নাজাতপ্রাপ্ত যারা

0
110

হে আল্লাহ, তোমার শোকরিয়া আদায় করছি, তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। হে আল্লাহ, তুমি গুনাহ ক্ষমাকারী। হে আল্লাহ তুমি সকল প্রকার অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে আমাদের রক্ষা করুন। তুমি যাকে সোজা পথ দেখিয়ে দিবে তাকে কেউ এদিক ওদিক করতে পারবে না। আর যাকে তুমি তোমার পথ ভুলিয়ে দিবে তাকে কেউ পথ দেখাতে পারবে না। নিসন্দেহে তুমি ছাড়া কেউ এবাদত পাওয়ার উপযুক্ত নেই। প্রকৃত মাবুদ কেবল তুমিই। নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ (স.) তোমারই আবেদ, তোমার পয়গাম পৌঁছানেওয়ালা এবং তোমার সত্যিকার রসূল। এলাহী! তুমি তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করো এবং বেশী বেশী প্রেরণ করো।
প্রিয় নবী মোহাম্মদ (স.)-এর সাহাবী হযরত মোয়াবিয়া (রা.) বলেছেন, আমাদের এক সমাবেশে দাঁড়িয়ে রসূল (স.) আমাদের উদ্দেশে একটি খোতবা প্রদান করেন। যাতে তিনি বলেছেন, ‘হে লোকেরা! শোনো, তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাব ৭২ ফেরকায় বিভক্ত হয়ে গেছেন। আর আমার উম্মত তিহাত্তর (৭৩) ফেরকায় বিভক্ত হবে। যার মধ্যে ৭২ ফেরকা যাবে জাহান্নামে এবং এক ফেরকা যাবে জান্নাতে। আর জান্নাতী দল হলো জুমহুর মোসলমানদের জামায়াত। খুব শীঘ্রই আমার উম্মতের একটা গোষ্ঠীর মধ্যে যৌন লিপ্সা ব্যাপক বেড়ে যাবে। যেমন পাগলা কুকুর কামড় দিলে তার বিষ ওই ব্যক্তির রগ ও পায়ে ঢুকে যায়। যে পরিমাণ তার কামড়ে কেটেছে। ঐ অংশের বিষ পরে প্রতিটি হাড়ে এবং জোড়ায় জোড়ায় আক্রান্ত করে।
প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহর নবীর এই খোতবা এখন আপনাদের সামনে রয়েছে। আপনারা জানতে পারলেন যে, এই উম্মতের মধ্যেও দল বিদল এবং গ্রুপে ভাগ হবে। আর এটা এখন হয়েও গেছে। আজ মুসলমানরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত। মজার ব্যাপার হলো, প্রত্যেক গ্রুপই নিজের অধিকার ও অপরের অনাধিকার খুব ভালো করেই বুঝো। শোনো! এই বিষয়েও আমরা প্রিয় নবীজীর একখানা হাদীস শুনবো, ‘এক সাহাবী রসূল (স.)-এর বক্তব্য শুনে সে নিজেই সে ব্যাপারে রসূলকে জিজ্ঞেস করে হে রসূল! সেই সফল এবং জান্নাতী জামায়াত আর কোনটি? জবাবে রসূল (স.) বলেছেন, সত্যপন্থী এবং বেহেশতী জামায়াত তারা যারা ঐসব বিধানকে মেনে চলে। ঐ সব বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। যার ওপর আজ আমি এবং আমার সাহাবারা দাঁড়িয়ে আছেন।’
ঝগড়া বিবাদের কথা তো আরো আছে। তা না হয় জেদ, অহংকার, আমিত্বকে ছেড়ে খুব চিন্তা করো যে, আজকের দিনে এইসব গুণাবলী কোনো জামায়াতে দৃষ্টিগোচর হয়? ইমাম আবু হানীফা (র.) ৮০ হিজরীতে, ইমাম মালেক ৯০ হিজরীতে, ইমাম শাফি (র.) ১৫০ হিজরীতে, ইমাম আহমদ (র.) ১৬৪ হিজরীতে। যেন একশত বছর গুজারে যাচ্ছে কিন্তু ইসলামে ওইসব ইমামের মুখ দেখতে পেলো না। তবে তাদের অনুসারী হবে কোথা থেকে এবং হুজুর (স.) বলেছেন, জান্নাতী সেই জামায়াত যারা আমি ও আমার সাথী সাহাবারা যার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো তার ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে। এবার শুনুন, হুজুর (স.) এবং সাহাবারা ছিলেন সবাই আল্লাহ তায়ালার অহীর আমেল। সেই জিনিস যার ওপর রসূল ও সাহাবারা ছিলেন সেটা শুধুই আল্লাহর তায়ালার অহী। এর দুটি অংশ। এক অংশ হচ্ছে আল কোরআন অপর অংশ হচ্ছে হাদীসে রসূল।
সুতরাং আজকের এই এখতেলাফী যুগে অন্যৈক্য মতদ্বৈধতার যুগেও আমরা বলতে পারি বেহেশতী দল হচ্ছে জুমহুর মোসলমানদের জামায়াত। যাদের একমাত্র গ্রহণযোগ্য আমল ও বিশ্বাস হচ্ছে এই দুটি জিনিসে অর্থাৎ একমাত্র কোরআন ও হাদীসের ওপর। যারা দুটি জিনিসের মাঝে তৃতীয় কোনো জিনিসকে অন্তর্ভুক্ত করেছে তারা এই গুণাবলী থেকে বের হয়ে জাহান্নামী হয়ে গেছে। নাহকপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। তিরমিযী শরীফের এক হাদীসে এই মোবারক জামায়াতের আরও গুণাবলীও রয়েছে- অর্থাৎ এরা আমার সুন্নতের এসলাহ করবে যা অন্যরা বিগড়ে দিয়েছিলো।
এই জামায়াতে হুজুর (স.) থেকে কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে। এ সম্পর্কে হযরত মোয়াবিয়া (রা.)-এর একটি খোতবা পেশ করবো ইনশাআল্লাহ।
হযরত মোয়াবিয়া (রা.) মিম্বরে খোতবা দিতে গিয়ে বলেন, হে লোকেরা! তোমাদের আলেমরা কোথায়? আমি রসূল (স.) থেকে শুনেছি- কেয়ামত কায়েম হওয়া পর্যন্ত আমার উম্মতের একটি জামায়াত লোকদের ওপর বিজয় লাভ করবে। তারা তাদের বিরোধীদের কোনো ভয় করবে না, ভীত হয়ে থাকবে না, নিজেদের মোয়াফেক লোকদের সাহায্যের আকাংখীও থাকবে না। (ইবনে মাজা)
বোখারী মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, এই জামায়াত সব সময় সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এমনকি কেয়ামত এসে যাবে। সুতরাং এই গুণাবলী হুজুর (স.)-এর যমানা থেকে শুরু হয়ে আখেরী যমানা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এটাও অর্থাৎ এই দীর্ঘ সময় এই জামায়াতের জন্যে একটা বড়ো অনুকূল সহায়তা। কেননা রসূলের যমানায় তাকলীদী মাযহাবে কেউই ছিলো না। সাফ কথা, হকপন্থী জামায়াত, সকল গোষ্ঠী জান্নাতী দল তারা যারা এখতেলাফে উম্মতের সময়ে শুধু কোরআন ও হাদীসের ওপর থাকে এবং এই দুটিতেই আল্লাহর দ্বীনের শুরু ও শেষ মনে করে। এর মধ্যে রং বেরংয়ের কথার পক্ষপাতী নয়। বরং তারা প্রত্যেকটি বিষয়ে, প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডে সুন্নতে রসূলকে আঁকড়ে ধরে। এ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য অনুসরণের ইচ্ছা না করে হাদীস থেকে একচুলও নড়েনি। তাদের সম্পর্কে হুজুর (স.) বলেছেন-
অর্থাৎ ‘ফেতনা ফাসাদ ও অনৈক্য বিশৃংখলার সময়েও যারা আমার হাদীস ও সুন্নতকে আঁকড়ে ধরেছে। তাদের জন্যে এক নয় বরং একশ শহীদেরও পুরস্কার মিলবে।’ কেননা দুনিয়া তার শত্রু হয়ে যাবে। প্রত্যেকটা জামায়াত সে তার দিকে ডাকবে এবং এই কেরাআন ও হাদীসের সঙ্গ ছাড়বে না। সে জন্যে তাদের শত্র“র সংখ্যা বাড়তে থাকবে, কিন্তু আলহামদু লিল্লাহ সেটা তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে তাদের কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারবে না।

(২২) মূলতঃ ইসলামের মূল হচ্ছে দু’টি। একটি হচ্ছে কালাম অপরটি হচ্ছে তরীকা। এখানে কালাম মানে কালামুল্লাহ। যা সমস্ত কালামের সরদার। আর তরীকা মানে তরীকায়ে নবুবী। যা সমস্ত তরীকা থেকে উত্তম এবং ভালো। যাক, এই দুটি জিনিসের ওপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছ। এই দুটি জিনিসই আল্লাহর দ্বীনের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ কোরআন ও হাদীস।
শোনো, আমি তোমাদের পরিস্কার ভাষায় বলছি, নতুন কোনো কিছু থেকে দূরে থাকো। যে কাজ আমার দ্বীনের নতুন করে বের করবে সেটা দুনিয়ার সকল খারাপ কাজ থেকেও বেশী খারাপ কাজ। তোমরা তা থেকে দূরে থাকো। আমার পরিভাষায় এইসব কাজই বেদআত। আর সব বেদআতই গোমরাহী। দেখো, এমন যেন না হয় যে, যমানা চলে যাওয়ার সাথে তোমাদের অন্তর শক্ত হতে থাকে। শোনো, যা একান্ত হবার, তাকে দূরে মনে করো না। বরং খুব নিকটবর্তী মনে করো। নিজের মৃত্যুকে দূর মনে করা, কেয়ামতকে দূর মনে করা বরং তাকে তোমরা এসে গেলো বলে মনে করো। দূর তো কেবল সেই জিনিস যা অসম্ভব। দেখো খরাপ লোক তো সে যে পেট থেকেই খারাপ হয়ে জন্ম নেয়। আর ভালো মানুষ তো যে অন্যের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং অন্যদের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
মুসলমানরা! মনে রেখো, মোমেনদের হত্যা করা কুফরী, মোমেনদের গালি দেয়া ফাসেকী, তিনদিনের বেশী কোনো মুসলমানের সাথে কোনো ব্যাপারে দুনিয়াবী ঝগড়া ও মতানৈক্যের ওপর কথাবার্তা বন্ধ করা হারাম। মুসলমানরা! মিথ্যা থেকে নিজেকে রক্ষা করো, এমনকি হাসতে হাসতে মিথ্যা কথা বলো না। ঘটনাক্রমে মিথ্যা বলো না, ইচ্ছা করেও মিথ্যা বলো না, ঠাট্টাচ্ছলে মিথ্যা বলো না।
দেখো, আমি তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছি যে, নিজের কোনো সন্তানের সাথেও ওয়াদা করলে তা পরিপূর্ণ করবে, খবরদার কখনো খেলাফ করবে না। মিথ্যা মানুষকে পাপ ও অপরাধের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপ মানুষকে জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়। আর এইসব পাপ শেষ পর্যন্ত তাকে জাহান্নামী করে দেয়। এর বিপরীত সত্য বলা, নেকী, ভালো ও পরহেযগারীর দিকে পথ প্রদর্শন করে। আর এই নেক গুণাবলী তাকে জান্নাতী বানায়। সত্যবাদী দুনিয়া ও আল্লাহর দরবারে ও ভালো লোক বলা হয়। আর মিথ্যুককে দোযাহানেই মিথ্যুক আর গুনাহগার বলা হয়। দেখো মিথ্যা বলতে বলতে এক সময় আল্লাহর দরবারে মিথ্যুক হিসেবে তার নাম লিখে দেয়া হয়। এবং তার মিথ্যার ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে মিথ্যুকের সীলমোহর লেগে যায়।’
প্রিয় ভাইয়েরা আমার! এ খোতবা প্রিয় নবী (স.)-এর। আপনারা এইমাত্র শুনতে পেলেন। এ খোতবার কি একদম পরিস্কার নয়? ইসলামের আসল দুটি জিনিস- অর্থাৎ কোরআন ও হাদীস। সুতরাং তোমরা এ দু’য়ের মাঝে তৃতীয় কোনো কিছুর উদ্ভাবন করতে যেয়ো না। এটা বিশ্বাস করো যে ‘যুক্তি’ ইসলামে নেই। ইমামদের কারো একজনের বক্তব্যের অনুসরণ করা এই দু জিনিসের বাইরে তৃতীয় জিনিস। এটা যে ইসলামের আহকামের কথা বলা সরাসরি দ্বীনের ভিতরে অন্য কিছু প্রবেশ করানো। এ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো। এই অসিয়ত আমাদের সেই চার বুযর্গ ইমামদেরই। যাদের অনুসরণ আজকে করা হচ্ছে।
শোনো, হযরত ইমাম আহমদ (র.) বলেছেন- মুসলমানরা! আমার অনুসরণ করো না, ইমাম মালেক (র.)-এরও অনুসরণ করো না। আর অন্য কারো অনুসরণ করো না বরং ইসলামের আহকাম সেখান থেকে লও যেখান থেকে সেই বুযর্গরা নিয়েছেন- অর্থাৎ কোরআন ও হাদীস।
হযরত ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেছেন, যা সহীহ হাদীসে রয়েছে, সেটাই আমার মাযহাব। যখন আমার কোনো মাসয়ালা হাদীসের খেলাফ দেখো তখন তোমরা হাদীসের ওপরই আমল করো, আর আমার বক্তব্য দেয়ালে ছুঁড়ে মারো। হযরত ইমাম মালেক (র.) বলেছেন, মোহাম্মদ (স.) ছাড়া এমন কেউ নেই যে, তার সব কথাই আমল করার উপযোগী। হযরত আবু হানীফা (র.) বলেছেন- যে লোক আমার দলিল (কিতাব ও সুন্নত) জানা নেই সে কেবল আমার কথার ওপর ফতোয়া দেয়া জায়েয নেই। (শাহ ওয়ালিউল্লাহ (র.)-এর আকদুল জাইয়েদ দ্রষ্টব্য) সুতরাং চার ইমামের মাযহাবও এটাই ছিলো যে, প্রকৃত ইসলাম স্রেফ এই দুটি জিনিস। তার উপদেশও ছিলো এটাই। সেদিকেই আমি আপনাদের দাওয়াত দিচ্ছি যে, আপনারা কোরআন ও হাদীস ওয়ালা হয়ে যান। আল্লাহ আপনাদের সুমতি দান করুন। আমীন।
ভাইয়ে আমার! তখন তো অনুকরণ ও অনুসরণ (তাকলীদ) ছিলো না। যুক্তিও ছিলো না। আর আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন- ‘আজ আমি তোমাদের জন্যে দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম। সুতরাং সেই পরিপূর্ণ ধর্মের মাঝে তৃতীয় কোনো জিনিস প্রবেশ করেনি। কুরআন হাদীসকে পরিপূর্ণ মনে না করা আল্লাহর দেয়া বিধি-বিধানকে অস্বীকার করারই নামান্তর। সুতরাং আমি আজকের খোতবা রসূলে পাক (স.)-এর সেই সব বক্তব্য দিয়ে শেষ করছি-
সত্যিকার দ্বীন ধর্ম সেটিই যা কুরআন হাদীসে রয়েছে। তাতে তৃতীয় জিনিসের অস্তিত্ব নেই। হে আল্লাহ তায়ালা মোমেন নারী পুরুষদের ক্ষমা করুন এবং মুসলিম নারী পুরুষদেরও তুমি মাফ করো। হে আল্লাহ তায়ালা তাদের মনের মাঝে সস্পর্ক ও সৌহার্দ সম্পর্ক দান করো এবং তাদের মাঝে তুমি সংশোধন করে দাও। তোমার শত্রু ও তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তুমি তাদের সাহায্য করো। মুসলিম সৈনিকদের তুমি সাহায্য করো। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যেখানেই তারা রয়েছে। তাদেরকে তুমি উত্তম সাহায্য করো। তোমরা তোমাদের নামাযে প্রতিষ্ঠিত থাকো তাতে আল্লাহ তায়ালা দয়া করবেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY