দেশের শিক্ষা পরিবর্তনের ধারা ও ইসলামী চেতনা

0
41

হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ

শিক্ষাংগনে আগামী ২০ বছরে কি ঘটতে যাচ্ছে, এ জাতির আগামী প্রজন্মকে আল্লাহ, রসূল, ইসলামী আকীদা বিশ্বাস ও মুসলিম কৃষ্টি কালচার থেকে সূম্পর্ণ দূরে সরিয়ে তাদের পশ্চিমের বাস্তুবাদ, পার্শ্ববর্তী দেশের সাংস্কৃতিক নগ্নতা ও বেহায়াপনার দাস বানাবার জন্যে এরা কোন্ কোন্ পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে, সেটা আমাদের সবাইকে দূরদৃষ্টির সনগ্লাস চশমা লাগিয়ে এখনি দেখতে হবে। রাত বিদায় নিয়ে গেছে, তাই ভোরের অপেক্ষা করে আরেকটি দিন বিনষ্ট করার অবকাশ নেই।
ইংরেজরা যদি ১০০ বছর পরবর্তী ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র অংকন করে এখানকার ভাবী বংশধরদের কালো চামড়ার ইংরেজ বানানোর অগ্রিম পরিকল্পনা করে তাদের জন্যে স্বতন্ত একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারে, তাহলে আমরা কেন মাত্র সিকি শতাব্দী পরে আমাদের জাতির জীবনে শিক্ষার কোন্ কালো ছায়া নেমে আসবে সে ব্যাপারে সতর্ক হতে পারবো না?
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে কথার বলার জন্যে আমার আরেকটু পেছনে যেতে হবে। আমাদের অনেকেরই ৬০ ও ৭০-এর দু দশকের কথা মনে আছে। ৪০-এর দশকের শেষের দিকে এসে ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরা নিজেদের শিক্ষা সংস্কৃতি, তাহযীব তমদ্দুনকে ইংরেজ তস্করদের লন্ডনের পার্লামেন্ট হাউজে বসে বানানো শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্যে স্বতন্ত্র একটি ভূখণ্ড বানাতে চেয়েছিলো। ৪৭ সালে ভারতীয় মুসলমানরা যে স্বাধীন রাষ্ট্র কামনা করেছিলো, তা কিন্তু শুধু একখন্ড যমীনের স্বাধীনতাই ছিলো না। মুসলমানদের জন্যে এটা ছিলো তাদের জীবনবোধ তথা ঈমান আকিদার গ্যারান্টি প্রদানকারী শিক্ষাব্যবস্থার আলোকে একটি নতুন জাতি গঠন করা। সাধারণ মুসলমানরা যা চেয়েছে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সে কাজটি মোটেই করেনি। তারা পাকিস্তানের ২৩ বছরে একটি দিনের জন্যেও একথা ভাবেনি, গোড়ায় গলদ রেখে অর্থাৎ ইংরেজদের তৈরী শিক্ষা ব্যবস্থা বহাল রেখে মুসলমানদের মুসলমান হিসেবে টিকিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই।
পাকিস্তানীরা তাদের শাসকগোষ্ঠী ও ইংরেজদের মানসপুত্র আমলাদের এ ক্ষমাহীন ভুলের মাসুল দিয়েছে। সিকি শতকের কম সময় অতিবাহিত না হতেই জনসাধারণ বুঝতে পারলো, যে উদ্দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কোরবান করে পাকিস্তান কায়েম হয়েছে, সে পাকিস্তান যখন তার লক্ষ্যচ্যুত হয়ে গেছে, তখন এই পাকিস্তানের আর থাকার দরকার নেই। ঈমান ও ইসলামের সেতুবন্ধন তথা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাই যদি প্রতিষ্ঠিত না হলো, তাহলে ১২শ মাইলের ব্যবধানে উপমহাদেশের দুই প্রান্তে দুটো দেশকে একত্রে রাখা কি দিয়ে এবং কোন যুক্তিতে। পাকিস্তানের প্রথম ১০/১৫ বছরে শাসকরা এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।
আইয়ুব খানের মিলিটারী ডিকটেরশীপের তখন জাঁকান্দানী অবস্থা। পাকিস্তানের এ অঞ্চল জুড়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিদ্রোহের উত্তাল সর্বত্র। পাকিস্তানের (এলিট গ্রুপ) সুশীল সমাজের লোকেরা বুঝতে পারলো, দেশটির জন্মের পর পরই ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার বদলে যদি একটি একমুখী ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতো, তাহলে ভারতের দু প্রান্তে অবস্থিত দেশের দু অংশের মানুষেরা অন্তত একথাটা বুঝতে পারতো, এ দুটি অংশকে কোন্ জিনিসটি একত্রিত করে রেখেছে। এ জিনিসটা যখন পাকিস্তানের সচেতন একটি এলিট গ্রুপ টের পেলো, তখন তড়িঘড়ি করে দেশের উভয় অংশের জন্যে একটি অভিন্ন ইসলামী আদর্শভিত্তিক শিক্ষা কারিকুলামসহ একটি পূর্ণাংগ ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রনয়নের জন্যে পর পর কয়েকটি শিক্ষা কমিশন বানানো হলো। সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে নরখান শিক্ষা কমিশন এলো এবং এতে এমন কিছু যুগান্তকারী অথচ মৌলিক পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা বলা হলো, যা বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রতিটি শিশুই ইসলামী জীবনবোধ সম্পর্কে জানতে পারতো, কিন্তু এ নর খান কমিশন পরিকল্পনা যখন এ অঞ্চলের বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর সামনে পেশ করা হলো, তখন অলরেডি দু অঞ্চলের ১২শ মাইলের দূরত্ব ১২ হাজার মাইল ছাড়িয়ে গেছে, তাই ক্যান্সারে আক্রান্তে মৃতু পথযাত্রী ব্যক্তির কাছে প্যারাসিটামল টেবলেটের মতো নরখান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টকে মনে হলো- টু লিটল টু লেট।
অথচ এ কাজটা আরো ২০ বছর আগে হলে এবং তা যথারীতি বাস্তবায়িত হলে হয়তো এ উপমহাদেশের ইতিহাস আজ ভিন্নভাবে লেখা হতো।
সরকার আমাদের এ ভূখন্ডে আগামী ২০ বছর পর শিক্ষা ব্যবস্থায় কি এ ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন, তার ক্ষেত্রেও একথা সমভাবে প্রযোজ্য। ২০ বছর পর আমরা ঠিকই টের পাবো যে, আমরা যে শিক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আমাদের আগামী প্রজন্মকে একজন আদর্শ দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, সে স্বপ্ন আমাদের জীবন ও জীবন পুস্তক থেকে হারিয়ে গেছে। ২০ বছর পর আমাদের ঘরে আমাদেরই আলো বাতাসে এমন একটি জেনারেশান গড়ে ওঠবে, যাদের দেখে মনে হবে এরা বুঝি অন্য কোনো গ্রহের মানুষ। এদের কথাবার্তা, চাল চলন, বিশ্বাস ও জীবনবোধ সবকিছুই হবে আমার আপনার চাইতে আলাদা। নাকে বুল রিং, কানে বালি ও নাভিতে অদ্ভুত ধরনের রিং পরে কিম্ভুতকিমাকার জানোয়ারের মতো যখন আপনার ছেলে মেয়েরা আপনার সামনে আসবে, তখন তাদের জন্যে ইসলামী শিক্ষার কথা চিন্তা করাটা কি একটি হাস্যকর ব্যাপারে পরিণত হবে না?

সম্ভবত এমনি একটি বাংলাদেশের জন্যেই আমরা সবাই অপেক্ষা করছি।
পাকিস্তান আমলের মতো এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, যাদের হাতে গত ৩৭ বছরে এর নেতৃত্ব ছিলো, তারা একদিনের জন্যেও ইসলামকে এ জাতির শিক্ষা সংস্কৃতির উৎস মনে করেননি। এজন্যে আমি কিন্তু এদেশের সাবেক রাজনৈতিক দল ও শাসকদের দায়ী করছি না। দায়ী করছি না এ জন্যে, যারা ৭১ সালে বাংলাদেশের জন্যে যুদ্ধ সংগ্রাম করেছেন তারা জাতিকে একথাই বুঝাতে চেয়েছেন, একটি খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার জন্যেই তারা বাংলাদেশ বাকোটিদেশটির নাচ্ছেন। যদিও বাস্তব অবস্থা ছিলো সূম্পর্ণ ভিন্ন। আসলে ৭১-এর যুদ্ধ ছিলো পাকিস্তানের শোষণ, নির্যাতন ও পূর্ণ পাকিস্তানের সাড়ে সাত মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে। যুদ্ধের পূর্বে ও যুদ্ধ চলাকালে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার তাদের স্বপ্ন হয়তো ছিলো, কিন্তু প্রকাশ্য কোনো ঘোষণা ছিলো না। অপর কথায় তাদের স্বপ্নে সে দেশের ছবি ছিলোÑ সেখানে ভবিষ্যতে ইসলাম নামক একটি ধর্মের জন্যে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি অবশ্যই কিছু জায়গা বরাদ্দ থাকবে- যে পরিমাণ জায়গা হিন্দু খৃস্টান বৌদ্ধ ধর্মের জন্যে বরাদ্দ থাকবে- ঠিক ততোটুকুই। অবশ্য ইসলাম ধর্মের কথা যেহেতু এখানকার লোকেরা একটু বেশী বলে, দেশের মাসজিদগুলোতে যেহেতু ইসলাম ধর্মের লোকেরা মন্দির গির্জার তুলনায় একটু বেশীই যায় তাই তাদের সুযোগ সুবিধ, সামান্য বেশী না হয় দেয়া যাবে!

যে অংশটা নিয়ে নতুন দেশটি বানানো হয়েছিলো তার শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ ইসলামী জীবন বিধানের ওপর বিশ্বাস করে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি যদিও তাদের ঈমান আকীদার ভিত্তিতে চলে না, কিন্তু এ দেশের মাসজিদে শান শওকতের সাথে নামায পড়া, রমযান মাসে গুরুগাম্ভীর্যের সাথে রোযা রাখা, ইফতার পার্টি করা, খতম তারাবীর আয়োজন করা, হজ্জের মাস আসলে রাস্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে হজ্জের ব্যবস্থার কোন্ কাজটা এখানে হচ্ছে না? এসব কিছুর মাঝে তো ইসলামের গন্ডিকে তারা সীমাবদ্ধ করার কথা বলেন না, কিন্তু তারা না চাইলেও দেশের অন্য সব কর্মকান্ড থেকে যেহেতু ইসলাম বিতাড়িত, তাই এগুলো ধীরে ধীরে তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় যারা সে সময় এই দেশটা বানিয়েছেন তাদের প্রথম গুরুত্বপর্ণ কাজ ছিলো- আগে তাদের বিশ্বাসমতো ইসলামের একটা সীমিত সংস্করণ তৈরী করা- যেখানে নামায, রোযা, হজ্জ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে যাকাত প্রদানটাকেই শুধু উৎসাহিত করা হবে।

পোস্টটি-Jul 7, 2015 সালে জুমারার অনলাইন এডিশন এ প্রকাশিত হয়েছিল

untitled-2213466388_1756071501281077_2073791806686577968_n

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY