আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর উপর ঈমান

0
63

১) এই যে বিরাট বিশাল প্রকৃতি জগত, তার মধ্যে অসংখ্য সৌর জগত আছে। এ ধরনের আরো বহু জগত আছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপনাও আছে। এসব কত বিরাট বিশাল তা আমাদের কল্পনার অতীত। এসব সৃষ্টি হঠাৎ করে ঘটনাক্রমে অস্তিত্ব লাভ করেনি। বহু বছর যাবত বস্তুর স্বাভাবিক ক্রিয়ার ফলও এসব সৃষ্টি নয়। বরঞ্চ আল্লাহ তায়ালা তাঁর আপন হচ্ছায় ও নির্দেশে বিশেষ পরিকল্পনার ভিত্তিতে এসব সৃষ্টি করেছেন। তিনি এসবের প্রকৃত মালিক। তিনি তাঁর অসীম কুদরতে এসব কায়েম রেখেছেন এবং যতো দিন ইচ্ছা কায়েম রাখবেন।
২) প্রকৃতি রাজ্যের প্রতিটি বস্তুর স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা। এমন কোন কিছু নেই যা তাঁর দ্বারা সৃষ্টি না হয়ে আপনা অনপনিই অস্তিত্বে এসেছে। প্রতিটি বস্তুর অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব তাঁর উপর নির্ভরশীল। তিনিই সকলের প্রতিপালক। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে রা করেন এবং যাকে ইচ্ছা ধ্বংস করেন।
৩) তিনি অনাদি কাল থেকে আছেন এবং অনন্ত কাল পর্যন্ত থাকবেন। তিনি চির জীবিত ও চির শাশ্বত। তাঁর ধ্বংস নেই।
৪) তিনি এক ও একক। সকলেই তাঁর মুখাপেী। তিনি কারো মুখাপেী নন। তিনি সর্বশক্তিমান। কেউ তাঁর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না। তাঁর পিতা-মাতাও নেই, সন্তান-সন্তুতিও নেই। স্ত্রী, পুত্র পরিজন, ভাই, বেরাদার, জ্ঞাতি, গোষ্ঠী কিছুই নেই।
৫) তিনি সকল বিষয়ে লা-শরীক। তাঁর সত্তায় ও গুণাবলীতে অধিকার ও এখতিয়ারে কোনই শরীক বা অংশীদার নেই। তিনি আপনা আপনি অস্তিত্ববান। তাঁর অধিকার ও এখতিয়ারে, সত্তা ও গুণাবলীতে কারো সাহায্যের মুখাপেী তাঁকে হতে হয় না।
৬) কোন কিছুই তাঁর সাধ্যের অতীত নয়। এমন কোন বিষয়ের কল্পনা করা যেতে পারে না যা করতে তিনি অম। সকল প্রকারের বাধ্যবাধকতা, অমতা ও দোষ-ত্র“টির উর্ধে তিনি। তিনি সকল মঙ্গলের উৎস। যতো পবিত্র নাম ও উৎকৃষ্ট গুণাবলী তা সবই তাঁর জন্যে। নিদ্রা অথবা তন্দ্রা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। তিনি পাক পবিত্র এবং সকল দোষ-ত্র“টির উর্ধে।
৭) তিনি সমগ্র বিশ্ব প্রকৃতির একমাত্র বাদশাহ বা শাসক। সকল কর্তৃত্বের উৎস তিনি। বিশ্ব প্রকৃতিতে একমাত্র তাঁরই কর্তৃত্ব চলছে। তাঁর কর্তৃত্ব ও প্রভূত্ব প্রয়োগের ব্যাপারে তিনি কারো মুখাপেী নন। তিনি ব্যতীত কর্তৃত্ব প্রভুত্ব আর কারো হতে পারে না। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করারও কেউ নেই।
৮) তিনিই সকল শক্তির আসল উৎস ও কেন্দ্র। অন্য সকল শক্তি তাঁর কাছে নগণ্য। বিশ্ব প্রকৃতিতে এমন কিছু নেই যা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন পদপে করতে পারে অথবা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিঃশ্বাস ফেলতে পারে তা সে মানুষ হোক, ফেরশেতা অথবা জ্বিন হোক অথবা অন্য কোন শক্তিশালী সৃষ্টি হোক। প্রকৃতি রাজ্যের কোন বৃহত্তম গ্রহ অথবা দৃশ্য অদৃশ্য কোন শক্তি তার যতো বড়ো ও শক্তিশালী হোক তারা আল্লাহর অসীম কুদরত ও মতার কাছে কিছুমাত্র নয়।
৯) তিনি সর্বত্র সর্বদা বিরাজমান। তিনি সর্বদ্রষ্টা। প্রত্যেকটি বস্তু তিনি দেখতে পান-তা সে ভূগর্ভে হোক অথবা অসীম কাকাশের কোন স্থানে হোক। তিনি ভবিষ্যত সম্পর্কে অবহিত। মানুষের মনের কথা তার অন্তরের অন্তঃস্থলে লুকায়িত ভাবধারা ও আবেগ অনুভূতি এবং সকল প্রকার গোপন রহস্য তাঁর পুরোপুরি জানা। তিনি মানুষের কাঁধের শিরা-উপশিরা থেকেও নিকটে অবস্থান করেন। তিনি পূর্বাপর সকল বিষয়ের সুনিশ্চিত জ্ঞান রাখেন। গাছ থেকে এমন কোন পাতা পড়ে না যা তাঁর জ্ঞানের বাইরে অথবা ভূখন্ডে লুকায়িত এমন শস্যবীজ নেই যা তাঁর জানা নেই।
১০) জীবন মৃত্যু তাঁর হাতে। যাকে ইচ্ছা তাকে জীবন ও মৃত্যু দান করেন। যাকে তিনি মারমে চনন তাকে রা করার কেউ নেই এবং যাকে তিনি জীবিত রাখতে চান তাকে কেউ মারতে পারে না।
১১) সকল সম্পদের একচ্ছত্র মালিকানা তাঁর। এ সম্পদ থেকে যাকে তিনি বঞ্চিত করতে চান তাকে কেউ কিছু দিতে পারে না। যাকে তিনি দিতে চান, কেউ তা ঠেকাতে পারে না। কাউকে সন্তান দান করা না করা সম্পূর্ণ তার এখতিয়ারে। যাকে ইচ্ছা তাকে পুত্র সন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা তাকে কন্যা অথবা যাকে ইচ্ছা তাকে উভয়ই দেন। আবার যাকে ইচ্ছা তাকে উভয় থেকেই বঞ্চিত করেন। তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার কারো এতটুকু মতা নেই।
১২) লাভ-লোকসান একমাত্র তাঁর এখতিয়ারে। তিনি কাউকে তি অথবা বিপদের সম্মুখীন করতে চাইলে কেউ তা ঠেকাতে পারে না। আর যদি তিনি কারো মঙ্গল করতে চান, তাহলে কেউ তার কোন তি বা অমংগল করতে পারে না। মোট কথা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ কারো কোন মংগল-অমংগল করতে পারে না।
১৩) একমাত্র তিনিই সকলের রিজিকদাতা। রিজিকের চাবিকাঠি একমাত্র তাঁরই হাতে। তিনিই তাঁর যাবতীয় সৃষ্টি সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত। সকলকেই তিনি রুজি দান করেন। রুজি রোজগারের ব্যাপারে কমবেশী করাও তাঁর হাতে। যার জন্যে তিনি যতটুকু নির্ধারিত করে রেখেছেন, সে ততটুকুই ঠিক মতো পাবে। এর কমবেশী করার অধিকার কারো নেই।
১৪) তিনি অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। তিনি বিজ্ঞ ও সুস্থ বিচার সম্পন্ন। তিনি সঠিক সিদ্ধান্তকারী। তিনি কোন হকদারের হক নষ্ট করেন না এবং কারো উপর যুলুম করেন না। এ তাঁর ন্যায়-নীতির খেলাপ যে, সুকৃতিকারী এবং দুষ্কৃতিকারী তার নিকটে সমান হবে। প্রত্যেককে তার আপন আপন কৃতকর্ম অনুযায়ী তিনি প্রতিদান দেন। কোন অপরাধীকে তিনি তার অপরাধের অধিক শাস্তি দেন না এবং কোন নেক লোককে তার যথোপযুক্ত পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করেন না। তাঁর একটি সিদ্ধান্ত তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান সুস্থ বিচার-বুদ্ধি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে হয়ে থাকে।
১৫) তিনি তাঁর বান্দাহকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। তিনি গুনাহ মাফ করে দেন, তওবাকারীর তওবা কবুল করেন। তিনি তাঁর বান্দাহদের উপর সর্বদা রহমত বর্ষণ করে থাকেন। তাঁর রহমত ও মাগফিরাত থেকে মুমেনদের নিরাশ হওয়া উচিত নয়।
১৬) তিনিই একমাত্র সত্তা যাকে ভালোবাসা যেতে পারে। একমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। তাঁকে ব্যতীত আর কাউকে ভালোবাসতে হলে তাঁরই জন্যে ভালোবাসতে হবে, তাঁর ভালোবাসাই সকল ভালোবাসাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।
১৭) একমাত্র তিনিই আমাদের কৃতজ্ঞতা পাওয়ার হকদার। সকল এবাদত দাসত্ব ও আনুগত্য পাওয়ার অধিকার একমাত্র তাঁরই। তিনি ব্যতীত অপর কেউ না আনুগত্য লাভের অধিকারী হতে পারে আর না তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা যেতে পারে। একমাত্র তাঁর সামনেই সবিনয়ে দাঁড়ানো যেতে পারে। তাঁকেই সিজদা করা যেতে পারে। তাঁর কাছেই সব কিছু চাওয়া যেতে পারে। তাঁর কাছেই সবিনয়ে কাকুতি মিনতি করা যেতে পারে।
১৮) এ অধিকার একমাত্র তাঁর যে, মানুষ তাঁর আনুগত্য করবে। তাঁর আইন মেনে চলবে। নিরংকুশভাবে তাঁর নির্ধারিত শরীয়তের বিধান মেনে চলবে। হালাল হারাম নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র তাঁর। এ ব্যাপারে কারো কণামাত্রও অধিকার নেই।
১৯) একমাত্র তাঁকেই ভয় করতে হবে। তাঁর উপরেই আশা ভরসা রাখতে হবে। প্রতিটি ব্যাপারে সাহায্য তাঁর কাছেই চাইতে হবে। তাঁকেই বাসনা পূরণকারী, ত্রাণকর্তা, অভিভাবক ও সাহয্যদাতা মনে করতে হবে সকল ব্যাপারে নির্ভর তাঁর উপরেই করতে হবে।
২০) হেদায়েত তাঁর কাছেই চাইতে হবে। সুপথ দেখানো তাঁর কাজ। তিনি যাকে হোদয়েত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ সুপথে অননতে পারে না।
২১) কুফর, শিরক, নাস্তিকতা বিদআত প্রভৃতি ইহকাল ও পরকালের জন্যে ধ্বংস নিয়ে আসে। দুনিয়ার মধ্যে নিকৃষ্ট মানুষ তারাই যারা অল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তাঁর দ্বীন কবুল করে না, তাঁর সাথে অন্যকে অংশীদার বানায় এবং তাঁর আনুগত্য করার পরিবর্তে আপন প্রবৃত্তির অনুগত্য করে।
২২) কুফরী অবস্থায় যারা মৃত্যুবরণ করে তাদের উপর আল্লাহর লানৎ ফেরেশতাদের লানৎ এবং সমগ্র মানবজতির লানৎ।
২৩) কুফর ও শিরকের পরিণাম আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং তাঁর ফলে চিরন্ত শাস্তি ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে।
২৪) শিরক সুস্পষ্ট যুলুম ও মিথ্যা। অন্যান্য সকল গুনাহ আল্লহ মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু শিরকের গুনায় কিছুতেই মাফ করবেন না।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY