সন্তান মানুষ করা নারীর সবচেয়ে বড়ো কাজ

0
171

যদি বলা যায় যে, নারীর সবচেয়ে বড়ো কাজ হচ্ছে তার সন্তান মানুষ করা তাহলে মোটেই অত্যুক্তি করা হবে না। নারীর জীবনের এই তৃতীয় পর্যায়ে তাকে তার সমস্ত চেষ্টা সাধনা এ কাজেই নিয়োজিত করতে হবে, ছেলেমেয়েদের মানুষ বানাতে হবে। মায়ের আদর সোহাগে, শাসন প্রশাসনে যদি ছেলেমেয়ে সঠিক অর্থে মানুষ হিসাবে গড়ে না ওঠে তাহলে তাদের ভবিষ্যতে কোনোদিনই আদর্শ নাগরিক হয়ে জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। আসলে মা হচ্ছেন সন্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, জীবন পথের বড়ো আদর্শ। মা তার ছেলে মেয়েদের যেভাবে গড়ে তুলবেন আগামী কাল তারা সেভাবেই গড়ে উঠবে।
সন্তান যখন মায়ের কোলে আসে তখন তার অবস্থা থাকে একটা কাঁচা মাটির ঢেলার মতো। মা তাকে তার আদর, সোহাগ, শাসন, নিয়ন্ত্রণ দিয়ে মনের মতো করে গড়ে তোলেন। এমনটি খুব কমই দেখা যায় যে মা আজীবন নিজের পুত পবিত্র চরিত্র দিয়ে সন্তানকে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন অথচ সে সন্তান মানুষ হয়নি। ক্ষেএ বিশেষে এর যে ব্যতিক্রম নেই, তা আমি বলছি না। আমাদের পরিবেশ এতোই দুষিত যে, এর পাশে শত রকমের চেষ্টাও অনেক সময় ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়ে যায়। ব্যতিক্রমকে নিয়ে যেমন আমাদের চলা নয় তেমনি সেই ব্যতিক্রম বিষয়টি আমাদের কোনো কাম্যও নয়। মায়ের আদর্শে সন্তান গড়ে ওঠে বলে সমাজে যে কথাটি প্রচলিত আছে তা আসলেই সর্বাংশে সত্য। মা হিসাবে আপনাকে এ কথা সিদ্ধান্ত করতে হবে যে, আপনার সন্তানকে আপনি ভালো মানুষ করবেন। এ ব্যাপারে আপনার কর্মসূচী হবে,
ক. ছেলেমেয়েরা বড়ো হবার সাথে সাথে তাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান দানের চেষ্টা করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শিা ব্যবস্থা ইসলামী না হওয়ায় এ দায়িত্ব আপনাকে ঘরের ভেতরেই আঞ্জাম দিতে হবে। সন্তানের প্রথম বয়সেই তা আল্লাহ, রসূল, পরকাল ও আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করার একটি আন্তরিক আগ্রহ তার মনে সৃষ্টি করতে হবে। যদি বাল্য বয়সেই আপনি এসব কথা তাকে যথার্থভাবে অনুধাবন করাতে পারেন তাহলে সারা জীবন সে এর ফলাফল ভোগ করবে।
খ. ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান দান করার সাথে সাথে তার জীবনেও ইসলাম প্রতিফলিত করার চেষ্টা করে যেতে হবে। তাকে প্রথম বয়সেই নামায, রোযা ও শরীয়তের অন্যান্য অনুশাসন মেনে চলার তাগিদ দেবেন। প্রথম বয়সে তাকে কোরআন শরীফের সহিহ শুদ্ধ তেলাওয়াত শিা দেবেন এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তাকে দু’একটি করে হাদীসও পাঠ করাতে শুরু করবেন। এগুলোকে তার জীবনে যথাযথ প্রতিফলিত করার জন্যে আপনাকেই সচেষ্ট হতে হবে।
গ. আপনার ছেলেমেয়েদের আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার জন্যে আপনি তাদেরকে নবী রসূলদের গল্প, আখেরাতের দৃশ্যসম্বলিত কথাবার্তা, অতীত মোজাহেদদের গল্প শোনাতে পারেন। এসব গল্পের মাধ্যমে তাদের সত্যিকার মুসলমান করে তোলার চেষ্টা করবেন। গল্প শোনাবার ব্যাপারে তাদের বয়স, যোগ্যতা ও অনুধাবন শক্তিকে অবশ্যই সামনে রাখা দরকার। আপনি যদি সাবধান ও সচেষ্ট হন তাহলে এ গল্পের মাধ্যমে তাকে ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছুই শিা দিতে পারেন। মুসলমানদের অতীত ইতিহাসে যে সব বীর মোজাহেদ সত্যের জন্যে নিজেদের জীবন দিয়েছেন তাদের কাহিনীই আপনার বেশী কাজে লাগাতে হবে। ইসলামের জেহাদ, জেহাদের ময়দানে শহীদ হওয়া, শাহাদাতের মর্যাদা ইত্যাদি যদি এখনি তাদের মনে বসিয়ে দিতে পারেন তাহলে এইটাই পরবর্তীকালে তাকে সঠিক পথে চলা ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সর্বস্ব কোরবান করার ব্যাপারে উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাবে।
ঘ. ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনে ধোকা, প্রতারণা, মিথ্যা, শঠতা ও প্রতিশ্র“তি ভংগ করার অশুভ প্রতিক্রিয়াও আপনি তাদের জানাতে পারেন। ইচ্ছে করলে আপনি বিভিন্ন গল্পের আকারে এগুলো তাদের শোনাতে পারেন। এভাবে যে ছেলেমেয়ে ছোট বেলায় এসব জঘন্য কাজগুলোর ব্যাপারে সাবধান হবে তারা বড়ো হয়ে কিছুতেই ধোকাবাজ রাজনীতিক, মুনাফাখোর অর্থনীতিক কিংবা মিথ্যাবাদী সমাজবিদ হবে না।
এরা রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি যাই করুক, আশা করা যায় এসব অন্যায় থেকে দূরে থেকেই তা করবে। ছেলে বয়সে এসব ধারণাকে মনের মধ্যে বদ্ধমূল করে দিতে পারলে তাদের আগামী দিনে আদর্শ নাগরিক ও সৈনিক হয়ে জীবন যাপন করা সহজ হবে।
ময়দানে লড়াই করার মতো একদল দক্ষ ও খাঁটি সৈনিক যিনি সরবরাহ করতে পারেন তার চেয়ে কি যুদ্ধ পরিচালকের কাজ বেশী গুরুত্বপূর্ণ? এ জন্যেই বলা হয়, মায়েরাই যুগে যুগে ইতিহাস খ্যাত মানুষ তৈরী করে তারা নিজেরাই এক একটা স্বতন্ত্র ইতিহাসে পরিণত হয়েছেন।
আপনারা অনেকেই আমাদের ইতিহাসের মহিয়সী নারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের মা, মওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর মায়ের কাহিনী জানেন। এভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে আপনি দেখবেন আরো হাজারো কাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এগুলোর আলোকে আপনি আপনার কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হতে পারেন।
ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ে এমন মায়েদের কথাও আপনার কানে আসবে যারা কাবার গেলাফ ধরে মোনাজাত করেছেন, হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে তুমি শহীদের মর্যাদা দাও। কারণ, এসব মায়েরা জানেন, যে বীর মাতা শহীদ সন্তান গর্ভে ধারণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাত দেবেন, দোযখের কঠিন আযাব তার জন্যে হারাম হয়ে যাবে।
প্রতি মুহূর্তেই আপনি একথা মনে রাখবেন-‘আপনার সন্তানের চিন্তা চেতনা, চরিত্র, আপনার সন্তানের কাজকর্ম, আচার আচরণ, চাল চলন উত্তম হওয়ার ওপরই আপনার নারী জনমের সবটুকু স্বার্থকতা নির্ভর করে। আপনি নিশ্চয়ই মহানবী (স.)-এর সে হাদীসটির কথা শুনেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ মরে গেলে তার আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়। যে তিনটি বিষয়ের ফল তার মৃত্যুর পরও জারী থাকে তন্মধ্যে একটি হচ্ছে সু-সন্তান। সু-সন্তান পৃথিবীতে রেখে গেলে মৃত্যুর পরও আপনার কবরে আপনার সন্তানের নেক আমলের সমপরিমাণ নেকী পৌঁছাতে থাকবে। আপনার রেখে যাওয়া সু-সন্তান যতোগুলো ভালো কাজ করবে, তাদের দেখাদেখি আরো যারা তাদের অনুসরণে ভালো কাজ করবে তাদের সমপরিমাণ সওয়াব আপনিও পাবেন।
ঠিক এ ভাবে যদি কেউ কু-সন্তান রেখে যান তাহলে তার পরিণামও একই ভাবে তাকে ভোগ করতে হবে। আপনার বেহেশতে যাওয়া-আপনার দোযখ থেকে মুক্তি লাভ করা বহুলাংশে নির্ভর করে আপনার সু-সন্তান অর্থাৎ খাঁটি মুসলিম সন্তান রেখে যাওয়ার ওপর। আপনি এ ব্যাপারে সচেতন হলে আল্লাহর কাছেও যেমন আপনার মর্যাদা বাড়বে তেমনি জাতির জন্যেও এটি হবে বিরাট একটা অবদান। বলতে গেলে একটি সু-সন্তান তৈরী করার ওপরই আগামী দিনের একটি জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে। আপনার সন্তানকে বাইরের কুৎসিত পরিবেশ ও যাবতীয় নোংরামী থেকে দূরে রাখার কাজ এখন থেকেই শুরু করুন এবং তার সফলতার জন্যে-সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY