণজন্মা এক মহান পুরুষ, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংস্কারক হযরত মুহাম্মদ (সা.)। সমস্ত পৃথিবীতে যখন সত্য-মিথ্যার পাপ-পূণ্যের, বিবেক-বুদ্ধির অন্ধ বিশ্বাসের জ্বালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ তায়ালার ঐশী বাণী নিয়ে সংস্কারক হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে আগমন করেন। অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে তিনি সংস্কারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সকল ক্ষেত্রে তিনি অর্থনৈতিক মুক্তি সাধিত করেছেন। মাত্র ২০ বছরে তার দূরদর্শীতা দিয়ে তিনি সভ্যতা বিবর্জিত কুসংস্কারচ্ছন্ন, পৌত্তলিক আরব জাতিকে এক সুসভ্য জাতিতে পরিণত করেছেন। তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক রেমগুলার্জ বলেছেন, “The Founder of Islam is in fact, the promoter of the first social and International revolution of which listory gives mention.”
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ, মাতার নাম আমিনা। তিনি বিশ্বনবী, মহান আল্লাহতায়ালার বন্ধু। তিনি মাত্র ৪০ বছর বয়সে নবুয়তপ্রাপ্ত হন। তিনি সফল রাষ্ট্রনায়ক।
সংস্কারক ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) : কবির ভাষায় বলতে হয় দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যারা দুর্জয়ে করে জয়
তাহাদের পরিচয় লিখে রাখে মহাকাল
হযরত মুহাম্মদ (সা.) একজন মহান সংস্কারক ছিলেন। তার হাতের পরশে মুহূর্তেই পাল্টে যায় আরবের চির চেনা দৃশ্য। আরবের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দূরবস্থা তাকে স্পর্শ করেনি বরং একটি সুসংহত সরকার গঠন এবং সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবনধারণ সম্পর্কে তাদের পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করেন। হত্যা, লুণ্ঠন, ব্যভিচার ছিল তাদের নিত্য কাজ। তারা মানুষ হত্যা করে আনন্দ পেত। সে সময় আরবদের কোন প্রকার কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সুক্ষ্ম ধর্মীয় অনুভূতি ছিল না। তাই সেই যুগকে আইয়ামে জাহিলিয়া যুগ বলা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে Philip Kounie Hitti  বলেছেন, “The tern Jajiliyah usually rendered time of Ignorance or barbarism in reality means the period in which Arabia had no dispensation, no revealed Book.” এই যুগে হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরব বিশ্বে যে অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করেন তা পরবর্তীতে বিশ্বের অর্থনীতিবিদদের নিকট আদর্শ হয়ে থাকে। ইসলামী অর্থনীতি ব্যবস্থা প্রচলন করে তিনি সমাজ ব্যবস্থাকে পাল্টে দিয়েছেন।
ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি নিরাপত্তা ও মুক্তি। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলামী অর্থনীতি হল এই পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থারই একটি অংশ। ইসলামী জীবন ব্যবস্থা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের পার্থিব জীবনে আদান-প্রদান, আয়-ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি এর অন্তর্ভুক্ত। মানুষ কিভাবে অর্থ উপার্জন করবে, কিভাবে ব্যয় করবে, কিভাবে ভোগ করবে সে সম্পর্কে ইসলামে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে অর্থনীতির সংস্কার করেন।
অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা.) জাহেলিয়া যুগে আরবদের কোনরূপ সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল না। বেশিরভাগ মানুষ পশু পালন ও লুটতরাজ করে জীবন নির্বাহ করত। চড়া হারে সুদ প্রথা প্রচলন ছিল। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ধন- বৈষম্য দূর করে সঞ্চয় ও বণ্টনের সামঞ্জস্য বিধান করেন। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পদে যাতে জনসাধারণের অধিকার ও ভোগ করার সুযোগ থাকে তার জন্য তিনি পাঁচ প্রকারের রাজস্বের প্রবর্তন করেন। এছাড়াও তিনি নি¤েœাক্ত অর্থনৈতিক সংস্কার করেন।
১. আল-গনিমাহ : যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি, যথা- অশ্ব, উট, রসদ-পণ্য, অস্ত্র-শাস্ত্র প্রভৃতি। এগুলো নিয়মানুযায়ী মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন এবং রাকোষে বা বায়তুলমালে জমা দেয়া হতো।
২. যাকাত : যাকাতের আবিধানিক অর্থ পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, পরিশুদ্ধি। শরীয়তের পরিভাষায়, মুসলমানদের ধন-সম্পদের এটি নির্দিষ্ট অংশ বছর পূর্তিতে আল্লাহর নির্ধারিত খাতসমূহে প্রদান করাকে যাকাত বলে। যাকাত অস্বীকার করা আল্লাহকে অস্বীকার করার শামিল। যাকাত দানের মুখ্য উদ্দেশ্য হল গরীবদের অবস্থার পরিবর্তন করা, যাতে তারা আর্থিকভাবে সচ্ছলতা লাভ করতে পারে, অভাব থেকে মুক্তি পায়।
৩. খারাজ : খারাজ অর্থ ভূমিকর। কারাজ অমুসলমানদের নিকট থেকে ভূমিকর আদায় করার প্রক্রিয়া। আরবে যারা অমুসলমান ছিলেন তারা নিয়মিত ভূমিকর দিতেন না। যার যার ইচ্ছামত জায়গা নিতেন। ফলে মহানবী (সা.) খারাজ আদায় করে অর্থনৈতিক সমতা বিধান করেন।
৪. জিজিয়া : জিজিয়া অর্থ বিনিময়। অমুসলমানদের নিকট থেকে যাকাতের রূপ বছরে একবার অর্থ নেয়া, নিরাপত্তা কর। তিনি তৎকালীন আরবের নিরাপত্তা কার্যে নিয়োজিত সদস্যদের জন্য অর্থ ব্যয় করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেন এবং নিরাপত্তা কাজে ব্যয় করতেন।
৫. আল-ফে : রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হতে আদায়কৃত অর্থ আল-ফে নামে পরিচিত ছিল। এই অর্থ গরীব জনগণ ও রাষ্ট্রের মঙ্গলের কাজে ব্যয় করা হত।
৬. বায়তুলমাল : জাহিলিয়া যুগে কোন সরকারি কোষাগার ছিল না। একটি দেশের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির নির্ভর করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর। তিনি আরবের যাবতীয় অফিস আদালত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বায়তুল মাল বা সরকারি অর্থ তহবিল গঠন করেন। তখন যে কোন অসহায় ব্যক্তির রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে এ তহবিল থেকে অর্থর যোগান দেয়া হত।
৭. সুদমুক্ত অর্থনীতি : জাহিলিয়া যুগে সুদ গ্রহণ ছিল তাদের নিত্য ব্যাপার। সুদ বা রিবা বলতে কোন পরিশ্রম না করে অর্থ শোষণ করা এবং মানুষের অসহায়তার সুযোগ দিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা। মানুষের অভাব ও অসহায়তা ইসলাম সমর্থন করে না। তাই ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা ব্যবসায়কে হালাল করেছেন। আর সুদকে হারাম করেছেন।
৮. অবৈধ উপার্জন নিষিদ্ধ : মহানবী (সা.) সকল প্রকার অবৈধ উপার্জন নিষিদ্ধ করেছেন। ইসলামে অবৈধ উপার্জনের কোন স্বীকৃতি নেই। এ জন্য ইসলামে সুদ, ঘুষ, মদ, কালোবাজারি, মুনাফাখোরি, মজুতদারি, প্রভৃতি অবৈধ ও অন্যায় পথে অর্থ উপার্জন সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা উত্তম ও পবিত্র বস্তু খাও, যা আমি তোমাদের জীবিকারূপে দান করেছি।” (সূরা আল বাকারা : ১৭৭)
৯. শ্রমের মর্যাদা : মহানবী (সা.) শ্রমের মর্যাদা বিশেষভাবে দিয়ে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। ইসলামে শ্রমিক শোষণ নিষিদ্ধ। মহানবী (সা.) বলেছেন , “শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তার মজুরি পরিশোধ কর।” শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণ করে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে মহানবী উচ্চ স্থানে নিয়ে গিয়েছেন।
১০. সম্পদের ন্যায্য বণ্টন : ইসলামী অর্থনীতিতে সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের ব্যবস্থা রয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘সম্পদ যেন মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়” (আল কোরআন)
অত্যন্ত নিপুণতার সাথে হযরত মুহাম্মদ (সা.) দুর্ধর্ষ পৌত্তলিক আবরদের একটি সুশৃঙ্খল, সুসভ্য ও দিগি¦জয়ী জাতিতে পরিণত করে। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে তিনি অর্থনীতি সংস্কার করেছেন। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এবং ইসলামী শরীয়তের ভিত্তিতে মানুষের সকল অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। Philip Kounie Hitti  বলেছেন, “With in a brief span of mortal life Muhammad (sm) called forth out of unpromising material a nation never united before in a country that was hither to but a geographical expression”.
লেখক :নাজমুল হক

রোভার স্কাউট ও কলাম লেখক

সৌজন্যে: ইনকিলাব

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY