আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য

0
107

মুসলমান ভাইয়েরা আমার! জুমআর দিন। এটি আল্লাহর দরবার এবং এটি এক মহামূল্যবান সময়। আল্লাহ ও রসূলের খোতবা শুনানো হচ্ছে। অতএব, খুব মনোযোগ সহকারে শুনুন এবং আমলের নিয়তে শুনুন। আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিনও আমাদের তার কালাম শুনাবেন এবং তার দীদার দেখাবেন এবং তার হাবীবের সুপারিশ নসীব করবেন। আমীন।

এই মাত্র যে খোতবা আমি আপনাদের উদ্দেশে পেশ করলাম এটাও রসূল (স.)-এর খোতবা। আবু দাউদ শরীফে রয়েছে- পিয়ারা নবী (স.) বলেছেন, ‘সমস্ত প্রশংসার একমাত্র উপযুক্ত অধিকারী হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। আমরা তার সাহায্যের মুখাপেক্ষী। আমরা আর কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি না। তার কাছেই আমরা আমাদের অপরাধের জন্যে ক্ষমা প্রর্থনা করি। নিজের নফসের অনিষ্ট থেকে তার আশ্রয় চাই। যাকে আল্লাহর দ্বীনের হক জ্ঞান দান করবেন তাকে কেউ বিপথগামী করতে পারে না। আর তিনি দূরে ঠেলে দিলে কেউ তাকে ধরেও দ্বীনের পথে আনতে পারবে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, সত্যিকার মাবুদ তিনি ছাড়া কেউ নন। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মোহাম্মদ (স.) তাঁর বান্দা এবং তার সত্যিকার রসূল। যাকে আল্লাহ তায়ালা সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি মোমেনদের সুসংবাদ ও কাফেরদের সতর্কবাণী শোনানোর জন্যে প্রেরিত হয়েছেন। যার নবুয়ত কেয়ামতের কাছাকাছি সময় হয়েছে। যার পরে দুনিয়া যতোদিন থাকবে ততোদিন আর কোনো নবী আসবেন না। ভালো করে বিশ্বাস করো দুনিয়া আখেরাতের কল্যাণ আল্লাহ ও রসূলের পথ অনুসরণের মাঝেই রয়েছে। যে এই পথ থেকে বিচ্যুত হবে সে নাজাত থেকে বঞ্চিত হবে। এবং সে নিজেরই ক্ষতি করলো। কেউ আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এরপর রসূল (স.) সূরা কাফ তেলাওয়াত করেন। অর্থাৎ নিসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি  এবং তার মনের ভিতর কি সব খারাপ কথার উদয় হয় তা আমি জানি। আমি তার গর্দানের শাহরগ থেকেও অনেক কাছে রয়েছি। সেখানে দু’জন ফেরেশতা রয়েছে তার একজন ডানে এবং একজন বামে। এমন একটি শব্দও যে উচ্চারণ করে না, যা সংরক্ষণ করার জন্যে একজন সদা সতর্ক প্রহরী তার পাশে নিয়োজিত থাকে না। মৃত্যু যন্ত্রণার মুহূর্তটি সত্যিই এসে হাজির হবে (তখন বলা হবে) এই হচ্ছে সেই মুহূর্ত যা থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে। এরপর শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। (এরপর বলা হবে) এ হচ্ছে সেই শাস্তির দিন (যার কথা আগেই তোমাদের বলা হয়েছে)। সেদিন প্রতিটি মানুষ (এমনভাবে) হাজির হবে যে, তাকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে সাথে একজন (ফেরেশতা) থাকবে, অপরজন হবে (তার যাবতীয় কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ) সাক্ষী। (একজন বলবে; এ হচ্ছে সেদিন) যেদিন সম্পর্কে তুমি উদাসীন ছিলে, এখন আমরা তোমার (চোখের সামনে) থেকে তোমার সে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি, অতএব আজ (তোমার দৃষ্টিশক্তি হবে অত্যন্ত প্রখর (সব কিছুই এখন তুমি দেখতে পাবে)।’

ভাইয়েরা আমার! আল্লাহকে ভয় করো, তোমার সাথে থাকা ফেরেশতার কথা খেয়াল করো, আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, মৃত্যুকে ভয় করো এবং অলসতায় জীবন কাটিয়ে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হায়াত তার আনুগত্যের ওপর এবং আমাদের মৃত্যু তার সন্তুষ্টি বিধানের ওপর করুন। আমীন।কোনো সন্দেহ নেই যে, দুনিয়াতে অনেক বড়ো বক্তা চলে গেছেন। বড়ো বড়ো লিডার, মৌলভী, ওয়ায়েজ, খতীব, উপদেষ্টা, সংস্কারক হয়ে অনেক উচ্চমার্গের বুদ্ধিদীপ্ত বক্তব্য রেখেছেন। আজও অনেক তারকাতূল্য সংস্কারক রয়েছেনে, কিন্তু আমার ঈমান এই যে, নূরানী ও বরকতপূর্ণ, আনন্দদায়ক, কল্যাণধর্মী, আকর্ষণীয়, প্রাঞ্জল ভাষা খাতামুল মুরসালীন নবীগণের সরদার রেখেছেন তার সামনে আর সব বক্তব্য শূন্য ময়দান। সে জন্যে আমি বিগত সপ্তাহের খোতবার ন্যায় আজও একটি খোতবা শুনাতে চাচ্ছি। পিয়ারা নবী (স.) হুজ্জাতুল বিদাতে বলেছেন, হে লোকেরা! তোমরা এ যমীনে এবাদত করতে দেখে শয়তান হতাশ হয়ে সে আশা করে যে অন্ততঃ ছোটো ছোটো কাজে তোমরা তার আনুগত্য করবে। তাতে সে খুবই খুশী থাকবে। অতএব, হুঁশিয়ার! শোনো! আমি তোমাদের কাছে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি তা যদি মযবুত করে ধরো এবং শক্তভাবে আমল করো তবে কখনো শয়তানের আশা পূরণ হবে না, তোমরাও ধ্বংস হবে না। আর তা হচ্ছে- কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে নবুবিয়্যাহ। (আল্লাহর কিতাব ও নবীর আদর্শ)

একবার রসূলুল্লাহ (স.) ভয়ার্তমনে আমাদের এই খোতবাটি শোনান, আমি যতোক্ষণ তোমাদের মাঝে আছি আমার আনুগত্য ও অনুসরণ করতে থকো এবং আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরো, দেখো এর হালালকে হালাল জেনো এবং হারামকে হারাম জেনো। (অর্থাৎ রসূল (স.) তাঁর প্রদত্ত খোতবায় বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের পরিপূর্ণ অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রাব্বুল আলামীন ফারায়েজও বলে দিয়েছেন। সুন্নত তরীকা বাতলে দিয়েছেন। হদ (ইসলামের শাস্তি বিধান)ও ঠিক করে দিয়েছেন। গোটা দ্বীনকে পরিপূর্ণ পরিস্কার করে সাফ সাফ বলে দিয়েছেন এবং দ্বীনকে অত্যন্ত সহজ করে ব্যাপক খোলামেলা করে দিয়েছেন। তাতে কোনো সংকীর্ণতা নেই, নেই কোনো কমতি। শোনো, সেই লোকই বেঈমান, যে ব্যক্তি আমানতদার নয়। আর সেই লোকই বেদীন যার কথা, বিশ্বাস ও অঙ্গীকার রক্ষার কোনো তোয়াক্কা করে না। আল্লাহ তায়ালার হুকুম আহকাম এবং তার কর্তব্যকে পরিত্যাগকারীর হিসাবগ্রহণকারী স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই। আমার দেয়া দায়িত্বকে পরিত্যাগকারীদের সাথে লড়াইকারী আমিই। যে আমার দেয়া দায়িত্ব ভঙ্গ করলো সে আমার সুপারিশ পাবে না। এমনকি সে আমার হাউজে কাউসারের কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। (তাবারানী)

প্রিয় ভাইয়েরা আমার! রসূল (স.)-এর এই তিনখানা খোতবা আমি আপনাদের কাছে পেশ করেছি। আমাদের আমল আকীদার উপযোগী শুধু দুটি জিনিস। কোরআন ও হাদীস। আমাদের দুই হাতে এই দুটি জিনিস দিয়ে আল্লাহর রসূল আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। যতোক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই দুটি জিনিসকে আঁকড়ে থাকবো, যতোক্ষণ পর্যন্ত এই দুটি জিনিস আমাদের হাতে থাকবে ততোক্ষণ আমরা ধ্বংস হবো না, বরবাদ হবো না। পরাস্ত হবো না, বেইজ্জতি হবো না, না আমাদের কাছ থেকে ধর্ম বিদায় নিবে, না দুনিয়া আমাদের প্রতি রুষ্ট হবে। ঐ দুটি জিনিস হচ্ছে কোরআন ও হাদীস। অতএব, এক হাতে আল্লাহর দেয়া আমানত কোরআনে কারীম নিয়ে নাও। অন্যহাতে রসূলের দেয়া আমানত হাদীস শরীফ নিয়ে নাও। দুটি হাতে দু’টি জিনিসকে শক্তভাবে মজবুতভাবে ধরো। তখন দেখবে যে, চোর ডাকাত, লুটেরা তোমাদের উৎপীড়ন করবে, ছানাবড়া চোখ রাঙ্গাবে, কিন্তু সাবধান! মুষ্ঠি ছাড়বে না, কখনো এর থেকে ফসকা গিরোতে থেকো না, তাহলে আল্লাহর দেয়া আমানত, রসূল (স.)-এর দানকৃত নেয়ামত যদি হারিয়ে বসো তবে ডুবে মরবে, ধ্বংস হয়ে যাবে, দ্বীন দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাবে। সব সময় খেয়াল রাখবে দু হাতে দুই জিনিস রয়েছে, তৃতীয় হাতও নেই, তৃতীয় কোনো অবলম্বনের প্রতি ঝুঁকবে না, না আল্লাহর দেয়া জনিসের কোনো বিকল্প আছে, না রসূল (স.) ছাড়া আর কোনো রসূল আসবে। সুতরাং তৃতীয় কোনো কিছু দ্বীনের মধ্যে শামিল হতে পারে না। আর আমাদের তৃতীয় কোনো তন্ত্রমন্ত্র মানার প্রয়োজন পড়ে না। শোনো, হুজুর (স.) তাঁর প্রদত্ত খোতবায় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণ, ফারায়েজ, সুন্নত, হদুদ, হালাল, হারাম, আহকাম, নিষেধাজ্ঞাবলী সবকিছু খুলে খুলে বর্ননা করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং কোরআন হাদীসের বাইরে যা কিছু রয়েছে তা আল্লাহর দ্বীন নয়। এই কথাই আমাদের হাতে থাকা কোরআনে কারীমে পরিস্কার করে বলে দিয়েছে- আজ আমি তোমাদের জন্যে দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্যে দ্বীন ইসলামকে মনোনীত করলাম।

অতএব, প্রকৃত দ্বীন আল্লাহর রসূলের হাতেই পরিপূর্ণ হয়েছে। আর সেটা শুধুই কোরআন ও হাদীস। রায়, কিয়াস, ইজতেহাদ ও তাকলীদ এসব আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে যে দ্বীন রাহমাতুল লিল আলামীন আমাদের দিয়ে গেছেন সেটাই কোরআন ও হাদীস। আর সেটা এতোটাই স্বয়ংসম্পূর্ণও যথেষ্ট যে, এরপর আমাদের আর অন্য কোনো কিছুর প্রয়োজন করে না। সেজন্যেই রসূল (স.) বলেছেন- ‘শপথ সেই সত্তার যার হাতে মোহাম্মদের (স.)-এর প্রাণ! আজ যদি হযরত মূসাও তোমাদের কাছে আসেন আর তোমরা তার আনুগত্য করে আমাকে ছেড়ে দাও তবে অবশ্য অবশ্যই তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ হয়ে যাবে। বিস্ময়কর ব্যাপার যে, আজ মুসলমানরা নবী (স.)-এর হাদীসকে ত্যাগ করে তোমরা যার তার বক্তব্য, যুক্তি এবং সিদ্ধান্ত ও গবেষণার আনুগত্য করা শুরু করে দিয়েছো। সুতরাং আমি অত্যন্ত দরদভরা মন নিয়ে বলবো, হে মুসলমানরা! হে আল্লাহর রসূলের কালেমা পাঠকারীরা, নিজের বিবেকের ওপর দ্বিতীয়বার একটু খেয়াল করো। তা না হলে যালিমদের হাতে লাঞ্ছিত অপমানিত হবে। তখন শুধু বলবে- আহা! যদি আল্লাহর রসূলের পথই শুধু অনুসরণ করতাম। আর অমুকের আকীদা অনুসরণ না করতাম (তবে কতোই না ভালো হতো)।

untitled-2213466388_1756071501281077_2073791806686577968_n

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY