আল্লাহর রসূলের আবির্ভাবঃ পবিত্র জীবনের চল্লিশ বছরঃ ফুজারের যুদ্ধ

0
123

ফুজারের যুদ্ধ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন পনেরো বছর, তখন ফুজারের যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে একদিকে কোরায়শ এবং তাদের সাথে ছিলো বনু কেনানা। অন্যদিকে ছিলো কায়স আয়লান গোত্র। কোরায়শ এবং কেনানার সেনাপ্রধান ছিলো হারব ইবনে উমাইয়া। বয়স এবং বংশ মর্যাদার কারণে কোরায়শের কাছে সে সন্মানের পাত্র ছিলো। বনু কেনানাও তাকে সন্মান করতো। যুদ্ধের প্রথম প্রহরে কেনানার ওপর কায়সের পাল্লা ভারি ছিলো, কিন্তু দুপুর হতে না হতেই কায়সের ওপর কেনানার পাল্লা ভারি হয়ে পড়ে। এ যুীকে ফুজারের যুদ্ধ বলা হয়। কারণ, এতে হরম এবং হারাম মাস উভয়ের সন্মান বিনষ্ট করা হয়েছিলো। এ যুদ্ধে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি চাচাদের হাতে তীর তুলে দিতেন।
হেলফুল ফুযুল
ফুজার যুদ্ধের পর হারাম মাস যিলকদ হেলফুল ফুযুল গঠিত হয়। কোরায়শের কয়েকটি গোত্র, যেমন বনী হাশেম, বনী মোত্তালেব, বনী আসাদ ইবনে আবদুল ওযযা, বনী যোহরা ইবনে কেলাব এবং বনু তাইম ইবনে হেলফুল ফুযুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ উদ্যোগ৩ারা সবাই আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন তাইমীর ঘরে একত্রিত হন। কেননা, বয়স এবং আভিজাত্যে তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রীেয়। সেখানে সমবেতরা পরস্পর এ মর্মে অংগীকার করলেন, মক্কায় সংঘটিত যে কোনো প্রকার যুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ করবেন। সে অত্যাচারিত হোক মক্কার অধিবাসী বা বাইরের কেউ হোক, সবাই তার সাহায্যার্থ দাঁড়াবেন এবং তার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে। এ সমাবেশে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও উপস্থিত ছিলেন। রেসালাতের মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার পর এ সমাবেশের উল্লেখ করে তিনি বলতেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন এক চুক্তিতে শরীক ছিলাম, যার বিনিময়ে লাল উটও আমার পছন্দ নয়। ইসলামী যুগে সে চুক্তির জন্যে যদি আমাকে ডাকা হতো, তবে অবশ্যই আমি সে ডাকে সাড়া দিতাম। এ চুক্তির প্রাণসত্তা গোত্রীয় পক্ষপাতিত্বের গভীর থেকে উত্থিত জাহেলী দম্ভ অহংকারের বিরোধী ছিলো। এ চুক্তির কারণ এটাই বলা হয়ে থাকে যে, যোবায়দ গোত্রের এক লোক কিছু জিনিস নিয়ে মক্কায় এসেছিলো। আস ইবনে ওয়ায়েল তার কাছ থেকে সে জিনিস ক্রয় করে, কিন্তু তার মূল্য পরিশোধ করেনি। আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছে জিনিস বিক্রেতা যোবায়দ বংশের লোকটি আবদুদ দার, মাখযুম, জুমাহ, ছাহাম এবং আদী গোত্রের কাছে সাহায্যের আবেদন জানায়, কিন্তু কেউ এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়নি। এরপর সে লোকটি আবু কোবায়স পাহাড়ে উঠে উচ্চ স্বরে কয়েক ছত্র কবিতা আবৃত্তি করে তার প্রতি অত্যাচারের কাহিনী বর্ণনা করে।
এতে যোবায়র ইবনে আবদুল মোত্তালেব ছুটোছুটি করে বললেন, কেউ এ লোকটির বন্ধু সাহায্যকারী নেই কেন? তার চেষ্টায় উল্লেখিত কয়েকটি গোত্র একত্রিত হয়। প্রথমে তারা চুক্তি করে পরে আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছ থেকে যোবায়দ বংশের লোকটির বিক্রীত পণ্যের মূল্য আদায় করে দেয়।
সংগ্রামী জীবন যাপন
তরুণ বয়সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দিষ্ট কোন কাজ ছিলো না। তবে খবরে মোতাওয়াতের (অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিক বর্ণনা) থেকে জানা যায়, তিনি বকরী চরাতেন। তিনি বনী সা’দ গোত্রে এবং মক্কাতেও বকরী চরিয়েছিলেন। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি মক্কার বিভিন্ন লোকের বকরী চরাতেন।২২ পঁচিশ বছর বয়সে তিনি হযরত খাদিজা (রা.)-এর বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে সিরিয়া সফর করেন। ইবনে ইসহাক (র.)-এর বর্ণনামতে, খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদ একজন অভিজাত ও ধনবতী মহিলা ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি মানুষকে মোদারাবা (পুঁজি ও শ্রম) পীতিতে ব্যবসায়ের পুঁজি দিতেন, লাভের একটা অংশ তিনি গ্রহণ করতেন। সমগ্র কোরায়শ গোত্রই ব্যবসা করতো। নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমানতদারী, সততা ও সচ্চরিত্রতার কথা শুনে বিবি খাদিজা তাঁকে ক্রীতদাস মায়সারাকে সথে নিয়ে সিরিয়ায় যাওয়ার প্রস্তাব দেন। বিবি খাদিজা একথাও বললেন, অন্য লোকদের তিনি যে পারিশ্রমিক দিয়ে থাকেন, নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার চেয়ে বেশি দেবেন। তিনি খাদিজার প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং ব্যবসায় পণ্যসহ তাঁর ক্রীতদাস মায়সারাকে সাথে করে সিরিয়ায় গমন করেন।
বিবি খাদিজার সাথে বিয়ে
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাণিজ্যিক সফর থেকে ফিরে আসার পর বিবি খাদিজা নিজের সম্পদে এমন আমানত ও বরকত লক্ষ্য করেন, যা অতীতে কখনো করেননি। এছাড়া তিনি ভৃত্য মায়সারার কাছে রসূল (স.)-এর উন্নত চরিত্র, সততা, আমানতদারী ইত্যাদির ভূয়সী প্রশংসা শোনেন। এসব শুনে খাদিজা (রা.)-এর কাম্য বিষয় হাতের নাগালে এসে যায়। এর আগে বড়ো বড়ো সর্দার এবং নেতৃস্থানীয় লোক বিবি খাদিজাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো প্রস্তাবই তিনি গ্রহণ করেননি। তিনি নিজের মনের গোপন ইচ্ছার কথা তাঁর বান্ধবী নাফিসা বিনতে মোনব্বেহের কাছে ব্য৩ করেন। নাফিসা গিয়ে এ বিষয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলেন। তিনি রাযি হন এবং তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করেন। চাচারা খাদিজার চাচার সাথে আলোচনা করেন বিয়ের প্রস্তাব দেন। এরপর যথারীতি বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এ বিয়েতে বনী হাশেম এবং মোযার গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্য৩িরা উপস্থিত ছিলেন। সিরিয়া থেকে বাণিজ্যিক সফর শেষে ফিরে আসার দুই মাস পর এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ের মোহরানা হিসাবে বিশটি উট দিয়েছিলেন। এ সময় বিবি খাদিজার বয়স চল্লিশ বছর। তিনি বিবেক বুদ্ধি, সুন্দর্য, অর্থ সম্পদ, বংশমর্যাদায় ছিলেন সেকালের শ্রেষ্ঠ নারী। তার সাথে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এটা ছিলো প্রথম বিবাহ। তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য কোনো মহিলার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবী হননি।ইবরাহীম ব্যতীত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল সন্তান ছিলেন বিবি খাদিজার গর্ভজাত। সর্বপ্রথম কাসেম জন্ম গ্রহণ করেন। তার নামেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবুল কাসেম বা কাসেমের পিতা বলা হতো। কাসেমের পর যয়নব, রোকায়া, উম্মে কুলসুম, ফাতেমা এবং আবদুল্লাহ জন্ম গ্রহণ করেন। আবদুল্লাহর উপাধি ছিলো তাইয়েব ও তাহের। পুত্র সন্তান সকলেই শৈশবে ইন্তেকাল করেন। অবশ্যই কন্যারা সবাই ইসলামের যুগ পেয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ এবং হিজরতের গেথরব অর্জন করেন। হযরত ফাতেমা (রা.) ছাড়া অন্য সকলেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। হযরত ফাতেমা (রা.) তাঁর আব্বা রসূলুল্লাহ (স)-এর ইন্তেকালের মাত্র ছয় মাস পর ইন্তেকাল করেন।
কাবার পুনর্নির্মাণ এবং হাজারে আসওয়াদের বিরোধ মীমাংসা
নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বছর, সে সময় কোরায়শরা নতুন করে কাবা ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করে। এ উদ্যোগের কারণ ছিলো, কাবা ঘর মানুষের উচ্চতার চেয়ে সামান্য বেশি উচ্চতা বিশিষ্ট চার দেয়ালে ঘেরা ছিলো। হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর যমানা থেকেই এ দেয়ালের উচ্চতা ছিলো নয় হাত এবং ওপরে কোন ছাদ ছিলো না। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত চোর কাবার ভেতরের সম্পদ চুরি করে নিয়ে যায়। তাছাড়া নির্মাণের পর দীর্ঘকাল কেটে গেছে। ইমারত পুরনো হওয়ায় দেয়ালে ফাটল ধরেছে। এদিকে সে বছর প্রবল প্লাবনও হয়েছিলো, সেই প্লাবনের তোড় ছিলো কাবা ঘরের দিকে। এ সব কারণে কাবা ঘর যে কোনো সময় ধসে পড়ার আশথা ছিলো। তাই কোরায়শরা তা নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।এ উপলক্ষে কোরায়শরা সম্মলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, কাবা ঘরের নির্মাণ কাজে শুধু বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থই ব্যবহার করা হবে। এ কাজে পতিতার উপার্জন, সুদের অর্থ এবং কারো থেকে অন্যায়ভাবে গৃহীত অর্থ সম্পদ ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।নতুন করে নির্মাণের জন্যে কাবা ঘরের পুরনো ইমারত ভেথে ফেলার প্রয়োজন ছিলো, কিন্তু কেউই সে সাহস পাচ্ছিলো না। অবশেষে ওলীদ ইবনে মুগিরা মাখযুমী প্রথমে ভাঙতে শুরু করে। সবাই যখন দেখলো, ওলীদের ওপর কোন বিপদ আপতিত হয়নি, তখন সবাই ভাথার কাজে অংশ গ্রহণ করে। হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর নির্মিত অংশ পর্যন্ত ভাথার পর নতুন নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। নির্মাণ কাজে প্রত্যেক গোত্রের আলাদা আলাদা অংশ নির্ধারিত ছিলো। প্রত্যেক গোত্রই পাথরের আলাদা আলাদা স্তূপ লাগিয়ে রাখে। বাকুম নামক এক রোমক স্থপতি এ নির্মাণ কাজ তদারক করছিলো। ইমারত যখন হাজারে আসওয়াদ পর্যন্ত ওঠে তখন ঝগড়া বাধলো, এ পবিত্র পাথর যথাস্থানে স্থাপনের মর্যাদা কে লাভ করবে? চার পাঁচ দিন যাবত এ ঝগড়া চলতে থাকে। ক্রমে এ ঝগড়া এমন মারাত্নক রূপ ধারণ করে, যাতে মক্কার হেরেমে কঠিন খুন খারাবি ঘটে যাওয়ার আশথা দেখা দেয়। অবশেষে আবু উমাইয়া মাখযুমী এ বিবাদ ফয়সালার একটা উপায় এভাবে নির্ধারণ করলেন, আগামীকাল প্রত্যূষে মসজিদে হারামের দরোজা দিয়ে যিনি প্রথম প্রবেশ করবেন, তার ফয়সালা সবাই মেনে নেবে। এ প্রস্তাব সবাই গ্রহণ করে। পরদিন প্রত্যূষে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম মাসজিদে হারামে প্রবেশ করেন। তিনি প্রবেশ করতেই সব লোকজন সমস্বরে চীৎকার করে ওঠে- এই যে আমীন। আমরা তাঁর সিদ্ধান্তে সম্নত। ইনি যে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। এরপর তিনি লোকজনের নিকটবর্তী হলে তারা ঘটনার বিবরণ দেয়। তখন তিনি একখানা চাদর চেয়ে আনান এবং তা মাটিতে বিছিয়ে নিজ হাতে হাজারে আসওয়াদ চাদরের মাঝখানে রাখেন। তারপর বিবদমান গোত্রসমূহের নেতাদের সে চাদরের কিনারা ধরে পাথর যথাস্থানে নিয়ে যেতে বললেন। তারা তাই করে। নির্ধারিত জায়গায় চাদর নিয়ে যাওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে পাথর যথাস্থানে স্থাপন করেন। এ ফয়সালা ছিলো অত্যন্ত বিবেকসম্মত এবং বুদ্ধিদৃপ্ত। বিবদমান গোত্রগুলোর সকলেই এতে সন্তষ্ট হয়, কারো কোনো অভিযোগ রইলো না। এদিকে কাবা ঘর পুনর্নির্মাণে কোরায়শদের কাছে বৈধ অর্থের অভাব দেখা দেয়। তাই তারা উত্তর দিক থেকে কাবার দৈর্ঘ প্রায় ছয় হাত কমিয়ে দেয়। এ অংশকে হেজর এবং হাতীম বলা হয়। এবারের নির্মাণে কোরায়শরা কাবার দরোজা বেশ উঁচু করে বানায়, যাতে একমাত্র তাদের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্য৩িই কাবা ঘরে প্রবেশ করতে পারে। দেয়ালসমূহ পনেরো হাত উঁচু হওয়ার পর ভেতরে ছয়টি খুঁটি দাঁড় করিয়ে ওপর থেকে ছাদ ঢালাই করা হয়। এ নির্মাণ শেষে কাবা ঘর চতুষ্কোণ আকৃতি লাভ করে। বর্তমানে কাবা ঘরের উচ্চতা পনেরো মিটার। যে দেয়ালে হাজারে আসওয়াদ রয়েছে এবং তার সামনের অর্থাৎ উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দেয়াল দশ দশ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন। হাজারে আসওয়াদ মাটি থেকে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। দরোজার দিকের দেয়াল এবং তার সামনে পূর্ব ও পশ্চিম দিকের দেয়াল বারো মিটার আর দরোজা মাটি থেকে দুই মিটার উঁচু। দেয়ালের ঘেরাওয়ের নীচে চারদিক থেকে চেয়ারের আকৃতিবিশিষ্ট ঝালরের ঘেরাও রয়েছে। এর মধ্যম উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং দৈর্ঘ ত্রিশ সেন্টিমিটার। এটাকে শাযরাওয়ান বলা হয়। এটাও প্রকৃতপক্ষে কাবা ঘরেরই অংশ, কিন্তু কোরায়শরা এ অংশের নির্মাণ কাজ বাদ রাখে।

নবুয়তের আগের জীবন
বিভিন্নভাবে মানুষের মধ্যে যেসব গুণবৈশিষ্ট্য বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়, সেূলো সবই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে এককভাবে বিদ্যমান ছিলো। তিনি ছিলেন স্বচ্ছ চিন্তা-চেতনা, দূরদর্শিতা, সত্যপ্রিয়তার এক সুউচ্চ মিনার। চিন্তার পরিচ্ছন্নতা, পরিপক্বতা, উদ্দেশ্য ও লক্ষের পবিত্রতা তাঁর মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিলো। দীর্ঘ সময়ের নীরবতায় তিনি সত্য ও ন্যায়ের পে আল–াহর সাহায্য পেতেন। পরিচ্ছন্ন, মার্জিত, সুন্দর বিবেক বুীি, উন্নত স্বভাব ও দৃষ্টিভথি নিয়ে তিনি মানুষের জীবন, বিশেষত জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে গভীরভাবে ধ্যান করেছিলেন। এ ধ্যানের মাধ্যমে তিনি মানুষকে যে সকল পথিলতায় নিমথিত দেখেন, তাতে তাঁর মন ঘৃণায় ভরে ওঠে। তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন। পথিলতার আবর্তে নিমথিত মানুষদের থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখেন। মানুষের জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেয়ার পর মানবকল্যাণে যতোটা সম্ভব অংশগ্রহণ করতেন। বাকি সময় নিজের প্রিয় নির্জনতার ভুবনে ফিরে যেতেন। তিনি কখনো মদ মুখে লাগাননি, পূজার বেদীতে জবাই করা পশুর গোশত খাননি, মূর্তির জন্যে আয়োজিত উৎসব, পার্বণ, মেলা ইত্যাদিতেও কখনোই অংশ গ্রহণ করেননি। শুরু থেকেই তিনি মূর্তি নামের বাতিল উপাস্যদের অত্যান্ত ঘৃণা করতেন। এতো বেশি ঘৃণা অন্য কিছুর প্রতি তাঁর ছিলো না। এছাড়া লাত এবং ওযযার নামে শপথ শোনাটাও তিনি পছন্দ করতেন না। তাকদীর তাঁর ওপর হেফাযতের ছায়া ফেলে রেখেছিলো, এতে কোন সন্দেহ নেই। যখন পার্থিব কিছু পাওয়ার জন্যে মন ব্যাকুল হয়েছে, অথবা অপছন্দনীয় রস্ম-রেওয়াজের অনুসরণের ইচ্ছা মনে জাগ্রত হয়েছে, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সেসব থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। ইবনে আছিরের এক বর্ণনায় রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জাহেলী যুগের লোকেরা যেসব কাজ করতো, দু’বারের বেশি কখনোই সেসব কাজ করার ইচ্ছা আমার হয়নি। সে দু’টি কাজেও আল্লাহর পথে থেকে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর সে ধরনের কাজের ইচ্ছা কখনোই আমার মনে জাগেনি। ইতিমধ্যে আল্লাহ তায়ালা আমাকে নবুয়তের সন্মানে ভূষিত করেন। মক্কার উচ্চ অংশে যে বালক আমার সাথে বকরী চরাতো, এক রাতে আমি তাকে বললাম, তুমি আমার বকরীূলো যদি দেখো, তবে আমি মক্কায় গিয়ে অন্য যুবকদের মতো রাত্রিকালের গল্প গুজবের আসরে অংশ নেবো। সে রাযি হয়। আমি মক্কার দিকে রওয়ানা দেই। ঘরের কাছে পৌঁছতেই প্রথমে বাজনার আওয়ায শোনলাম। জিজ্ঞেস করায় একজন বললো, অমুকের সাথে অমুকের বিবাহ হচ্ছে। আমি শোনার জন্যে বসে পড়লাম আর আল্লাহ তায়ালা আমার কান বন্ধ করে দেন, আমি ঘুমিয়ে পড়ে। রোদের আঁচ গায়ে লাগার পর আমার ঘুম ভাথে, আর আমি মক্কার উচ্চ অংশে আমার রাখাল সাথীর কাছে ফিরে যাই। সে জিজ্ঞেস করার পর সব কথা খুলে বললাম। আরেক রাতে এ রকমের কথা বলে আমি আমার রাখাল সাথীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মক্কায় পেঁথছলাম, সে রাতেও প্রথমোত রাতের মতোই ঘটনা ঘটে। এরপর কখনো ওই ধরনের অসংগত ইচ্ছা আমার মনে জাগ্রত হয়নি।
সহীহ বোখারী শরীফে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, কাবা ঘর যখন নির্মাণ করা হয়েছিলো তখন নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আব্বাস (রা.) পাথর বহন করছিলেন। হযরত আব্বাস (রা.) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, তহবন্দ খুলে কাঁধে রাখো, পাথরের দাগ থেকে রা পাবে। তহবন্দ খোলার সাথে সাথে তিনি মাটিতে পড়ে যান, তাঁর দৃষ্টি আকাশের দিকে উঠে যায়। খানিক পরেই হুশ ফিরে এলে বললেন, আমার তহবন্দ, আমার তহবন্দ। এরপর তাঁকে তহবন্দ পরিয়ে দেয়া হয়। এক বর্ণনায় রয়েছে, এ ঘটনার পর আর কখনো তাঁর লজ্জাস্থান দেখা যায়নি।
নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রশংসনীয় কাজ, উন্নত চরিত্র বৈশিষ্ট্য এবং দয়ার্দ্র স্বভাবের কারণে স্বতন্ত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সকলের চেয়ে অধিক মানবীয় সৌজন্যবোধ সম্পন্ন, সবার চেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী, সন্মানিত প্রতিবেশী, সর্বাধিক দূরদর্শিতাসম্পন্ন, সকলের চেয়ে অধিক সত্যবাদী, সকলের চেয়ে কোমলপ্রাণ ও সর্বাধিক পবিত্র পরিচ্ছন্ন মনের অধিকারী। ভালো কাজে ভালো কথায় তিনি ছিলেন সকলের চেয়ে অগ্রসর এবং প্রশংসিত। অংগীকার পালনে ছিলেন সকলের চেয়ে অগ্রণী, আমানত রায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। এমনকি স্বজাতির লোকেরা তাঁর নামই আল-আমিন রেখেছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিলো প্রশংসনীয় গুণ বৈশিষ্ট্যের সমন।য়। হযরত খাদিজা (রা.) স্যা দিয়েছেন, তিনি বিপদগ্রস্তদের বোঝা বহন করতেন, দুঃখী দরিদ্র লোকদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াতেন, মেহমানদারী করতেন এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার কাজে সাহায্য করতেন13466388_1756071501281077_2073791806686577968_nuntitled-22

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY