মানুষের জন্যে ভালোবাসা

0
59

আমাদের অতুলনীয় সভ্যতা এবং এই সভ্যতার নিদর্শন সম্পর্কে কেউ যদি আলোচনা করতে চায়, তবে এই সভ্যতার একটি বিশেষ দিক থেকে তার চোখ ফেরানো সম্ভব নয়। যে ক্ষেত্রে এই সভ্যতা অন্য সব কয়টি সভ্যতার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এই বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে মানুষের জন্যে মানুষের ভালোবাসা। আমাদের সভ্যতা মানব জাতিকে ঘৃণা, বিবেধ বিচ্ছিন্নতা হিংসা জিঘাংসা থেকে মুক্ত করে মানুষকে ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং সাম্যের শিা দিয়েছে। ইসলামের আইন এবং ইসলামের সমাজনীতি অনুযায়ী বংশ, শ্রেণী বা জাতিগত শ্রেষ্টত্বের কোনো প্রশ্নই উঠে না। এই নীতি রয়েছে আমাদের সভ্যতার ভিত্তিমূলে এবং রয়েছে এর প্রতিটি অংশে বিস্তৃতভাবে বিদ্যমান।
ইসলাম ঘোষণা করেছে যে, সকল মানুষ একজন আদি মানুষ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। কোরআনের আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ, তোমরা তোমাদের মালিককে ভয় করো, যিনি তোমাদের একটি (মাত্র) ব্যক্তিসত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন, অতপর তিনি তা থেকে (তার) জুড়ি পয়দা করেছেন, (এরপর) তিনি তাদের (এই আদি জুড়ি) থেকে বহু সংখ্যক নর-নারী (দুনিয়ায় চারদিকে) ছড়িয়ে দিয়েছেন, (হে মানুষ), তোমরা ভয় করো আল্লাহ তায়ালাকে, যাঁর (পবিত্র) নামে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার (ও পাওনা) দাবী করো এবং সম্মান করো গর্ভ (ধারিনী মা)-কে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর তীব্র দৃষ্টি রেখে চলেছেন।’ (সূরা আন নেসা, আয়াত ১)
সকল বনী আদমের উৎপত্তিস্থল এক ও অভিন্ন। একই সৃষ্টির উৎসধারা থেকে মানুষকে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী এবং গোত্রে বিভক্ত করা হয়েছে। এর উদাহরণ হচ্ছে একই ঘরে একই মাতাপিতার ঔরশ ও গর্ভজাত একাধিক ভাই বোন। জন্মের সূত্র অভিন্ন হওয়ার কারণে এদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় এবং কল্যাণের পথে সহযোগিতা কাম্য। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘হে মানব সম্প্রদায়, আমি তোমাদের একটি পুরুষ ও একটি নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর আমি তোমাদের জন্যে জাতি ও গোত্র বানিয়েছি, যাতে করে (এর মাধ্যমে) তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো, কিন্তু আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে (আল্লাহ তায়ালাকে) বেশী ভয় করে, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সব কিছু জানেন এবং সবকিছুর (পুংখানুপুংখ) খবর রাখেন।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৩)
এরপর কিছু মানুষ সামনে এগিয়ে যায়, আবার কেউ কেউ পিছিয়েও থাকে। কেউ ধনী হয় কেউ হয় দরিদ্র পরমুখাপেী। কেউ হয় শাসক কেউ হয় শাসিত। কোনো জাতির গায়ের রং হয় সাদা কোনো জাতির রং হয় কালো। এটা হচ্ছে প্রকৃতির আইন এবং জীবনের এক অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থা। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, এভাবে উঁচু নীচু হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হবে এবং মানুষের সম্পর্ক এর ফলে প্রভাবিত হবে। ধনীদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই দরিদ্রের ওপর, শাসকের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই শাসিতের ওপর, শ্বেতাঙ্গদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই কৃষ্ণাঙ্গের ওপর। আদম সন্তান হিসেবে এবং মানুষ হিসেবে সবাই এক সমান। যদি কারো শ্রেষ্ঠত্ব থেকে থাকে তবে সে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণিত হবে শুধু তাকওয়ার ভিত্তিতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম যে ব্যক্তি অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। (সূরা আল হুজুরাত, আয়াত ১৩)
আইনের দৃষ্টিতে সকল মানুষ এক সমান। আইন সকলের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য। অধিকারের ভিত্তিতে কেবলমাত্র তাদের মধ্যে পার্থক্য করা যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতএব যে ব্যক্তি এক অণু পরিমাণ কোনো ভালো কাজ করবে (সেদিন) তাও সে দেখতে পাবে; (ঠিক তেমনি) কোনো মানুষ যদি অন্য অণু পরিমাণ খারাপ কাজও করে, তাও সে (তার চোখের সামনে) দেখতে পাবে।’ (সূরা যিলযাল, ৭-৮)
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এরা সবাই এক সমান। শক্তিমান দুর্বলদেরকে আশ্রয় দেয়। এমনি করে প্রতিটি মানুষ আরেকজন মানুষের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করে। হাদীসে রয়েছে রসূল (স.) বলেন, পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সহমর্মিতার ক্ষেত্রে মুসলমানদের উদাহরণ হচ্ছে একটি দেহের মতো। তার একটি অঙ্গ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন অন্য সকল অঙ্গও সে সংগে অসুন্থ হয়ে যায়। (মুসলিম, মোসনাদে আহমদ)
ইসলাম সব সময় ঘোষনা করেছে যে, মানুষ এক অবিভাজ্য সত্তা। মুসলমানরা যেন একই বিপাতামার সন্তান। মানব সমাজের উদাহরণ একটি বৃরে মতো। বাতাস প্রবাহিত হলে গাছের ওপরের শাখা নীচের শাখা সব শাখা একই সংগে দুলতে থাকে। কোরআনের বহু জায়গায় ‘হে মানুষ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। কখনো বলা হয়েছে হে বনী আদম। এ রকম সম্বোধনের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ যেন বুঝতে পারে যে, তারা এক ও অভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্টি হয়েছে। শুধু ইসলামের অনুসারীদের ‘তোমরা যারা ঈমান এনেছো’ অথবা ‘হে ঈমানদাররা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ত্র ক্ষেত্রে বংশগত বা শ্রেণীগত কোনো পার্থক্যই রাখা হয়নি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY