কল্পিত চিত্র

0
83

 

আমাদের যুগে কল্পনার ওপর ভর করে প্রাচীনকালের মানুষদের চিত্র নির্মাণের কাজ ব্যাপক হতে চলেছে। কিছু দিন আগে রিডার্স ডাইজেস্টে এ প্রসঙ্গে একটি মনোমুগ্ধকর ঘটনা দৃষ্টিগোচর হয়েছিলো। উত্সাহী পাঠকদের জন্যে ঘটনাটি এখানে পেশ করছি।

বোনী চেম্বারলেন এক বৃদ্ধ পাদরীর সূত্রে বর্ণনা করেন, কয়েক শতাব্দী আগে সিসিলির এক গির্জা কর্তৃপক্ষ এক চিত্রকরকে কিছু দেয়াল চিত্র নির্মাণের কথা বলেন। এতে গির্জা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিলো, দেয়ালে হযরত ঈসা মাসীহ আলাইহিস সালামের জীবনের মোটামুটি একটা চিত্র উপস্থাপন করা।

এসব চিত্র নির্মাণের জন্যে চিত্রকর প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেছেন। দেখতে দেখতে প্রায় সব চিত্রের নির্মাণ কাজই প–র্ণ হয়ে যায়। তখনও দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র নির্মাণ কাজ অবশিষ্ট ছিলো, যা ব্যতীত হযরত ঈসা মাসীহ আলাইহিস সালামের জীবন সম্পর্কিত মোটামুটি ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এ দুটি চিত্রের একটি ছিলো তার শৈশবকালের চিত্র, অন্যটি ছিলো ইয়াহুদা এস্কারাইউতীর।

ইয়াহুদা এস্কারাইউতী হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সে হাওয়ারী, যার সম্পর্কে ইনজীল কিতাবে লেখা রয়েছে, সে মাত্র ত্রিশ টাকার লোভে হযরত ঈসা মসীহ আলাইহিস সালামকে ধরিয়ে দিয়েছে।

দুটি চিত্র এমন ছিলো, যার যথার্থ নমুনা চিত্রকরের বুঝে আসছিলো না। এ জন্যে সে কোথাও এমন দু’টো চেহারা খোজ করে ফিরছিলো, যাদের ছবি এ দুই জনের ওপর যথার্থরূপে প্রয়োগ করা যায়।

একদিন চিত্রকর শহরের এক সড়ক অতিক্রম করছিলো। এ সময় তার দৃষ্টি পড়ে একটি বার বছর বয়সী ছেলের ওপর, যে নিজের সঙ্গী সাথীদের সাথে গলিতে খেলছিলো। চিত্রকরের দৃষ্টি ছেলেটির ওপর স্থির হয়ে যায়। সে এ নিষ্পাপ চেহারাকে হযরত ঈসা মাসীহ আলাইহিস সালামের ছবির জন্যে অত্যন্ত উপযোগী পেয়ে ছেলেটিকে তার সাথে যাওয়ার জন্যে উদ্দীপিত করে। অবশেষে তাকে বাড়ীতে এনে সে তার চিত্র নির্মাণ শুরু করে। কয়েক দিনেই এ চিত্র নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে যায়, এতে করে এক সমস্যার সমাধান হয়, কিন্তু এখনও ইয়াহুদা এস্কারাইউতীর চিত্র নির্মাণ সমস্যার সমাধান বাকী ছিলো। এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘকাল পর্যন্ত সে কোনো যথাযোগ্য চেহারা পায়নি। অনেক লোক, যারা নিজেদের অত্যন্ত খবিস স্বভাবের মনে করতো, তারা ইয়াহুদা এস্কারাইউতীর ছবি নির্মাণের জন্যে নিজেকে চিত্রকরের সম্মুখে উপস্থাপন করে, কিন্তু তাদের কাউকেই চিত্রকরের পছন্দ হয়নি। সে ইয়াহুদা এস্কারাইউতীর জন্যে এমন চিত্র নির্মাণ করতে চাচ্ছিলো, যাকে দেখেই মানুষ চীত্কার করে বলে ওঠবে, হাঁ হাঁ, এ ব্যক্তি যথার্থই লোভ লালসার প্রতিমূর্তি, গোমরাহীর প্রতীক। এরকম চেহারার অন্বেষণে চিত্রকরের কয়েক বছর কেটে যায়।

একদিন বেলা তিন প্রহরের সময় চিত্রকর এক মদের আড্ডায় বসা ছিলো। হঠাত্ দেউড়ির সামনে হালকাপাতলা দুর্বল এক লোককে দেখা যায়। যার চেহারা থেকে ভীতি শংকা এবং বীভত্সতার নিদর্শন অত্যন্ত খারাপভাবে ঠিকরে পড়ছিলো। সে কম্পিত পদভাবে শুঁড়িখানার চৌকাঠের ভেতর প্রবেশ করে এবং একজন ভিখারীর ন্যায় আওয়ায উঁচিয়ে বলে— মদ মদ।

চিত্রকর লোকটিকে দেখে তার চেহারায় এমন প্রত্যেকটি গোনাহের প্রতিবিম্ব দেখতে পায় যা একজন আদম সন্তান করতে পারে। সে লোকটিকে দেখে আনন্দে নেচে ওঠে। সে লোকটিকে বলল, তুমি আমার সঙ্গে এসো, তোমাকে আমি মদ দেবো।

তাকে ঘরে এনে চিত্রকর ছবি বানানো শুরু করে। সে নীরব নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতো আর চিত্রকর তার ছবি নির্মাণ করতো। চিত্র নির্মাণ যখন পূর্ণ হয়ে আসছিলো, তখন একদিন চিত্রকর দেখতে পেলো, নিজের চেহারা দেখে লোকটির মুখমন্ডলে ভীতি শংকা, বিস্ময় এবং অস্থিরতার নির্দশন সৃষ্টি হতে লাগলো। চিত্রকর তাকে জিজ্ঞেস করলো, কি ব্যাপার? তোমার চেহারায় ভীতি, শংকা, অস্থিরতার এ নিদর্শন কেন?

লোকটি কিছু সময়ের জন্যে উভয় হাতে নিজের মাথা ধরে রেখে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, আমাকে তুমি কিছুটা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করো। আমাকে তুমি চিনতে পারছো না? কয়েক বছর আগে হযরত ঈসা মাসীহ আলাইহিস সালামের শৈশবকালের ছবি নির্মাণের জন্যে তুমি আমার চেহারাই নির্বাচন করেছিলে।

(রিডার্স ডাইজেস্ট, মে ১৯৬৩, সূএ: স্যাটারডে রিভিউ, ১৪ মার্চ, ১৯৪২)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY