দাওয়াতের বিভিন্ন যুগ ও পর্যায়

0
65

মোহাম্মদ (স.)-এর নবুয়ত জীবনকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। তার এক ভাগ অন্যভাগ থেকে পুরোপুরি সমুথ্বল এবং বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এ দুভাগ হচ্ছে-

মক্কী জীবন – প্রায় তেরো বছর।

মাদানী জীবন- দশ বছর।

উল্লিখিত দুভাগ আবার কয়েক পর্যায়ে বিভক্ত এবং এ পর্যায়ূলোও স্বীয় বৈশিষ্ট্যে একটি আরেকটি থেকে ভিন্ন এবং বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। নবীজীবনের উভয় অংশে সংঘটিত বিভিন্ন পরিস্থিতির গভীর পর্যালোচনার পর আপনি তা অনুমান করতে পারবেন। রসূল (স.)-এর মক্কী জীবন তিন পর্যায়ে বিভক্ত।

১. গোপন দাওয়াতের পর্যায়- তিন বছর।

২. মক্কাবাসীর মাঝে প্রকাশ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের পর্যায়- এ পর্যায় নবুয়তের চতুর্থ বছর থেকে দশম বছরের শেষ পর্যন্ত ব্যাপ্ত।

৩. মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াতের গ্রহণযোগ্যতা এবং বিস্তারের পালা- এ পর্যায় নবুয়তের দশম সালের শেষ ভাগ থেকে মদীনায় হিজরত পর্যন্ত ব্যাপ্ত।মাদানী জীবনের পর্যায়ূলো যথাস্থানে বিস্তারিত আলোচিত হবে।

নবুয়ত রেসালাতের ছায়ায় হেরা গুহার অভ্যন্তরে

মোহাম্মদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স চল্লিশ বছরের কাছাকাছি হয়ে চলেছে। এ সময়ের মাঝে তাঁর চিন্তা ভাবনা স্বজাতীয়দের সাথে তাঁর মানসিক চিন্তার দূরত্ব অনেক প্রশস্ত করে দিয়েছিলো। এ অবস্থায় তিনি নিসথতাপ্রিয় হয়ে ওঠেন। অতএব, তিনি ছাতু এবং পানি নিয়ে মক্কা থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত হেরা পাহাড়ের গুহায় গিয়ে সময় কাটাতে লাগলেন। এটি একটি ছোটো গুহা, এর দৈর্ঘ চার গজ এবং প্রস্থ পৌনে দুই গজ। নীচের দিক গভীর নয়। ছোটো একটি পথের পাশে ওপর প্রান্তরের সথমস্থলে এ গুহা অবস্থিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ গুহায় যাওয়ার পর বিবি খাদিজাও সথে যেতেন এবং নিকটবর্তী কোনো জায়গায় অবস্থান করতেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরো রমযান মাস এ গুহায় কাটাতেন। পথচারী মিসকীনদের খাবার খাওয়াতেন এবং বাকি সময় আল্লাহর এবাদাতে কাটাতেন, জগতের দৃশ্যমান এবং এর পেছনে কার্যকর অভিনব কুদরতের কারিশমা সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। স্বজাতির লোকদের দুর্বল লক্কর ঝক্কর শেরেকপূর্ণ আকীদা বিশ্বাস এবং নিরর্থক চিন্তাভাবনা দেখে তিনি মোটেই শান্তি পেতেন না, কিন্তু তাঁর সামনে সুস্পষ্ট কোনো পথ, পীতি অথবা বাড়তি কমতি থেকে দূরবর্তী এমন কোনো পথ ছিলো না, যার ওপর তিনি মু৩ মনে মানসিক স্বস্তি শান্তির সাথে জীবন কাটাতে পারেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ নিসথপ্রিয়তা ছিলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কর্মকেথশলও কর্মব্যবস্থাপনার এক অংশবিশেষ। এমনি করে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ভবিষ্যতের গুরুদায়িত্বের জন্যে তৈরী করছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মানব জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধান দিয়ে যিনি জীবনধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হবেন, তিনি জাগতিক ব্যবস্থা, পারিপাশির্।ক হৈ চৈ হট্টগোল, দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা থেকে দূরে কোলাহলমুক্ত পরিবেশে কিছুকাল নির্জনতায় থাকবেন। এ নিয়ম অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা ধীরে ধীরে তাঁর প্রিয় রসূলকে মহা আমানতের বোঝা বহন, ভূপৃষ্ঠে পরিবর্তন সাধন এবং ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের জন্যে তৈরী করতে চাচ্ছিলেন। তাই আমানতের জিম্মাদারী অর্পণের তিন বছর আগেই তাঁর জন্যে নিসংগতা নির্জনতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তিনি এ নির্জনতায় এক মাস পর্যন্ত সৃষ্টিজগতের স্বাধীন আত্নার সাথে বিচরণ করতেন এবং এ সত্তার পেছনে পেছনে থেকে গায়বী জগত সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করতেন, যাতে আল্লাহ তায়ালার অনুমতি হলে এ গায়বের সাথে থেকে কাজ করার জন্যে তৈরী হয়ে ওঠেন।

ওহী নিয়ে জিবরাঈলের আগমন

চল্লিশ বছর বয়স হচ্ছে মানুষের পূর্ণতা ও পরিপক্বতার বয়স। বলা হয়, নবী রসূলগণ এ বয়সেই ওহী লাভ করে থাকেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স চল্লিশ বছর হওয়ার পর তাঁর জীবনের দিগন্তে নবুয়তের নিদর্শন চমকাতে লাগলো। এ নিদর্শন প্রকাশ পাচ্ছিলো স্বপ্নের মাধ্যমে। এ সময়রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে স্বপ্নই দেখতেন, সে স্বপ্ন শুভ্র সকালের মতো প্রকাশ পেতো। এ অবস্থায় ছয় মাস কেটে গেলো, যা নবুয়তের ৪৬ ভাগের এক ভাগ এবং নবুয়তের মোট মেয়াদ হচ্ছে তেইশ বছর। হেরা গুহার নির্জনবাসের তৃতীয় বছরে যখন আল্লাহ তায়ালা জগদ্বাসীকে তাঁর করুণাধারায় সিঞ্চিত করতে চাইলেন, তিনি তখন তাঁর রসূলকে নবুয়ত দান করেন। হযরত জিবরাঈল (আ.) কয়েকটি আয়াত নিয়ে হাযির হন। যুক্তি-প্রমাণ এবং বিভিন্ন ইথিতের ওপর সামগ্রিক দৃষ্টিপাত করে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর প্রথম ওহী নিয়ে আগমনের দিন তারিখ নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। আমাদের গবেষনা পর্যালোচনা মোতাবেক, প্রথম ওহী এসেছিলো রমযান মাসের ২১ তারিখ সোমবার রাতে। এ দিনটা ছিলো ৬১০ খৃস্টাব্দের ১০ আগস্ট সোমবার। চান্দ্রমাসের হিসাব মোতাবেক এ সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স হয়েছিলো ৪০ বছর ৬ মাস ১২ দিন এবং সেথর বছরের হিসাব অনুযায়ী ৩৯ বছর ৩ মাস ২২ দিন।

এবার আসুন, হযরত আয়েশা (রা.)-এর যবানীতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনা যাক। কোরআন নাযিল ছিলো এক অলেথকিক আলোক শিখার আবির্ভাব, সেই আলোক শিখায় সকল গোমরাহী পথভ্রষ্টতার অন্ধকার তিরোহিত হয়ে যাচ্ছিলো। ইতিহাসের গতিধারা এ ঘটনায় বদলে গিয়েছিলো। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিলের সূচনা সুস্বপ্নের মাধ্যমে হয়েছিলো। তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন তা শুভ্র সকালের মতো প্রকাশ পেতো। এরপর তিনি নির্জনতাপ্রিয় হয়ে পড়েন। তিনি হেরা গুহায় এবাদাত বন্দেগীতে কাটাতে থাকেন। এ সময় একাধারে কয়েক রাত পর্যন্ত তিনি ঘরে ফিরতেন না। তাই তিনি পানাহার সামগ্রী সাথে নিয়ে যেতেন এবং তা শেষ হয়ে গেলে খাদিজা (রা.)-এর কাছে ফিরে আসতেন। যে কয়দিন হেরা ূহায় অবস্থান করেছিলেন, ঠিক সে কয়দিনের খাদ্য খাবার নিয়ে পুনরায় সেখানে ফিরে যেতেন। এমনি করে এক পর্যায়ে তাঁর কাছে সত্যের আবির্ভাব ঘটে এবং ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁকে বলেন, পড়ো। তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। ফেরেশতা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে এমন জোরে চাপ দেন, যেন আমার সব শ৩ি নিংড়ে নেয়া হয়েছে। এরপর ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো। তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। পুনরায় ফেরেশতা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চাপ দেন। তৃতীয়বার ফেরেশতা আমাকে বুজে জড়িয়ে ধরে তার ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ো, ‘ইকরা বে-ইসমে রাব্বিকাল্লাযী খালাক’,অর্থাৎ পড়ো তোমার সেই প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন জমাটবাঁধা রক্ত থেকে। পড়ো তোমার অতি দয়ালু প্রভুর নামে। এ আয়াতূলো নাযিল হওয়ার পর রসূল (স.) ঘরে ফিরে আসেন। তাঁর বুক ধুকধুক করছিলো। স্ত্রী হযরত খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদকে বললেন, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। বিবি খাদিজা তাঁকে চাদর জড়িয়ে শুইয়ে দিলে তাঁর ভয় কেটে যেতে থাকে। এরপর তিনি বিবি খাদিজাকে সব কথা খুলে বলে বললেন, আমার কী হয়েছে? নিজের জীবনের ব্যাপারে আমি আশথা করছি। বিবি খাদিজা তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্নীয় স্বজনের হক আদায় করেন, বিপদগ্রস্ত লোকদের সাহায্য করেন, মেহমানদারী করেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। বিবি খাদিজা এরপর নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আপন চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফাল ইবনে আবদুল ওযযার কাছে নিয়ে যান। ওয়ারাকা আইয়ামে জাহেলিয়াতে খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হিব্রিু ভাষা লিখতে জানতেন। যতোটা আল্লাহ তায়ালা তওফীক দিতেন, হিব্রিু ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন। সে সময় তিনি ছিলেন বয়সের ভারে ন্যূব্জ এবং দৃষ্টিহীন। বিবি খাদিজা তাকে বললেন, ভাইজান, আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ওয়ারাকা বললেন, বলো ভাতিজা, তুমি কি দেখেছো? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা যা দেখেছেন তাকে সব খুলে বলেন। সব শুনে ওয়ারাকা বললেন, তিনি সেই দূত, যিনি হযরত মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন। হায়, যদি আমি সে সময় বেঁচে থাকতাম, যখন তোমার কওম তোমাকে বের করে দেবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবাক হয়ে বললেন, তবে কি আমার কওম আমাকে সত্যি সত্যিই বের করে দেবে? ওয়ারাকা বললেন, হাঁ, তুমি যে ধরনের বাণী লাভ পেয়েছো, এ ধরনের বাণী যখনই কেউ পেয়েছে, তার সাথেই শক্রতা করা হয়েছে। যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবো। এর কিছুকাল পরই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন এবং ওহীর আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তাবারী এবং ইবনে হেশামের বর্ণনা থেকে জানা যায়, হঠাৎ ওহী আসার পর রসূল (স.) হেরা গুহা থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় সেখানে ফিরে যান। কিছুকাল অবস্থান করে অবশিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ করেন। পরে মক্কায় ফিরে আসেন। তাবারীর বর্ণনায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হেরা গুহা থেকে বেরিয়ে আসার ওপরও আলোকপাত হয়। বর্ণনা নিন্মরুপ-

ওহীর আলোচনা প্রসংগে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর মখলুকের মধ্যে কবি এবং পাগল ছিলো আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। প্রচন্ড ঘৃণার কারণে এদের প্রতি চোখ তুলে তাকাতেও আমার ইচ্ছা হতো না। ওহী আসার পর আমি মনে মনে বললাম, কোরায়শরা আমার ব্যাপারে এমন কথা বলতে পারবে না। আমি পাহাড় চূড়ায় উঠে নীচে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিয়ে চিরকালের জন্যে শান্তি পেয়ে যাবো। আমি এরূপ চিন্তা করে বের হই। পাহাড়ের মাঝামাঝি ওঠার পর আসমান থেকে আওয়ায এলো, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল, আর আমি জিবরাঈল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এ আওয়ায শোনার পর আমি আকাশের প্রতি মাথা তুলে দেখি, জিবরাঈল (আ.) মানুষের আকৃতি ধরে দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলছেন, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল, আর আমি জিবরাঈল ফেরেশতা। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি সেখানে দাঁড়িয়ে জিবরাঈলকে দেখতে থাকি। যে ইচ্ছায় এসেছিলাম তা ভুলে যাই। আমি তখন সামনেও যেতে পারছিলাম না, পেছনেও না। আকাশের যেদিকেই তাকাচ্ছিলাম, সেদিকেই জিবরাঈলকে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এর মধ্যে খাদিজা আমার খোঁজে লোক পাঠান। তারা মক্কা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসে, কিন্তু আমি নিজের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে থাকি। জিবরাঈল চলে যাওয়ার পর আমি নিজের ঘরে ফিরে এসে খাদিজার ঊরুর পাশে হেলান দিয়ে বসে পড়ি। তিনি বললেন, আবুল কাসেম, আপনি কোথায় ছিলেন? আপনার খোঁজে আমি লোক পাঠিয়েছি, সে মক্কা পর্যন্ত গিয়ে খুঁজে এসেছে, কিন্তু আপনাকে পায়নি। আমি তখন যা কিছু দেখেছি, খাদিজাকে তা বললাম। তিনি বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই, আপনি খুশি হোন এবং দৃঢ়পদ থাকুন, আমার আশা, আপনি এ উম্মতের নবী হবেন। এরপর তিনি ওয়ারাকা ইবনে নওফালের কাছে গিয়ে তাকে সব কথা শোনান। তিনি সব শুনে বললেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে ওয়ারাকার প্রাণ রয়েছে, তাঁর কাছে সেই ফেরেশতা এসেছেন, যিনি হযরত মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন। মোহাম্মদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ উম্মতের নবী। তাঁকে বলবে, তিনি যেন দৃঢ়পদ থাকেন। এরপর হযরত খাদিজা ফিরে এসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওয়ারাকার কথা শোনান! এরপর তিনি হেরা ূহায় তাঁর অবস্থানের মেয়াদ পূর্ণ করে মক্কায় এলে ওয়ারাকা ইবনে নওফাল তাঁর সাথে দেখা করে সব কথা বিস্তারিত শোনার পর বললেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, আপনি হচ্ছেন এ উম্মতের নবী। আপনার কাছে সেই বড়ো ফেরেশতা এসেছেন, যিনি হযরত মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন।

সাময়িকভাবে ওহীর আগমন স্থগিত

ওহীর আগমন কতোদিন যাবত স্থগিত ছিলো এ সম্পর্কে ইবনে সা’দ হযরত ইবনে আব্বাসের একটি বর্ণনা উদ্ধিৃত করেছেন। এতে উল্লেখ রয়েছে, ওহী কয়েকদিনের জন্যে স্থগিত ছিলো। সবদিক বিবেচনা করলে এ বর্ণনাই অগ্রগণ্য এবং নিশ্চিত মনে হয়। একটা কথা বিখ্যাত রয়েছে, আড়াই বা তিন বছর ওহী স্থগিত ছিলো, তা একেবারেই অসত্য। তবে এখানে এ সম্পর্কিত যুক্তি প্রমাণ আলোচনার অবকাশ নেই। ওহী স্থগিত থাকার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষণ্ন এবং চিন্তাযুক্ত থাকতেন। তাঁর ওপর অস্থিরতা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছেয়ে থাকতো। সহীহ বোখারী শরীফের কিতাবুত তাবীর-এর এক বর্ণনায় রয়েছে, ওহীর আগমন স্থগিত হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতোটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন যে, কয়েকবার উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন যেখান থেকে লাফিয়ে নীচে পড়বেন, কিন্তু পাহাড়ে ওঠার পর জিবরাঈল প্রকাশিত হয়ে বলতেন, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর সত্য রসূল। এ কথা শোনার পর তাঁর অস্থিরতা কেটে যেতো। তিনি প্রশান্ত মনে ঘরে ফিরে আসতেন। পুনরায় ওহীর আগমন দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বন্ধ থাকলে তিনি নিজেকে পাহাড় চূড়া থেকে ফেলে দেয়ার জন্যে বের হতেন। সেখানে জিবরাঈল (আ.) নিজেকে প্রকাশ করে একই কথার পুনরাবৃত্তি করতেন, হে মোহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসূল।

ওহী নিয়ে পুনরায় জিবরাঈলের আগমন

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (র.) লিখেছেন, ওহী কিছুকাল স্থগিত থাকার কারণ ছিলো, তিনি যে ভয় পেয়েছিলেন সেই ভয় যেন কেটে যায় এবং পুনরায় ওহীপ্রাপ্তির আগ্রহ এবং প্রতীক্ষা তাঁর মনে জাগে। বিস্ময়ের ঘোর কেটে যাওয়ার পর বাস্তব অবস্থা তাঁর সামনে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ পায়। তিনি সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারলেন, তিনি আল্লাহর নবী হয়েছেন এবং যিনি তাঁর কাছে এসেছেন তিনি ওহীর বাণী বহনকারী, আসমানী সংবাদবাহক। এরূপ বিশ্বাস তাঁর মনে দৃঢ় হওয়ার পর তিনি আগ্রহের সাথে ওহীর জন্যে অপেক্ষা করতে থাকতেন। যাতে প্রতিভাত হচ্ছিলো, ভবিষ্যতে ওহীর আগমনে তিনি দৃঢ়পদ থাকবেন এবং ওহীর ভার বোঝা উঠিয়ে নেবেন। এ পর্যায়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) পুনরায় এসে হাযির হন। সহীহ বোখারী শরীফে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি রসূল (স.)-এর মুখে ওহী স্থগিত হওয়ার বিবরণ শুনেছেন। তিনি বলছিলেন, আমি পথ চলছিলাম। হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়ায শোনা গেলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সে ফেরেশতা, যিনি হেরা গুহায় আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি আসমান যমীনের মাঝখানে একখানি কুরসীতে বসে আছেন। আমি ভয় পেয়ে ঝুঁকে পড়ি। এরপর বাড়িতে এসে স্ত্রীকে বললাম, আমাকে চাদর জড়িয়ে দাও, আমাকে চাদর জড়িয়ে দাও। স্ত্রী আমাকে চাদর জড়িয়ে শুইয়ে দিলেন। এরপর আল্লহ তায়ালা সূরা মোদদাসসের-এর শুরু থেকে ‘ওয়াররুজযা ফাহজুর’ পর্যন্ত নাযিল করেন। এ ঘটনার পর থেকে ক্রমাগত ওহী নাযিল হতে থাকে।

ওহীর বিভিন্ন রকম

এখন আমরা নবুয়ত রেসালাত জীবনের বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে ওহীর প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোকপাত করতে চাই। এতে রেসালাত ও নবুয়ত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। আল্লামা ইবনে কাইয়েম ওহীর নিম্নোক্ত প্রকারসমূহের কথা উল্লেখ করেছেন:

এক. সত্য স্বপ্ন- যার মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিলের সূচনা হয়।

দুই. ফেরেশতা তাঁকে দেখা না দিয়ে তাঁর মনে কথা প্রক্ষেপ করতেন। যেমন নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রুহুল কুদুস আমার মনে একথা বসিয়ে দিলেন যে, কোনো মানুষ তার জন্যে নির্ধারিত রেযেক পুরোপুরি পাওয়ার আগে মৃত্যু বরণ করে না। কাজেই আল্লাহকে ভয় করো এবং ভালো পথ রেযেক তালাশ করো। রেযেক পেতে বিলম্বে যেন তোমাদের আল্লাহর নাফরমানীর মাধ্যমে রেযেক তালাশে উদ্বুী না করো। কেননা আল্লাহর কাছে যা কিছু রয়েছে, সেটা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া যায় না।

তিন. ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধরে এসে রসূল (স.)-কে সম্বোধন করতেন। ফেরেশতা যা কিছু বলতেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মুখস্থ করে নিতেন। এ সময় কখনো কখনো সাহাবায়ে কেরামও ফেরেশতাকে দেখতে পেতেন।

চার. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ঘন্টাধ্বনির মতো টন টন শব্দে ওহী আসতো, এটি ছিলো ওহীর সবচেয়ে কঠোর অবস্থা। এ অবস্থায় ফেরেশতা তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং প্রচন্ড শীতের মওসুমেও তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়তো। তিনি উটের ওপর সওয়ার থাকলে সেটি মাটিতে বসে পড়তো। একবার হযরত যায়দ ইবনে সাবেতের ঊরুর ওপর তাঁর ঊরু থাকা অবস্থায় ওহী আসে। হযরত যায়েদ এতো ভার বোধ করলেন যেন তার ঊরু থেঁতলে যাবে।

পাঁচ. তিনি ফেরেশতাকে তার প্রকৃত চেহারায় দেখতেন। সে অবস্থায়ই ফেরেশতা আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর ওপর ওহী নাযিল করতেন। দু’বার এরূপ হয়েছিলো। কোরআনের সূরা নাজমে আল্লাহ তায়ালা যার উল্লেখ করেছেন।

ছয়. মেরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালা নামায ফরয হওয়া এবং অন্যান্য বিষয়ের ওহী নাযিল করেন। যখন রসূল (স.) আকাশে ছিলেন।

সাত. ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ তায়ালার সরাসরি রসূল (স.)-এর সাথে কথা বলা, যেমন হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে বলেছিলেন। মূসা (আ.)-এর ওহীর এ প্রকার কোরআন মজীদের সুস্পষ্ট বর্ণনা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত রয়েছে। নবী করীম (স.)-এর এ প্রকারের ওহীর প্রমাণ (কোরআন মাজীদের পরিবর্তে) মে’রাজের হাদীসে রয়েছে।

আট. কেউ কেউ আর এক প্রকার ওহীর উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার পর্দাবিহীন মুখোমুখি অবস্থায় কথা বলা, ওহীর এ প্রকার সম্পর্কে পূর্ববর্তীদের থেকে নিয়ে পরবর্তীদের পর্যন্ত মতভেদ চলে আসছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY