আমাদের সভ্যতার স্বাতন্ত্র যুগোপযোগী

0
79

আমাদের সভ্যতার স্বাতন্ত্র যুগোপযোগী
সভ্যতার ইতিহাসে আমাদের সভ্যতার এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্যেই বিস্ময়কর। সকল ধর্ম এবং সকল জাতির জন্যে এই সভ্যতার মধ্যে আকর্ষণীয় শক্তি রয়েছে। এই সভ্যতা ছিলো বিশ্ব শাসন করার যোগ্যতা সম্পন্ন, বিশ্বের গতি পরিবর্তনকারী বিশ্বের মানুষকে শিা ও প্রশিণ প্রদানকারী এক প্রভাবশালী ব্যবস্থা। কিন্তু এই সভ্যতার যখন পতন শুরু হয়েছে এবং এর জায়গায় অন্য সভ্যতা বিকশিত হয়েছে তখন আমাদের সভ্যতার মূল্য ও মর্যাদা সম্পর্কে আলাদা ধরনের মতামত পাওয়া গেছে। কেউ একে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখেছে, কেউ একে স্বাগত জানিয়েছে। কেউ এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছে আবার কেউ সমালোচনা করেছে।
পাশ্চাত্যের পেশাদার সমালোচকরা আমাদের সভ্যতা সম্পর্কে এ রকম মনোভাবই পোষণ করেছে। আমাদের সভ্যতার ওপর খবরদারি করার জন্যে এই সভ্যতার বিচারক হওয়ার এবং এ সভ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেয়ার অধিকার তারা পায়নি। কিন্তু বর্তমানে তাদের মতামতের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে তারা বিজয়ী এবং তাদের হাতে রয়েছে সভ্যতার লাগাম। যাদের সভ্যতা সম্পর্কে তারা সমালোচনা করবে এবং আদেশ দেবে তারা তো সবাই অত্যন্ত দুর্বল। শক্তিমান লোকেরা এ সব দুর্বল লোকদের প্রতি লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তাদের সব মূলধন এরা লুণ্ঠন করে নিতে চায়। তাদের দেশের ওপর অধিপত্য বিস্তার করে নিজেদের লোভের আগুন নেভাতে চায়। শক্তিমানেরা এমনিই সব সময় দুর্বলদের তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতেই দেখে। ইতিহাসের সকল যুগেই শক্তিমানেরা দুর্বলদের সঙ্গে এরকম আচরণ করেছে। অথচ আমরা যখন শক্তিশালী ছিলাম সে সময় আমরা শক্তিমান এবং দুর্বল সকলের সঙ্গে একই রকম আচরণ করেছি। সকলের প্রতি আমরা সুবিচারের পরিচয় দিয়েছি। যারা সম্মানী শ্রেণী তাদের শ্রেষ্ঠত্ব আমরা স্বীকার করেছি, তারা প্রাচ্যের হোক অথবা পাশ্চাত্যের হোক সেটা আমরা দেখিনি। সাম্য-ন্যায় নীতি সুবিচার এবং উদ্দেশ্যের পরিচ্ছন্নতা এবং বিবেকের অবিচলতার কাছে বিশ্বের ইতিহাসে আমাদের সমক কেউ হতে পারে কি? না কিছুতেই পারে না।
দুঃখের বিষয় শক্তিমানেরা আমাদের বিরুদ্ধে যেসব প্রতিহিংসাপরায়ণতার পরিচয় দিয়েছে এবং আমাদের সভ্যতা সম্পর্কে যেসব ধৃষ্টতাপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছে আমরা সেসব বিষয়ে যথাসময় সচেতন হতে পারিনি। তাদের সভ্যতা তাদের চোখের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। এ কারণে তারা সত্য স্বীকারে কুণ্ঠিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রতিহিংসা বাসা বেঁধেছে। তাদের জাতিগত অহংকার তাদেরকে অন্য কোনো জাতির শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে অনুমতি দেয় না। কিন্তু আমাদের সভ্যতা সম্পর্কে তাদের অভিমত প্রকাশের কারণে আমাদের প্রভাবিত হওয়ার কারণ আমার কিন্তু বোধগম্য নয়। বুঝতে পারি না আমাদের স্বজাতীয়দের কেউ কেউ আমাদের সভ্যতাকে হীন দৃষ্টিকে কেন দেখে। অথচ আমাদের সভ্যতার চরণে এক সময় সমগ্র বিশ্বই ঝুঁকে পড়েছিলো।
আমাদের সভ্যতার অধপতন সম্পর্কে কিছু কথা
যারা আমাদের সভ্যতাকে গুরুত্বহীন দৃষ্টিতে দেখে সম্ভবত তাদের যুক্তি হচ্ছে যে, আধুনিক সভ্যতার নতুন নতুন আবিস্কারের তুলনায় আমাদের সভ্যতা তেমন গুরুত্ব রাখে না। কিন্তু একথা যদি মেনেও নেয়া যায় তবু এতে আমাদের সভ্যতার গুরুত্বহীনতা প্রমাণিত হয় না। এর কারণ প্রধানত দু’টি। প্রথম কারণ হচ্ছে প্রতিটি সভ্যতা দুটি উপাদানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি হচ্ছে নৈতিক উপাদান অন্যটি হচ্ছে বস্তুগত উপাদান। বস্তুগত উপাদানের েেত্র পরবর্তীকালের সভ্যতা অগ্রগন্য সন্দেহ নেই। জীবনযাপনের েেত্র এসব উপাদান সৃষ্টিশীলতার চিরন্তন নিয়ম। আধুনিক সভ্যতা যা কিছু অর্জন করেছে প্রাচীন সভ্যতার কাছ থেকে সেসব আশা করা যেতো না। যদি তাই হয় তবে আমাদের সভ্যতার আগে যেসব সভ্যতা ছিলো যেসব সভ্যতাকেও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে হয়। কিন্তু আমরা তা পারি না। কারণ আমাদের সভ্যতাও এমন বহু কিছু আবিস্কার করেছে যেসব কিছু আমাদের পূর্ববর্তী সভ্যতা আবিস্কারে সম হয়নি। তারা যেসব জানতেও পারেনি। কাজেই বস্তুগত উপাদান সভ্যতা নির্মাণের েেত্র গুরুত্বপূর্ণ কোনো উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
নৈতিক এবং আধ্যাতিক উপাদান সম্পর্কে বলতে হয় এই উপাদানই মূলত একটি সভ্যতাকে সর্বাধিক বৈশিষ্ট্য দান করে। এর মাধ্যমেই মানুষের ভাগ্য রেখা সূচিত হয়। মানুষ বিপদাপদ থেকে রা পায়। এেেত্র আমাদের সভ্যতা অবশ্যই বিশেষ বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এেেত্র আমরা অনেক উন্নতি করেছি। এই উপাদান আমাদের সভ্যতাকে চিরঞ্জীব করেছে। মানুষকে সৌভাগ্যের উচ্চস্তরে পৌঁছে দেয়ার েেত্র সভ্যতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এেেত্র আমাদের সভ্যতা যে ভূমিকা পালন করেছে এই ভূমিকা প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের কোনো সভ্যতাই পালন করতে পারেনি।
আরেকটি কারণ হচ্ছে যে, শুধুমাত্র বস্তুগত উপাদানের ভিত্তিতে কোনো সভ্যতাকে তুলনা করা যায় না। সভ্যতার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার জন্যে বস্তুগত উপাদান সঠিক কোনো ভিত্তিও নয়। মুখরোচক খাবার গলধকরণ করা এবং জৌলুশমন্ডিত জীবন যাপন করা সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের কোনো মাপকাঠি হতে পারে না। সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হচ্ছে, একটি সভ্যতা মানবজীবনে কতোটা প্রভাব বিস্তার করেছে সেটা নির্ণয় করা। যুদ্ধের েেত্র এবং দেশ পরিচালনার েেত্রও একথা প্রযোজ্য। দেশের আয়তন এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সৈন্য সংখ্য দিয়ে যুদ্ধের সাফল্য ব্যর্থতা নিরূপিত হয় না। প্রাচীন ইতিহাসে এবং মধ্যযুগে যেসব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সঙ্গে যদি সেসব যুদ্ধের তুলনা করা হয় তবে অতীতের সকল যুদ্ধই মনে হবে তুচ্ছ এবং অকিঞ্চিৎকর। কিন্তু প্রাচীনকালের যেসব যুদ্ধ বিশেষ তাৎপর্যমন্ডিত। কারণ সেসব যুদ্ধ ইতিহাসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলো। ক্যানিযুদ্ধে কার্যেজের বিখ্যাত বীর হানিবল ছিলেন সিপাহসালার। এই যুদ্ধ এতো গুরুত্বপূণৃ ছিলো ইউরোপের শিা প্রতিষ্ঠানসমূহে এখনো এই যুদ্ধের ইতিহাস পড়ানো হয়।
খালেদ ইবনে ওয়ালীদ ইরাক ও সিরিয়া বিজয়ের ক্ষত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পাশ্চাত্যের যুদ্ধ বিশারদরা এখনো এ যুদ্ধ সম্পর্কে গবেষণা করেন এবং গবেষণা করে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন।
এসব যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ জয়ের ইতিহাসে সুবর্ণ অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। ক্যানির যুদ্ধ বদরের যুদ্ধ, কাদেসিয়ার যুদ্ধ, হেত্তিনের যুদ্ধ প্রাচীনকালের যুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এসব যুদ্ধকে আমরা উপো করতে পারি না। কারণ এসব যুদ্ধ মানবেতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে। এসব যুদ্ধ হচ্ছে ইতিহাসের এক একটা মাইলফলক।
আমার বিশ্বাস এ সংপ্তি আলোচনায় আমাদের সভ্যতার সেই সকল বৈশিষ্ট্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা আমি আলোচনা করতে চাই।
যদিও এই পরিসরে ততোটা বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে না। তবু যথা সাধ্য আমি আমাদের ইতিহাসের আকর্ষণীয় দিকগুলোর প্রতি এখানে আলোকপাত করবো। এর ফলে আমাদের সভ্যতার গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। এতে এটাও প্রমাণিত হবে কি কারণে আমরা আহকামুল হাকেমীনের দরবারে শ্রেষ্ঠ উম্মতের উপাধি পেয়েছি। মানব জাতির কল্যাণের ল্েয কেনই বা আমাদের উদ্ভব এবং উজ্জীবন ঘটানো হয়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY