যুব চরিত্র বনাম ধর্মীয় অনুশাসন

0
101

যুব চরিত্রের যে অবস্থা ইতিপূর্বে আমি বর্ণনা করলাম, ইচ্ছে করলে এর কিছু অংশ যে আমরা বদলাতে পারি না তা নয়। আমরা আমাদের ঘরের পরিবেশ, নিজের ভাই বোন, সন্তান-সন্ততিদের নৈতিক দেউলিয়াপনা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে পারি। তবে, এক্ষেত্রে আগে আমাদের সংশোধনের পদ্ধতিটা জানা দরকার। অনেক সময় শাসনের নামে আমরা কুশাসনে সন্তান-সন্তুতির জীবন বিনষ্ট করে দেই। অথচ ছোটো বেলায় যদি আদর সোহাগ দিয়ে তাদের কঁচি মনে একবার ধর্মীয় অনুশাসনগুলোর গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়া যায়, তাহলে তারা স্বেচ্ছায় স্বতস্ফূর্তভাবে সারা জীবন ধরে এগুলো পালন করে যাবে।
এ ক্ষেত্রে এই কথাটা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সমস্ত অন্যায় অনাচারের মূল উৎসই হচ্ছে মানুষের মনে আল্লাহভীতির অনুপস্থিতি। আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করেনা বলেই মানুষ দিনে দিনে এভাবে পাপের পংকে নিমজ্জিত হয়। এক ব্যক্তি যেমন আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে না বলেই সহজে পাপের পথে পা বাড়ায়, তেমনি আরেকজন আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে বলেই পাপ থেকে সযত্নে নিজেকে দূরে রাখে। তাই আজ সর্বাগ্রে প্রয়োজন যুব মনে আল্লাহভীতির সঞ্চার করা। যদি তার মনে যথাযথভাবে আল্লাহর ভয়, পরকালের ভয় জাগিয়ে তোলা যায় তাহলে আল্লাহর পথে চলার ব্যাপারে সে নিজে থেকেই অনুপ্রাণিত হবে।
প্রসংগক্রমে আমার মরহুম আব্বার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। একজন আদর্শ পিতা হিসাবে তিনি সব সময়ই চাইতেন ছোটবেলায়ই আমাদের মনে আল্লাহভীতি জেগে উঠুক। একবার আমরা দুবোন মিলে একটা মারাত্মক অপরাধ করে ফেলেছিলাম। শেষ পর্যন্ত বিচারের ভারটা আব্বার ওপরই গিয়ে পড়লো। তিনি জ্ঞানবান পিতা হিসেবে চিন্তা করলেন, আজ প্রয়োজন সবার আগে এদের মনে আল্লাহর ভয়টুকু সৃষ্টি করা। রাতে তিনি আমাদের দু’বোনকেই ডাকলেন। অপরাধের ফিরিস্তি শুনে তিনি আমাদের মারলেন না, বকলেনও না। আব্বা আমাদের উপদেশ দিলেন,
‘আল্লাহর রসূল চোরের ডান হাত কেটে দিতেন। চুরি করা মহাপাপ। চুরি করলে বেহেশত পাওয়া যায় না, দোযখের আগুনে জ্বলতে হয়। আল্লাহর কিছুই অদেখা অজানা নেই। তিনি সমস্ত গোপন কিছু জানেন ও দেখেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে চুরি করতে নিষেধ করেছেন। চুরি করলে আল্লাহ তায়ালা রাগ করেন। তিনি রাগ করলে মৃত্যুর পর ওই ছোট অন্ধকার কবরে বড় বড় সাপ বিচ্ছু জোঁক ঢুকে কামড়াবে। ফেরেশতারা আগুনের গদা নিয়ে আঘাত করে সত্তর গজ নীচে নামিয়ে ফেলবে, আবার আগুনের বড়শী দিয়ে গেঁথে টেনে তুলবে, পানি খেতে চাইলে আগুনের পুঁজ, রক্ত খেতে দেবে, এমনি আযাব চলতে থাকবে লক্ষ কোটি বছর তক- একেবারে কেয়ামত পর্যন্ত। যারা আল্লাহর আদেশ মানে না, তাদের এই হচ্ছে শাস্তি।’
এমনি আরো অনেকগুলো উপদেশ দিলেন তিনি। কি যাদু ছিলো এসব কথায় জানি না। সেই যে আল্লাহর ভয় ভেতরে ঢুকেছে আজ পর্যন্ত সেই ভীতিকেই আমি ধরে রাখার চেষ্টা করছি। কোনো অন্যায় কাজ করতে গেলেই মনে পড়ে, আল্লাহ তায়ালা তো সবই দেখতে পাচ্ছেন। শারীরিক শাস্তি যে চারিত্রিক সংশোধন আনতে পারেনি, মন মানসিকতায় আল্লাহভীতির ফলে তাই সম্ভব হয়েছিলো।
আজ জাতীয় জীবনের সার্বিক অধপতন দেখে আমার সেই ছোটো বেলার কথাগুলোই মনে পড়ে গেলো। মানুষ কিভাবে আল্লাহ তায়ালাকে আল্লাহর আদেশ নিষেধকে উপেক্ষা করে চলছে। এরই ফলে আমাদের জীবনে নেমে এসেছে অভাব, অনটন, হতাশা আর চরম গ্লানি। আল্লাহর ভয় থাকলে দেশের যেখানে যে পদে যিনি রয়েছেন তিনি চতুরতার সাথেই মানুষের চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও, আল্লাহর চোখকে তো ফাঁকি দিতে পারবেন না। তার কাছে একদিন সবকিছুর জন্যেই আমাদের সবার জবাবদিহি করতে হবে। সমস্ত অন্যায়ের সাজা সেদিন মাথা পেতে নিতে হবে। এই ভয়টুকু হৃদয় মনে জাগরুক থাকলে ব্যক্তি ও জাতির জীবনে কোনো প্রকার কলুষতা আসতে পারে না।
ধরা যাক দুর্নীতিবাজ কোনো বিভাগের কোনো একজন অফিসারের কথা। যে কেউই মোটা টাকা দিয়ে তার কাছ থেকে গোপনে কাজ বাগিয়ে নিতে পারে। যে কাজ বাগিয়ে নিলো এবং যে করে দিলো উভয়েই জানে এটা অন্যায়, অবৈধ, এটা বে-আইনী ও নিষিদ্ধ কাজ। এর প্রতিটি পয়সা হারাম, এই হারাম উপার্জনের জন্যে আজ সরকারের চোখ ফাঁকী দিয়ে বেঁচে গেলেও আল্লাহর আদালতে একদিন এর জন্যে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কিন্তু এসব সত্বেও এদের কোনো ভাবোদয় হয় না, হয়না এ জন্যে যে, তাদের মনে আল্লাহর ভয় নেই। সততা ন্যায়নীতি ও সঠিক পথের সন্ধান এরা পায়নি, প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি কাজে আল্লাহর উপস্থিতি এরা অনুভব করে না, যদি করতো তাহলে সমাজে আজ এতো অনাচারের জন্ম হতো না।
যারা লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে অবৈধ লাইসেন্স, পারমিট করিয়ে নেয়, আর কালো টাকার পাহাড় গড়ে তাদের কথাই ধরুন না! তারা হচ্ছে সমাজের বিষফোঁড়া। বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষ দিয়ে তারা লাইসেন্স, পারমিট করিয়ে নেয়, আর তাই কালোবাজারে বিক্রী করে দেয়। ওদিকে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স, পারমিটের সু-ব্যবস্থা ভোগ করতে না পেরে খোলা বাজারে অথবা কালোবাজারীদের কাছ থেকে বেশী দামে মাল কেনে। ফলে বাজারে দ্রব্যমূল্য দিন দিন বাড়তে থাকে, সরকারের পক্ষে তখন একে রোধ করাও অসম্ভব হয়ে ওঠে। ঘুষ খাওয়া ও ঘুষ দেয়া উভয়টাই হারাম। এটা যে খায় এবং যে দেয় তারা উভয়ই এটা জানে এবং এই হারাম রোজগার দিয়ে স্ত্রী-পুত্র পরিজনকে পুষ্ট করে তোলা যে ইসলামের দৃষ্টিতে কতো বড়ো পাপ তাও তারা জানে। জানে না কারা! যারা চুরি, ডাকাতি, লুটতরাজ করে, হাইজ্যাক করে, রক্ষক হয়ে গরীবের মাল ভক্ষণ করে, রক্ষক সেজে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারে সাহায্য করে, দেশে অরাজকতা ও কৃত্রিম পণ্যসংকট সৃষ্টি করে, কালোবাজারী, মজুতদারী করে, তারা কি জানে না এসব পাপ! এ সবের জন্যে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তাদের জবাবদিহী করতে হবে। তবুও কেন তাদের মনে আল্লাহর ভয় জাগে না!
আসল কথা হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মহীনতার অভিশাপের কারণে অনেকেই এখন মূল ব্যাপারটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করতে চায় না। অথচ একমাত্র এই ধর্মই মানুষকে চরিত্রবান, আদর্শবান ও সত্যানুসারী করে তুলতে সক্ষম হয়। আল্লাহর ভয়ই মানুষকে শত লোভ লালসা থেকে সত্যের প্রতি করে একনিষ্ঠ করে রাখে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত, শোষণের নিেষণে পিষ্ট হয়েও একজন ধর্মভীরু মানুষ ন্যায়ের আদর্শ এবং সত্যপথ থেকে বোধশক্তি থাকা পর্যন্ত বিচ্যুত হতে পারে না।
আজকাল শিক্ষালয়গুলো থেকে যে ধরনের পাঠ্যগত শিক্ষা নিয়ে যুব সমাজ বেরিয়ে আসে তাতে আদর্শবাদিতা তাদের কাছ থেকে কোনোক্রমেই আশা করা যায় না।
আমার পাঠ্য জীবনের কথা মনে পড়ে। ৪র্থ শ্রেণীতে থাকতে দু’টো গল্প আমাদের পাঠ্য ছিলো। গল্পের নাম বা লেখকের নাম কিছুই আমার স্মরণ নেই। আবছা আবছা তার কাহিনীটুকুই মনে পড়ে। এই গল্প ছিলো ইয়ামেনের এক দানশীল ব্যক্তির। যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে অন্যের জীবন রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন। আরেক গল্পে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বিশেষ প্রয়োজনে একবার একজন গরীব লোককে দোকানে বসিয়ে দেশে গিয়েছিলো, পরে কি কারণে যেন সে আর ফিরতে পারেনি। তার আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে হতে এমন পর্যায়ে আসে যে, এক পর্যায়ে সে ভিক্ষায় নামে। এদিকে এ লোক ব্যবসা বাড়াতে বাড়াতে দোকানের অবিশ্বাস্য রকম উন্নতি সাধন করে ফেলে। সে লোক একদিন ভিক্ষা করতে করতে এই দোকানের সামনে এলে এ লোক তার জীর্ণ শীর্ণ মূর্তি দেখেও তাকে চিনতে পারে এবং বুকে বুক জড়িয়ে কেঁদে তার দোকান তার হাতে সঁপে দেয়।
এসব কথা শুধু গল্প বলার জন্যেই নয়, শিশু মস্তিস্কে এর মাধ্যমে এমন এক সুশিক্ষা প্রবিষ্ট করাতে হবে যা তাদেরকে পরবর্তী জীবনে এমনি আদর্শবান হয়ে গড়ে উঠতে অনুপ্রাণিত ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ করে তুলতে।
তখনকার দিনে এমনি ধরনেরই ছিলো পাঠ্যসূচী। তাই দেশে এতো দুর্নীতি, রাহাজানী, হানাহানী, চুরি, ডাকাতী, হাইজ্যাক, ধর্ষণ, লুটতরাজ, চোরাকারবারী, কালোবাজারী, মজুতদারী, মুনাফাখোরীর অস্তিত্ব ছিলো না। ছাত্রদের শিক্ষককে প্রহার করা, নকল করতে না দিলে গার্ডকে প্রাণের ভয় দেখানো এর কোনোটাই তখন ছিলো না। আর আজকাল তো পাঠ্য পুস্তক থেকেই ছেলেমেয়েরা কুশিক্ষা গ্রহণ করে বেরোয়-কাজেই তাদের কাছ থেকে কতোটুকুই বা ভালো কাজ আশা করা যাবে!
একটি বিশেষ গল্প এখানে লক্ষণীয়। আজকের ২য় ও ৩য় শ্রেণীর পাঠ্য বই ঘাটলেই দেখা যাবে কিভাবে তাদের মস্তিস্কে কুশিক্ষা ঢোকানো হচ্ছে।
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের কোন একটি বইতে গল্পটি দেখেছিলাম।
‘মায়ের নতুন সন্তান জন্ম দেয়া একটা বিরাট অপরাধ হিসেবে শিশু মুন্নীর চোখে বাধে, তাই সে রাগ করে ভাত খেতে আসে না। তার আরো ভাইবোন হলে তার খাওয়া পরা আদর কমে যাবে, সবকিছুতে ভাগ বসাবে নতুন মানুষটি। তাই তার মায়ের প্রতি মুন্নীর ভীষণ রাগ! যাদের বাচ্চা কম তাদের প্রতি মুন্নীর বেশী আকর্ষণ, মুন্নী তাদের ভালো জানে, তাদের প্রতি মুন্নীর শ্রদ্ধা আছে- নেই শুধু মার প্রতি যেহেতু মা আরেকটি সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছেন।’
এই গল্প শেখানোর পরও কি ওদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করার অধিকার আমাদের আছে? একটু সাধারণ জ্ঞানও যাদের আছে তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনারাই বলুন, এ অবস্থায় আমরা কি করে মানবীয় চরিত্রের সার্বিক বিকাশ তাদের কাছ থেকে আমরা কামনা করতে পারি? তাদের কাছ থেকে কি করে উত্তম চরিত্র আমরা আশা করতে পারি? কি করে আমরা দুর্নীতি মুক্ত করতে পারি এ সমাজকে? যেখানে ধর্মের সামান্যতম শিক্ষাও একটি শিশু মস্তিস্কে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয় না, বরং তার বদলে যাবতীয় খোদাহীনতা ও বেহায়াপনা শিক্ষা দেয়া হয়, সেখানে কি করে আমাদের সমাজ কলুষমুক্ত হবে?
সমাজ কলুষমুক্ত করতে সবচে’ বেশী কার্যকর হচ্ছে ধর্মের প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি করা। মানুষ যখন একথা মনে করে যে, আল্লাহর কাছে সব কিছুর জন্যে একদিন জবাবদিহী করতে হবে, আল্লাহর সে আদালতে কাউকে ফাঁকি দেয়া যাবে না, মৃত্যুর কঠিন স্পর্শের কাছে একদিন সবাইকে আত্মসমর্পন করতেই হবে, সেদিন প্রতিটি ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব দিতে হবে, আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে কোনো কিছু নেই। তার উপস্থিতি সর্বদা অনুভব করলে, তার ভয় অন্তরে রাখলেই শুধু সমাজ দুর্নীতিমুক্ত হতে পারে। যাবতীয় সমস্যার সমাধান একমাত্র এখানেই নিহিত। সামাজিক ও সার্বিক উন্নয়নে ধর্মের চাইতে বেশী প্রভাব অন্য কিছুর নেই।
প্রিয় পাঠক, এ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমাদের সমাজ চরিত্রের যে মর্মান্তিক অবক্ষয়ের কথা বলছিলাম তার সমান অংশীদার কিন্তু আমরা নারী পুরুষ সবাই। নৈতিক দেউলিয়াপনার শিকার সমভাবে আমরা উভয়ই। সমাজের একজন যুবক যেমন আজ পথহারা-একজন যুবতীও তেমনি নীড়ভ্রষ্টা, পথহারা।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY