আমাদের সভ্যতার ঐতিহাসিক নিদর্শন

0
141

ইতিপূর্বেকার বক্তৃতায় আমি আমাদের সভ্যতার কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছি। সেখানে বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন সভ্যতা মানব ইতিহাসে চিন্তায়-চেতনায়, নৈতিকতায় এবং বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে যতো বেশী প্রভাব বিস্তার করে ততোই সেই সভ্যতা বেশী স্থায়ী আসন লাভ করে। আমাদের সভ্যতা নিসন্দেহে মানব ইতিহাসের উন্নতিতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বাস আদর্শ, জ্ঞান শিক্ষা ও সাহিত্য দর্শনের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে। এবার দেখা যাক, সেসবের প্রভাব কিরূপ এবং এসব সেসবের গুরুত্বই বা কতোটুকু।
আমাদের সভ্যতার জীবন্ত ও জাগ্রত নিদর্শনসমূহকে পাঁচটি বড়ো ভাগে আমরা বিভাগ করতে পারি।
(১) বিশ্বাস ও ধর্ম
ইউরোপীয় সভ্যতার উপর ইসলামী সভ্যতার কিছু মৌলিক এবং গভীর প্রভাব পড়েছে যাকে অস্বীকার করা যাবে না। সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই প্রভাব সর্বত্র কার্যকর হয়েছে। ইসলাম এমন একটি ধর্ম যে ধর্ম মহান আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আল্লাহর একত্ববাদে এবং ক্ষমতা পরিচালনায় কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তায়ালা দেহধারী নন; কিন্তু তিনি জুলুম অত্যাচার থেকে মুক্ত। ইসলাম একথা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মানুষকে আল্লাহর বন্দেগী করার ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে এবং আল্লাহর আইন কানুন বোঝার ক্ষেত্রে পাদ্রীদের মতো কোনো শ্রেণীকে মাধ্যম করার প্রয়োজন নেই।
বিভিন্ন জাতির মানসিকতা বিকাশের ক্ষেত্রে এবং পথ নির্দেশের ক্ষেত্রেও ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর আগে বিভিন্ন জাতি শোষণ নির্যাতন এবং কতৃপক্ষীয় আধিপত্যবাদের শেকলে বাধা ছিলো। এই আধিপত্যবাদীরাই মানুষের চিন্তা চেতনা এবং মতামত প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছিলো। মানুষকে মানুষকে দৈহিকভাবে বন্দী করে রেখেছিলো এবং তাদের অর্থ সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিয়েছিলো। ইসলাম প্রাচ্যে এবং পাশ্চাত্যে যেসব বিজয় অর্জন করেছে তার ফলে আশেপাশের সকল জাতিই ইসলামের বিশ্বাস এবং আদর্শে কমবেশী প্রভাবিত হয়েছে। সপ্তম শতাব্দী ঈসায়ীতে ইউরোপে এমন কিছু সংখ্যক সংস্কারকের আবির্ভাব ঘটেছিলো যারা মূর্তিপূজা এবং চিত্রপূজার বিরোধী ছিলো। পরবর্তীকালে আরো কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটলো যারা আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে মানুষকে ওছিলা বা মাধ্যম হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করলো। তারা পাদ্রীদের মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি পবিত্র গন্থের শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলো। অনেক গবেষক দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করে বলেছেন, মার্টিন লুথার তার সংস্কার কাজে আরবীয় দর্শন এবং মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। দীর্ঘন যাতে ইসলামী পন্ডিতদের গ্রন্থসমূহ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। মার্টিন লুথারের সময়ে যেসব অনুবাদগ্রন্থ ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রীতিমতো পড়ানো হতো। ফরাসী বিপ্লবের সময়ে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার যে আন্দোলন হয়েছিলো এর ফলে চিন্তার রাজ্যে ব্যাপক একটা তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এই তোলপাড় তিনশত বছর যাবত অথবা এরচেয়ে অধিক সময় পর্যন্ত সমগ্র ইউরোপে ছেয়ে গিয়েছিলো। ক্রুসেড যুদ্ধ এবং স্পেনের মাধ্যমে আমাদের সভ্যতা এসব আন্দোলনের ওপর সুদূর প্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে।
(২) জ্ঞান ও দর্শন
চিকিৎসা, রসায়ন, প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদ বিদ্যা এবং মহাকাশ বিষয়ে আমাদের সভ্যতার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ইউরোপের জ্ঞানের ক্ষেত্রে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে সেটা ছিলো এই শিক্ষারই ফলশ্র“তি। ইউরোপের লোকেরা মুসলিম পন্ডিত দার্শনিকদের কাছ থেকে আলবনিয়া, কর্ডোভা এবং গ্রানাডার মাসজিদে এই শিক্ষা অর্জন করে। পাশ্চাত্যের শিক্ষার্থীরা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতো। সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য মুসলমানদের প্রতিষ্ঠানে জ্ঞানের দুয়ার থাকতো উন্মুক্ত। প্রত্যেকটি মানুষ গভীর নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে জ্ঞানার্জন করতো। এরকম কোনো দৃষ্টান্ত তাদের নিজেদের দেশে বিদ্যমান ছিলো না। মুসলিম পন্ডিতরা যেসময় পৃথিবীর আবর্তন, পৃথিবীর গোলাকৃতি এবং আকাশসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করতেন এবং মননশীল বিতর্কে লিপ্ত হতেন, সে সময় ইউরোপের অধিবাসীরা এসব বিষয়ে সামান্য চিন্তাভাবনাও করেনি। এখান থেকেই আরবী গ্রন্থাবলীর ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদের আন্দোলন শুরু হয়। আমাদের আলেমদের লেখা গ্রন্থ ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইবনে সিনার লেখা ‘আল কানুন’ গ্রন্থটি চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর লিখিত। দ্বাদশ শতাব্দী ঈসায়ীতে এই গ্রন্থটি অনুবাদ করা হয়। আল্লামা রাযীর লেখা ‘আল হাদী’ গ্রন্থের অনুবাদ করা হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। এই গ্রন্থ ইবনে সিনার লেখা গ্রন্থের চেয়ে আরো বেশী বিস্তৃত এবং নির্ভারযোগ্য। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চিকিৎসা বিষয়ে এ দু’টি গ্রন্থই পড়ানো হতো। দর্শন শাস্ত্রে আরো দীর্ঘকাল অধ্যয়ন চলতে থাকে। গ্রীক দর্শন ইউরোপ যে পরিচিতি অর্জন করেছে সেই পরিচিতি মুসলমানদের রচিত গ্রন্থের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে। এ কারণে পাশ্চাত্যের বহু সংখ্যক গ্রন্থকার একথা স্বীকার করেন যে, মধ্যযুগে কমপক্ষে ছয়শত বছর পর্যন্ত মুসলমানরাই ছিলো ইউরোপের শিক্ষক।
গুস্তাদ লীবান বলেন, সাধারণ আরবী গ্রন্থ বিশেষত জ্ঞান বিজ্ঞান সম্পর্কিত গ্রন্থাবলীর ওপর ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বলা যায় প্রায় পুরোটাই নির্ভরশীল ছিলো। আমরা বলতে পারি অনেক জ্ঞান যেমন চিকিৎসা শাস্ত্রে আরবদের প্রভাব এখনো আমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। ইবনে সিনার গ্রন্থাবলীর ব্যাখ্যা ভাষ্য বিগত শতাব্দীর শেষদিকে এসে রচিত হয়েছে। এ সম্পর্কে মুহালিয়া নামক একজন পন্ডিত লিখেছেন, রজার বেকন, লেনার্ড, আর নোফেলকুনি, রেমুন লোল, সানফেমা, আলবার্ট, আজনু নাশ, দাহাম তাশকালি শুধুমাত্র আরবী গ্রন্থাবলীর ওপর নির্ভর করতেন। মসিও রেনাল লিখেছেন, আলবার্ট দি গ্রেট ইবনে সিনার কাছে বিশেষ কৃতজ্ঞ। সানথুম দর্শনের ক্ষেত্রে ইবনে রুশদ-এর কাছে ঋণী। প্রখ্যাত প্রাচ্য বিদ্যা বিষয়ক পন্ডিত সিদিভো লিখেছেন, মধ্যযুগে একমাত্র আরবরাই ছিলো সভ্যতার পতাকাবাহক। উত্তরাঞ্চলীয় গোত্রসমূহ ইউরোপকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিলো। আরবরাই এদের বর্বরতা দূর করে দিতে সক্ষম হয়। আরবরা গ্রীসের প্রাচীন দর্শনে ব্যুৎপত্তি অর্জন করে। তারা এই দর্শনের বিস্তার ঘটায় এবং এসব বিষয়ে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে।
তিনি আরো লিখেছন, রসায়ন শাস্ত্রে আরবরা বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলো। এক্ষেত্রে তারা ছিলো সবার শিক্ষক। ল্যাটিন আমেরিকার অধিবাসীরা আরবদের কাছ থেকে যা কিছু অর্জন করেছিলো সে বিষয়ে অনুসন্ধান করে জানা যায়, হারবার্ট দ্বিতীয় ফালসাফা-এর নামে একটি দরোজা তৈরী হয়েছে সেই দরোজার মাধ্যমে ৯৭০ থেকে ৯৮০ ঈসায়ী সালের মাঝামাঝি সময়ে সকল প্রকার জ্ঞান ইউরোপে প্রবেশ করে। আলবার্ট দ্বিতীয় ফালসাফার স্পেনে এই জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। ইংরেজ পন্ডিত হিলার্ড একাদশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্পেন এবং মিসর সফর করেন। এ সময়ে তিনি আরবী ভাষা থেকে ‘একলিদাসের’ গ্রন্থ আল আরকান ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করেন। সমগ্র পাশ্চাত্য জগত এই গ্রন্থ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলো। দার্শনিক পন্ডিত প্লেটো থিউডিসিওসের গ্রন্থ আল আকর আরবী থেকে ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করেন। রুডলফ ক্রেজি বাতলিমুস এর ভূতত্ত্ব বিষয়ক আরবী গ্রন্থ ‘জিগ্রাফিয়া’ ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করেন। লিউনার্ড বৈরাজি দ্বাদশ ঈসায়ী সালে জ্যামিতির ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই রচনার বিষয় বস্তু তিনি আরবী থেকে গ্রহণ করেন। কম্বানুস নিউবি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আরবী ভষায় রচিত গ্রন্থ ‘একলিদাস’ চমৎকার ভাষায় অনুবাদ করেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতেই ফেস্তুলুন বুলুনি হাসান ইবনে হাইছামের গ্রন্থ ‘আল কাছিরা’ও পর্যালোচনা করে মহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞান পাশ্চাত্যজগতে প্রচার করেন। ১২৫০ ঈসায়ী সালে আজফুনাশ কাশকালি ‘ফালকি রীহ’ প্রকাশ করার আদেশ দেন। এই যুগে একদিকে প্রথম রাজার সাকলিয়া আরবী জ্ঞান বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়নের আদেশ দেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় ফ্রেডরিক জ্ঞান ও সাহিত্য শিক্ষার ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেন। ইবনে রুশদ-এর পুত্র সব সময় দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের দরবারে অবস্থান করতেন এবং উদ্ভিদ ও জীব বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন।
হিউমেন্ড বিজ্ঞান সম্পর্কে তার লেখা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আরবরাই প্রথমে রাসায়নিক পদ্ধতিতে ওষুধ তৈরীর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। এ সম্পর্কে পরামর্শ এবং অভিজ্ঞতা আমরা আরবদের কাছ থেকেই লাভ করেছি। পরবর্তীকালে এই অভিজ্ঞতাই ইউরোপে বিস্তার লাভ করে। উপরন্তু উদ্ভিদবিদ্যা এবং রসায়ন সম্পর্কে অধ্যয়নের সূচনাও আরবদের মাধ্যমেই ইউরোপে আসে। আরবদের মাধ্যমেই এই জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে আরবদের জ্ঞানের প্রশস্ততার প্রমাণের জন্যে এটাই যথেষ্ট যে, তারা গাছগাছড়ার এবং লতাপাতার মাধ্যমে ওষুধ তৈরীর জন্যে দুই হাজার উদ্ভিদ নিজেরা আবিষ্কার করেন। এসব উদ্ভিদের মধ্যে এমন বহু উদ্ভিদ ছিলো, গ্রীসের লোকেরা তখনো পর্যন্ত যে সম্পর্কে সামান্যতম ধারণাও করতে পারেনি। সিদিভো আল্লাহা রাজী এবং ইবনে সিনা সম্পর্কে লিখেছেন, এই দুইজন পন্ডিত-দার্শনিক তাদের লেখা গ্রন্থের মাধ্যমে ইউরোপের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে দীর্ঘকাল যাবত প্রভাব বিস্তার করে রাখেন। ইবনে সিনা ইউরোপে একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পুরো ছয়শত বছর যাবত ইউরোপের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার লেখা গ্রন্থাবলী পড়ানো হতো। তার লেখা গ্রন্থ ‘আল কানুন’ পাঁচখন্ডে অনুদিত হয়েছে। একাধিকবার এই গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়। ফ্রান্স এবং ইটালীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই গ্রন্থ পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিলো।untitled-2213466388_1756071501281077_2073791806686577968_n

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY