নামাযের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও আধুনিক বিজ্ঞান

0
63

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

মানুষ সম্মান ও মর্যাদার সাথে সমাজে বসবাস করবে, এটাই হচ্ছে তা স্বভাব ধর্ম। এ মানুষই যদি ইসলামের পবিত্রতার শিাক্ষা উপোক্ষা করে, তবে তারা নানা রকমের মানসিক রোগে আক্রান্ত হবে। এসব রোগের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো রোগ হচ্ছে, তারা হীনমন্যতার শিকার হবে। এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরই তারা নানা রকম মানসিক রোগের সম্মুখীন হবে।

তারতীব অনুযায়ী নামায আদায়

নামায আদায়ে তারতীব বা পর্যায়ক্রম রা করা ওয়াজিব। যদি নামায আদায়ের ক্ষেত্রে তারতীব লংঘন করা হয় তবে শারীরিক এবং মানসিক উপকার থেকে বঞ্চিত হতে হবে। কারণ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, নামাযের ক্ষেত্রে ব্যায়ামের পদ্ধতি বিদ্যমান। এর মধ্যে একটা পর্যায়ক্রমিকতা রয়েছে। এ পর্যায়ক্রম রা করা আবশ্যক। প্রথমে কেয়াম না করে কেউ যদি সাজদা করে তবে স্বাস্থ্যের জন্যে যা প্রয়োজন তা পূরণ হবে না; বরং এরকম করা হলে রোগ দেখা দেবে।

কান বা কাঁধ পর্যন্ত হাত তোলা

কান বা কাঁধ পর্যন্ত হাত তোলা নামাযের সুন্নত। কান পর্যন্ত হাত তোলা হলে বাহু, ঘাড়, কাঁধের ব্যায়াম সম্পন্ন হয়। হৃদরোগীদের জন্যে এ ব্যায়াম অত্যন্ত উপকারী। নামায আদায়ের মধ্যে এ ব্যায়াম সম্পন্ন হয়ে যায়। এ ব্যায়াম পাঘাত রোগ থেকেও মানুষকে নিরাপদ রাখে।

তাকবীরে তাহরীমার সময় মাথানত না করা

তাকবীরে তাহরিমার সময় যদি মাথা নীচু করা হয় অথবা ডানে বামে ঝুঁকানো হয় তবে দুই হাত কান পর্যন্ত উঠানোর যে উপকারিতা রয়েছে তা পাওয়া যাবে না। নামায দুনিয়া ও আখেরাতের যে কল্যাণের নিশ্চয়তা দেয় তা কেবল তখনই পাওয়া যাবে, যখন নামায পরিপূর্ণভাবে সুন্নত অনুযায়ী আদায় করা হবে, অন্যথায় সে কল্যাণপ্রাপ্তি সুদূরপরাহত হয়ে যাবে।

বাম হাত ডান হাতের ওপর রাখা

প্রত্যেক ভালো কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ইসলাম ডান হাত ব্যবহার করার তাকিদ দিয়েছে। ডান হাতের মধ্যে বরকত রয়েছে। প্রকৃতপে মানুষের ডান দিকের অংগ এবং বাম দিকের অংগের প্রকৃতি আলাদা। ডান দিকের অংগ প্রত্যংগ থেকে বের হওয়া রশ্মি পজেটিভ আর বাম দিকের অংগ প্রত্যংগ থেকে বের হওয়া রশ্মি নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নামাযের মধ্যে সাজদা করার জায়গায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা জরুরী। বাম হাতের ওপর ডান হাত বাঁধার বিধান দেয়া হয়েছে। ডান হাত অবশ হয়ে যাওয়া লোকদের সচল বাম হাতের ওপর ডান হাত রাখতে বলা হয়। এতে করে বাম হাতের বিদ্যুৎ প্রবাহ ডান হাতে সঞ্চালিত হয়ে ডান হাতে সচলতা ফিরে আসতে পারে।

নামায সাংবাদিক দেওয়ান সিং মাফতুন

দেওয়ান সিং মাফতুন ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি ‘রিয়াসাত’ নামে একটি সাময়িকী বের করতেন। ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের সময় উক্ত সাময়িকী ভারতীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্য জগতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। এ সাময়িকীর একটি সংখ্যায় তিনি লিখেছেন, নামায মানুষকে সময়ানুবর্তিতা শিা দেয়। কেউ যদি ডিসিপ্লিন শিখতে চায় সে যেন নামায সম্পর্কে চিন্তা করে। নামাযের মধ্যে প্রভু ভৃত্যের পার্থক্য থাকে না। বাদশাহ সুলতান মাহমুদ এবং ভৃত্য আয়াজ একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করে। সকল মুসলমান সঠিকভাবে যদি নামায আদায় করতে শুরু করে তবে কোরআনের ঘোষণাই বাস্তবায়িত হবে, মুসলমানরাই বিজয়ী হবে। দেহ, সমাজ সংস্কার ও পরিশুদ্ধির উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা হচ্ছে নামায। নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হন আল্লাহর সৃষ্টিও সন্তুষ্ট হয়। (রিয়াসাত সাময়িকীর সৌজন্যে)

তাহাজ্জুদ এবং শেষ রাতে জাগ্রত থাকা

অবসাদগ্রস্ততার চিকিসা

অভিজ্ঞতা এবং গবেষণায় একথা দিবালোকের মতো সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, রুগ্ন, অসুস্থ, অর্ধমৃত এবং অনিদ্রার রোগীদের নানা রকমের চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দুনিয়া ও আখেরাতের জন্যে কল্যাণকর একটি চিকিৎসাও রয়েছে। এ চিকিৎসা হচ্ছে নামায। যাদের দেহের ভেতর নানাবিধ আভ্যন্তরীণ রোগ রয়েছে তারা যদি রাতের শেষদিকে জেগে কাটায়, তবে তাদের দেহ অবশ্যই এর সুফল লাভ করে। মনস্তত্ত্বের চিকিৎসক এবং মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে প্রমাণিত কিছু গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, রমযানে মুসলমানদের মধ্যে ডিপ্রেশন বা অবসাদ রোগ কম দেখা যায়। রমযান মাসে চিকিৎসকদের কাছে অবসাদের রোগী খুব কম আসে। এর কারণস্বরূপ তারা উল্লেখ করেন, রমযান মাসে মুসলমানরা রাত্রি শেষে সেহরী খায়, তাহাজ্জুদ আদায় করে, ফলে তাদের মধ্যে কান্তি এবং অবসাদ দেখা দেয় না। এ কারণেই চিকিৎসকরা এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, শেষ রাতে জেগে থাকা স্বাস্থ্যের জন্যে অত্যন্ত উপকারী।

আল্লামা ইকবাল মেডিকেল কলেজের

মেথড অব ট্রিটমেন্ট

১৯৮৫ সালের জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাহোরের আল্লামা ইকবাল মেডিকেল কলেজের মনস্তত্ত্ব ও মস্তিষ্ক বিজ্ঞান বিভাগ অবসাদ সংক্রান্ত এক কর্মসূচী গ্রহণ করে। এ কর্মসূচীতে অবসাদ বা ডিপ্রেশনের রোগীদের একত্রে রাখা হয়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে ৬৪ জন রোগী মনোনীত করা হয়। এদেরকে ৩২ জন করে দুই ভাগে ভাগ করে প্রথম দলের ৩২ জনের জন্যে তাহাজ্জুদ নামায বাধ্যতামূলক করা হয়। দ্বিতীয় দলের ৩২ জনকে শেষ রাতে কিছু সময় জেগে থেকে যারা তাহাজ্জুদ আদায় করবে তাদের প্রতি দৃষ্টি রাখার কথা বলা হয়। এ সকল রোগী দীর্ঘদিন যাবত অবসাদে ভুগছিলেন এবং নানা রকমের চিকিৎসাও তারা গ্রহণ করেছেন। উল্লিখিত চিকিৎসার সময়ে অন্য সকল প্রকার ওষুধ তাদের জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়। উভয় দলের জন্যে রাত ২টা থেকে রাত ৪টা পর্যন্ত জেগে থাকা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়। প্রথম দলকে বলা হয়, তারা আল্লাহর যেকের, কোরআন তেলাওয়াত এবং তাহাজ্জুদ নামায আদায় করবে। এ সময়ে কোরআনের এ দু’টি আয়াত কয়েকশ বার পাঠ করতে বলা হয়।

১. আলা বেযিকরিল্লাহে তাৎমাইননুল কুলুব

২. ওয়া ইযা মারিদতু ফাহুয়া ইয়াশফিন

রোগীদের বলা হয়, তারা যেন যেকেরের সময়ে মন নরম রাখে এবং নিজেদের মহান আল্লাহর নিকটবর্তী মনে করে। এ দলের নামকরণ করা হয় রিসার্চ গ্রুপ দ্বিতীয় দলকে নাম দেয়া হয়েছিলো কন্ট্রোল গ্রুপ। তাদের বলা হয়, তারা যে দুই ঘন্টা জেগে থাকবে সে দুই ঘণ্টা তারা ছোটোখাটো কাজ কর্ম করবে অথবা বই পড়বে। সপ্তাহে দুবার এ রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হতো। চার সপ্তাহ পর রোগীদের হেমিলটন ডিপ্রেশন স্কেল দিয়ে নিরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, যারা ছোটোখাটো কর্ম করেছে এবং বই পড়েছে, অর্থাৎ কন্ট্রোল গ্রুপ তাদের তুলনায় যারা নামায, কোরআন তেলাওয়াত এবং যেকের করেছে তাদের রোগ অনেক কমে গেছে।

ফলাফল :

চার সপ্তাহ চিকিৎসার পর সুস্থ কোনো প্রকার প্রভাব পড়েনি মোট
১. রিসার্চ গ্রুপ ২৫ জন ৭ জন ৩২ জন
২. কন্ট্রোল গ্রুপ ৫ জন ২৭ জন ৩২ জন
৩. মোট ৩০ জন ৩৪ জন ৬৪ জন

রিসার্চ গ্রুপের ৬২ জন রোগীর মধ্যে ২৫ জন আরোগ্য লাভ করেছে। এদের মধ্যে ১৫ জন পুরুষ ও ১০ জন মহিলা। অর্থাৎ ৭৮ ভাগ সুস্থ হয়েছে। ৭ জন রোগী অর্থাৎ শতকরা ২১ দশমিক ৯ ভাগ (৫ জন পুরুষ, ২ জন মহিলা) কোনো ফল পায়নি। অন্যদিকে কন্ট্রোল গ্রুপের ৩২ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন রোগী আরোগ্য লাভ করেছে। অর্থাৎ শতকরা ৮৩ দশমিক ২৭ ভাগ রোগী (১৬ জন পুরুষ, ১১ জন মহিলা) কোনো উপকার পায়নি। তাহাজ্জুদ নামায একজন মুসলমানের জন্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রাতের কিছু অংশে তুমি তাহাজ্জুদ আদায় করো। এটা তোমার জন্যে অতিরিক্ত। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৭৯)

তাহাজ্জুদ নামায রোগীদের সরল সঠিক পথ নির্দেশ করে। এ নামায যদি গভীর মনোযোগের সাথে আদায় করা যায়, এ নামাযে যদি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো যায় তবে সুফল অবধারিত। এর ফলে রোগের প্রকোপ কমে যাবে এবং জীবন সুন্দর সুখময় হয়ে ওঠবে। কারণ যারা তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে তারা মানসিক প্রশান্তি লাভ করে।

আল্লাহ তায়ালা কোরআনের আরেক আয়াতে বলেন, আর আমি কোরআনে এমন জিনিস অবতীর্ণ করেছি যা ঈমানদারদের জন্যে আরোগ্য এবং রহমত স্বরূপ। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৮২)

এখানে একটা কথা উল্লেখ করা যায়, মুসলমানরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, সকল বিপদ আপদ, সুখ শান্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। যদি আমরা খাঁটি মনে আল্লাহর কাছে দোষক্রটি স্বীকার করে মা প্রার্থনা করি, তবে আল্লাহ তায়ালা মা করেন। তিনি নিজের দয়া ও রহমত দ্বারা আমাদের বিপদ-মসিবত দূর করে দেবেন। তাহাজ্জুদ নামায হচ্ছে একটি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা। এ নামায আদায়ের শিা কোরআন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সফলতার দিক থেকে পাশ্চাত্যের চিকিৎসা ব্যবস্থা এ চিকিৎসার ধারেকাছেও আসতে পারে না। একজন মুসলমান মনেপ্রাণে একথা বিশ্বাস করে, সে আল্লাহ তায়ালার একজন ক্ষুদ্র দাস। একথাও বিশ্বাস করে যে, তার জীবন মৃত্যু আল্লাহর হাতে রয়েছে। জীবনের নানারকমের সমস্যা ও জটিলতায় আল্লাহ তায়ালাই মুক্তি দিয়ে থাকেন- একথাও একজন মুসলমান পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করে। কোরআন হাদীস থেকে সংগৃহীত এ চিকিৎসা পদ্ধতি অন্যান্য মনস্তাত্ত্বিক এবং অমনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা পদ্ধতির মোম জবাব। প্রকৃতপে কোনো রোগই এমন নেই যে রোগের চিকিৎসা নেই। রসূল (স.) বলেছেন, সকল রোগেরই ওষুধ রয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা রোগীদের রোগ চিকিৎসার ব্যবস্থা দিয়েছেন। তবে এমন রোগও রয়েছে যে রোগের চিকিৎসা বা প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। যেমন ক্যান্সার এবং এইডস। তবে উপরোক্ত হাদীসের আলোকে একথা দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, এ সকল রোগেরও চিকিৎসা অবশ্যই রয়েছে। মানসিক রোগসমূহের চিকিৎসা হচ্ছে মানসিক শান্তি। এ মানসিক শান্তি একমাত্র নামাযের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। নামাযের মাধ্যমে রূহানী এবং মনস্তাত্ত্বিক পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতা লাভ করা যায়। মোট কথা, আমরা যে কোনো রোগ প্রতিরোধের জন্যেই সেরাতুল মোস্তাকিমের আশ্রয় নিতে পারি। কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকেই একথার প্রমাণ পাওয়া যায়। (মাসিক আশরাফ, ডক্টর শরীফ চৌধুরী)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY