আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য (শেষ কিস্তি)

0
71

ইরবাদ বিন সারিয়া রসূলের একখানা খোতবা বর্ণনা করেন। তাতে তিনি বলেছেন- একদিন নামায শেষে আমাদের দিকে ফিরে রসূল (স.) অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও আকর্ষণীয় ভাষণ দান করেন। তাতে আমাদের অন্তর কেঁপে ওঠে। সবাই অঝোর কান্না শুরু করে দিয়েছে। অবশেষে আমি বললাম, হুজুর আপনার খোতবা শুনে মনে হচ্ছে বিদায়কালীন খোতবা? শেষ ছুটির খোতবা। যা হোক, আমাদের কিছু নসীহত করুন। রসূল (স.) বললেন, শোনো! আমি এমন পবিত্র ভূমিতে ছেড়ে যাচ্ছি যেখানের রাতও দিনের আলোর মতো আলোকিত। আমি আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দিয়েছি। এর মধ্যে কোনোটা ছোটো নয় কোনো অন্ধকারে রয়ে যায়নি। এরপর তুমি এদিক থেকে ওদিক হও তবে তার ভাগ্য বিড়ম্বিত হবে।
শোনো! তোমাদের মাঝে যে বেঁচে থাকবে সে বড়ো বড়ো এখতেলাফ দেখতে পাবে। অতএব, সেই এখতেলাফের সময়ে তোমরা আমার জীবন দিয়ে পৌঁছানো সুন্নত ও আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের পদ্ধতির ওপর অটল অবিচল থাকবে। দুনিয়ার হাওয়া এবং বাতিল শক্তি যেন আমার সুন্নত থেকে এক চুলও সরাতে না পারে। শোনো, তোমরা আমার আনুগত্য করতে থাকো। আমার দ্বীনের দাওয়াত দানকারী যদি হাবশী গোলামও হয়। মোমেনরা নাকে লাগাম বাঁধা উটের ন্যায়। অন্য এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর ভয়, শ্রবণ ও আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। যদি দাওয়াতদানকারী সে হাবশী গোলামও হয়। আমার পরে খুব শিঘ্রই কঠিন ইখতেলাফ দেখতে পাবে। তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, আমার সুন্নতের ওপর এবং খেলাফতের পদাঙ্ক অনুসরণের ওপর অবিচল থাকা। দ্বীনের দাওয়াতদানকারী যদি হাবশী গোলামও হয় (অর্থাৎ আমীরুল মোমেনীন খলীফাতুল মুসলিমীন সম্পূর্ণ স্বাধীনসত্তার অধিকারী হয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের ন্যায় হুকুম আহকাম সহকারে কোনো হাবশী গোলামও আসে তবে তার কথা শোনো এবং মানো)। হে আমার উম্মতেরা! আমার পরে নব আবিষ্কৃত কথা থেকে বহু দূরে থাকো। তার থেকে বেঁচে থাকো। আর বিশ্বাস করো যে, এই নব্য আকীদা কার্যাবলী স্রেফ গোমরাহী। অধিকাংশ সময় শোনা যায়, ওলামাদের এখতেলাফ আমাদের পেরেশান করে ফেলেছে। কারো মানি আর কারো যে মানি না তা জানি না। এই প্রশ্নের জবাব আমি নয় বরং আল্লাহর রসূল (স.) দিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ সে সময় আলেমদের, মৌলভীদের, দরবেশদের, ইমামদের, গবেষকদের, মুজতাহিদদের, সুফীদের ছেড়ে দাও। তাদের ত্যাগ করো, এ সময় শুধু আঁকড়ে ধরো আল্লাহর কিতাব ও রসূলের হাদীসকে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের তরীকাকে। এটাই হেদায়াতের রাস্তা। এই সম্পর্কেই কোরআন বলছে- যদি কোনো ব্যাপারে এখতেলাফ হয় তবে তখন তোমরা আল্লাহ ও রসূলের দিকে ফিরে যাও। অর্থাৎ এর ফয়সালা কোরআন হাদীস থেকে নিয়ে নাও। যদি তোমাদের আল্লাহর প্রতি এবং কাল কেয়ামতের প্রতি ঈমান থাকে। এটাই তোমাদের জন্যে অতি উত্তম ও উত্তমতর ব্যাখ্যা। অতএব, এখতেলাফী মাসআলার সময় কোন পীর, ইমামের বক্তব্য যাচাই করা ঈমানের বরখেলাফ এবং ভ্রান্ত পন্থা। এমন সময়ে আল্লাহ রসূলের ফরমানের দিকে ঝুঁকে যাওয়া উচিত। এটাই ঈমানের শর্ত। বুযর্গ ও বড়দের আনুগত্যের ক্ষেত্রে শর্ত হলো আল্লাহর রসূলের আনুগত্যের অধীন হতে হবে তা না হলে রসূল (স.) বলেছেন- ‘স্রষ্টার আইনের বিরোধিতায় সৃষ্টের কারো আনুগত্য করা হারাম।’ প্রিয় ভাইয়েরা! বড়োদের কথাও বড়। কিন্তু ঐসব বড়দেরও বড় আল্লাহ ও রসূল (স.)। যার মুখনিসৃত বয়ান আমাদের জন্যে আলোকবর্তিকা ও হেদায়াত এবং তা অন্য কারো বক্তব্য হতে পারে না। কোরআন বলছে- আমার এই নবী তো শরীয় কোনো ব্যাপাবে কেবল অহীর আদেশ ব্যতীত মুখ খোলেন না।’ এই অহী তো কোনো মুজতাহিদ, ইমাম, মৌলভী পীর মুরশিদ অর্জন হয় না; হতে পারে না। সুতরাং তাদের বক্তব্য ত্যাগ করার যুক্তি আছে। একমাত্র মোহাম্মদ (স.)-এর বাণীকেই ত্যাগ করা যাবে না। কেননা কোরআনের আয়াতের বিরোধিতা করা মানে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া। সহীহ হাদীসের বিরোধিতাকারীও ঈমান থেকে খারিজ। মনে রাখবে, হাদীসে রসূলের মোকাবেলায় কোনো ঈমান, মুরশিদ, পীর ফকিরের বক্তব্য পেশ করবে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কোরআন হাদীসের ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, রসূল (স.) যখন খোতবা দিতেন তখন রসূল (স.)-এর চোখ লাল হয়ে যেতো। আওয়াজ বড়ো হয়ে যেতো, রাগ বেড়ে যেতো, যেন তিনি শত্র“র মোকাবেলায় নিজের লোকদের সতর্ক করছেন এভাবে যে, ওরা সকাল বা সন্ধ্যায়ই তোমাদের ওপর হামলে পড়বে। তিনি তার খোতবায় বলেন, কেয়ামত এমনই নিকটে যে, বলে তার দুটি আঙ্গুল (মধ্যম ও শাহাদাত) একত্রে দেখিয়ে বলতেন, কেয়ামত ও আমি এরকম। এরপর হামদ ও সালাত শেষে বললেনÑ সবচেয়ে উত্তম কিতাব হচ্ছে কিতাবুল্লাহ কোরআনে কারীম। এবং সবচেয়ে উত্তম তরীকা হচ্ছে হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর তরীকা। এভাবে সবচেয়ে খারাপ ও নিকৃষ্ট প্রকারের কাজ হচ্ছে যারা আল্লাহর দ্বীনে নতুন কিছু আবিষ্কার করে। মনে রাখবে, এর রকম প্রত্যেকটা নতুন কাজ বেদআত। আর সব বেদআতই গোমরাহী। তিনি তার খোতবায় আরো বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে যে মৃত্যুবরণ করলো এবং সম্পদ রেখে মারা গেলো তা সব তার ওয়ারিসদের। এর মধ্যে আমাদের কোনো অংশ নেই। কিন্তু যে মরল আর কোনো সম্পদ রেখে গেলো না এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে মারা গেলো আমি তার ঋণ আদায় করবো। অনুরূপ যে ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের রেখে মারা গেলো আর তাদের যদি কোনো ধন সম্পদ না থাকে তবে তাদের পরওয়ারেশ করা এবং তাদের আহার-বিহারের ব্যবস্থা করা আমার দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা সত্য নবীর প্রতি দরূদ ও সালাম নাযিল করুন। উম্মতের প্রতি তাঁর কতো মহব্বত ও ভালোবাসা যে, উম্মতের বোঝা তিনি তার জিম্মায় নিয়ে নিয়েছেন। আর তার সম্পদ ওয়ারিসদের জন্যে ছেড়ে দিয়েছেন। ইসলামের এমন পূতপবিত্র কানুন তার সত্যতার জন্যে সে জিনেই একটি আলোকবর্তিতা। আজো যে মুসলমানদের ইমাম হবে তার জিম্মায় তার হুকুমের আদায় করা। এই সঙ্গে হুজুর (স.)-এর খোতবার মূল বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি দিন, তিনি কি পরিমাণ আমলের প্রতি আকৃষ্ট করেছেন এবং কি পরিমাণ বেদআত থেকে বারণ করেছেন। রসূলের খোতবায় এ বিষয়ে এতো গুরুত্বারোপ করার পর রসূলের উম্মতরা আজ নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করছেন আর এটাকে দ্বীন মনে করছে। মুসলমানরা যে কাজের ইচ্ছা পোষণ করবে। প্রথমে দেখে নাও যে, রসূল (স.) কি এ কাজ করেছেন না করেননি? যদি তিনি না করেন তাহলে তা বাদ দাও। আর যদি রসূল (স.) করেন কিভাবে করেছেন তা দেখো। যেভাবে রসূল (স.) করেছেন ঠিক সেভাবেই করো। শোনো, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘হে ঈমানদাররা! আল্লাহ ও রসূলের আগে বেড়ে যেয়ো না। আমার বক্তব্য হলো ইত্তেবা করবো ইবতেদা করবো না। আনুগত্য করবো নব্য ফর্মূলা বের করা থেকে বিরত থাকবো।’

হযরত জোবায়র বিন মুতয়িম (রা.) বলেছেন, রসূলুল্লাহ (স.) মোকামে হোযায়ফাতে আমাদের উদ্দেশে একটি খোতবা প্রদান করেন।
আমার সাথীরা! তোমরা কি আল্লাহ তায়ালাকে মাবুদে বর হক হওয়ার এবং তিনি ছাড়া আর কেউ কোনো এবাদতের যোগ্য নয় এবং আমি আল্লাহর রসূল হওয়ার এবং কোরআনে কারীম ফোরকানে হামীদ আল্লাহর কিতাব হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছো না? সকলে জবাব দিলাম, হাঁ, অবশ্যই আমরা সবাই এর সাক্ষ্য প্রদান করছি। তিনি বললেন, বেশ, তোমরা খুশী হও এবং শোনো! এটা আল্লাহর কিতাব কোরআনের কারীম। এর এক অংশ আল্লাহর হাতে আর অপর অংশ তোমাদের হাতে। সুতরাং তোমরা তাকে মজবুতীর সাথে ধরে রাখো। সুতরাং তোমরা ধ্বংস হবে না, পথভ্রষ্ট হবে না এবং বরবাদ হবে না। প্রিয় ভাইয়েরা! উপরোক্ত হাদীসের সাফ সাফ ব্যাখ্যা খোদ হাদীসের মধ্যেই রয়েছে আর আমি কি বলবো? কোরআন ও হাদীসকে মযবুতভাবে আঁকড়ে ধরো। এর মধ্যে যে বিধান বিদ্যমান আছে তাই শরীয়ত। আর এর মধ্যে যা নেই তা দ্বীন ধর্ম নয় এবং সেটা শরীয়তও নয়। নিজেদের অতীত লোকদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করো। যারা দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত আয়ত্তে নিয়েছে। তারা এতোটা শান্তি ও প্রশান্তিতে ছিলো যার উদাহরণ খুঁজে বেড়ানো বেহুদা। তাদের হাতে কি ছিলো। তাদের হাতে মাত্র এই ২টি জিনিসই ছিলো। তারই আলোতে তারা উঠা বসা করেছে। চলাফেরা করেছে। সুতরাং তাদের হাতে যখন এ দুটি জিনিসই মাত্র ছিলো তবে আজ কেন তোমাদের তৃতীয় আর কিছু খুঁজতে হবে? উঠো, আল্লাহর রশিকে মযবুতভাবে আঁকড়ে ধরো। তাতে তোমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাবে এবং পুনরায় দুনিয়ায় চমকে উঠতে পারবে যেভাবে পূর্বে ছিলে। আজ যে বিপদাপদ, দুঃখ দুর্দশা তা কেবল কোরআন হাদীস ছেড়ে চলার কারণেই। আসো, পুনরায় এই দুটি হীরকখন্ডকে আমরা মুষ্ঠিবদ্ধ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাই করতে সমর্থ দান করুন যাতে তিনি রাজী, যা তিনি পছন্দ করেন। আমার জন্যে এবং আপনাদের জন্যে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং সারাবিশ্বের মুসলমানদের জন্যেও ক্ষমা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ তুমি কবুল করো।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY