তাবলীগের কাজে কষ্ট শ্রম: প্রথম পর্যায়

0
120

গোপন দাওয়াতের তিন বছর
মক্কা ছিলো আরববাসীর দ্বীনী কেন্দ্র। এখানে কাবা ঘরের তত্ত্বাবধায়ক এবং সেসব দেবমূর্তির তত্ত্বাবধায়কও ছিলো, যাদের সমগ্র আরবের লোকেরা মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতো। এ কারণে কোনো দূরবর্তী স্থানের চেয়ে সংস্কার সংশোধন কার্যক্রম চালিয়ে লক্ষ্যে উপনীত হওয়া ছিলো অধিক কঠিন এবং কষ্টকর। এখানে এমন দৃঢ়চিত্ততার প্রয়োজন ছিলো, যাতে কোনো প্রকার দুঃখ কষ্ট এবং বিপদ বাধার ঝটকা স্বস্থান থেকে সরাতে না পারে । এ অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রজ্ঞা কর্মকুশলতার দাবী ছিলো,  প্রথম প্রথম দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ গোপনীয়ভাবে সম্পন্ন করা, যাতে মক্কাবাসীদের সামনে হঠাৎ কোনো অস্থির চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি এসে না পড়ে।
ইসলামের অগ্রপথিক
রসূল (স.) সর্বপ্রথম তাদেরই দ্বীনের দাওয়াত দেবেন, যাদের সাথে রয়েছে তাঁর গভীর সম্পর্ক, এটাই স্বাভাবিক। এসব মানুষ হলেন তাঁর পরিবার পরিজন ও বন্ধুবান্ধব। অতএব নবী করীম সাল–াল–াহু আলাইহি ওয়া সাল–াম প্রথমে তাঁর পরিবারের লোকজন এবং বন্ধু বান্ধবদেরই ইসলামের দাওয়াত দেন। অনুরূপ চেনা পরিচিত লোকদের মধ্যে তাদেরই তিনি শুরুতে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, যাদের চেহারায় তিনি কল্যাণ মথলের ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন এবং জানতে পেরেছিলেন, তারা সত্য এবং কল্যাণ মংগলকে পছন্দ করে, তাঁর সত্যবাদিতা ও পুণ্যকর্মশীলতা সম্পর্কে অবগত।
অতপর তিনি যাদের ইসলামের দাওয়াত দেন, তাদের মধ্য থেকে এমন এক দল মানুষ তাঁর দাওয়াত কবুল করেন, যাদের মনে কখনোই রসূল (স.)-এর সন্তান মর্যাদা, সততা, সত্যবাদিতা সম্পর্কে কোন প্রকার সন্দেহ জাগেনি। ইসলামের ইতিহাসে এরা ‘সাবেকীনে আউয়ালীন’- প্রথম অগ্রবর্তী দল নামে প্রসিী। তাদের মধ্যে শীর্ষ তালিকায় রয়েছেন রসূলের সহধর্মিনী উম্মেল মোমেনীন খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদ, তাঁর মুক্ত করা ক্রীতদাস যায়দ ইবনে সাবেত ইবনে শোরাহবিল কালবী,১ তাঁর চাচাতো ভাই হযরত আলী ইবনে আবু তালেব, যিনি ছিলেন সে সময় তাঁর পরিবারে প্রতিপালিত বালক এবং  হিজরতকালে তাঁর ূহার সাথী ঘনিষ্ঠ সুহৃদ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তারা সবাই প্রথম দিনেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) প্রচারে আত্ননিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন সর্বজনপ্রিয়, নরম মেজায, উত্তম চরিত্র এবং উদার মনের মানুষ। মানবীয় সেথজন্য, দূরদর্শিতা, ব্যবসায় বাণিজ্য এবং চমৎকার ব্যবহারের কারণে সব সময় তাঁর কাছে মানুষ যাওয়া আসা করতো। এ সময় তিরি তাঁর কাছে যাতায়াতকারী লোকদের মধ্যে যাদের বিশ।স্ত ও নির্ভরযোগ্য পেয়েছেন তাদের দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তার চেষ্টায় হযরত ওসমান (রা.), হযরত যোবায়র (রা.), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.), হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.), হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল–াহ (রা.) প্রমুখ ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা ছিলেন ইমামদের অগ্রবর্তী দল।
হযরত বেলাল হাবশী (রা.)ও প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন ছিলেন। তার পরে উম্মতের আমীন (আমানতদার) খ্যাত হযরত আবু ওবায়দা আমের ইবনে জাররাহ, আবু সালামা ইবনে আবদুল আছাদ, আরকাম ইবনে আবুল আরকাম, ওসমান ইবনে মাযউন এবং তাঁর দুই ভাই কোদামা ও আবদুল–াহ, ওবায়দা ইবনে হারেস, মোত্তালেব ইবনে আবদে মানাফ, সাঈদ ইবনে যায়দ এবং তাঁর স্ত্রী ওমরের বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব, খাব্বাব ইবনে আরাত, আবদুল–াহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং অন্য কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা সামগ্রিকভাবে কোরায়শ বংশের বিভিন্ন শাখার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। ইবনে হেশাম তাদের সংখ্যা চল্লিশের বেশি বলেছেন। (দেখুন, ইবনে হেশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৪৫-২৬২)।
তাদের কয়েকজনকেও ‘সাবেকীনে আউয়ালীনের’ অন্তরভূক্ত করা হয়।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, উলি–খিত ভাগ্যবানদের ইসলাম গ্রহণের পর দলে দলে লোক ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। মক্কার সর্বত্র ইসলামের আলোচনা চলতে থাকে এবং দিন দিন ব্যাপকতা লাভ করে।৩ তারা গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। নবী করীম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাদের ইসলাম শিক্ষা এবং পথনির্দেশ দেয়ার জন্যে গোপনে গোপনে দেখা করতেন। কেননা তাবলীগের কাজ তখনো ব্য৩ি পর্যায়ে গোপনে চলছিলো। সূরা মোদদাসসের-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল হওয়ার পর ঘন ঘন ওহী নাযিল হতে থাকে। এ সময় ছোটো ছোটো আয়াত নাযিল হচ্ছিলো। আয়াতূলো প্রায় একই ধরনের আকর্ষণীয় শব্দে শেষ হতো। এসব আয়াতে থাকতো স্বস্তি শাথি—দায়ক চিত্তাকর্ষক গীতিময়তা। যা শান্তি ও স্বস্তিপূর্ণ কোমল পরিবেশ অনুযায়ী হতো। এসব আয়াতে তাযকিয়ায়ে নফস (আÍশুীি)-এর সেথন্দর্য, কল্যাণ মংগল এবং দুনিয়ার মায়াজালে জড়িয়ে যাওয়ার কুফল সম্পর্কে আলোকপাত করা হতো এবং আয়াতে জান্নাত জাহান্নামের চিত্র এমনভাবে অংকন করা হতো, যেন তা চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে। এ সকল আয়াত ঈমানদারদের সমকালীন মানব সমাজ থেকে আলাদা ভিন্ন এক পরিবেশে পরিভ্রমণ করতো।
নামাযের আদেশ
প্রথমে যা কিছু নাযিল হয় তাতে নামাযের আদেশও ছিলো। মোকাতেল ইবনে সোলায়মান বলেন, ইসলামের শুরুতে আল–াহ তায়ালা সকালে দু’রাকাত এবং সন্ধ্যায় দু’রাকাত নামায ফরয করেছিলেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সকাল সন্ধ্যায় তুমি প্রশংসার সাথে তোমার প্রতিপালকের তাসবীহ পাঠ করো।’
ইবনে হাজার (রা.) বলেন, রসূল (স.) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম মে’রাজের আগে থেকেই নামায আদায় করতেন। তবে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, পাঁচ ওয়া৩ নামাযের আগে অন্য কোনো নামায ফরয ছিলো কিনা। কেউ কেউ বলেন, সূর্য উদয় হওয়ার এবং অস্ত যাওয়ার আগে এক এক নামায ফরয ছিলো।
হারেস ইবনে ওসামা (রা.) ইবনে লাহিয়ার সূত্রে অবিচ্ছিন্নভাবে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) থেকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন, রসূল (স.)-এর কাছে যখন প্রথম ওহী আসে, তখন জিবরাঈল এসে তাঁকে ওযুর নিয়ম শিক্ষা দেন। ওযু শেষ করার পর তিনি এক আঁজলা পানি নিয়ে লথাস্থানে ছিটিয়ে দেন। ইবনে মাজাও এ অর্থবোধক হাদীস বর্ণনা করেছেন। বারা’ ইবনে আযেব এবং ইবনে আব্বাস (রা.) থেকেও এ ধরনের হাদীস বর্ণিত রয়েছে। ইবনে আব্বাসের হাদীসে এও বর্ণিত রয়েছে, এ নামায ছিলো প্রথম দিকের ফরযসমূহের অন্তর্ভুক্ত।
ইবনে হেশাম বর্ণনা করেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম নামাযের সময় পাহাড়ে চলে যেতেন এবং গোপনে নামায আদায় করতেন। একবার আবু তালেব রসূল সাল্লল–াহু আলাইহি ওয়া সাল–াম এবং হযরত আলী (রা.)-কে নামায আদায় করতে দেখে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। নামাযের মূলতত্ত্ব জানার পর তিনি বলেন, এ অভ্যাস অব্যাহত রেখো।
কোরায়শদের ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি অবগতি লাভ
বিভিন্ন ঘটনা থেকে বুঝা যায়, এ সময় তাবলীগের কাজ যদিও ব্য৩ি পর্যায়ে গোপনভাবে করা হচ্ছিলো, কিন্তু কোরায়শরা বিষয়টা জানতে পারছিলো। তবে তারা একে কোনো গুরুত্ব দেয়নি।
মোহাম্মদ গাযালী লেখেন, কোরায়শরা গোপনে ইসলাম প্রচারের খবর পেয়েছিলো, কিন্তু তারা এর প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়নি। সম্ভবত তারা মোহাম্মদ সাল–াল–াহু আলাইহি ওয়া সাল–ামকেও এমন কোন ধর্মীয় ব্য৩িত্ব মনে করেছিলো, যিনি ইলাহ এবং ইলাহের অধিকার সম্পর্কে  কথাবার্তা বলেন। আরব সমাজে আগেও এ ধরনের লোক ছিলো। যেমন, উমাইয়া ইবনে আবুস সালত, কুস ইবনে সা’য়েদাহ, আমর ইবনে নোফায়ল প্রমুখ। তবে কোরায়শরা তাঁর প্রচারিত ইসলামের প্রসার এবং প্রভাব বৃীিতে কিছুটা শংকা অবশ্যই অনুভব করেছিলো। তাই সময় অতিক্রাথ— হওয়ার সাথে সাথে তাদের দৃষ্টি রসূল (স.) এবং তাঁর তাবলীগের ওপর নিবী থেকে ছিলো।৬
তিন বছর যাবত তাবলীগের কাজ ব্য৩িগত পর্যায়ে গোপনভাবে চলতে থাকে। এ সময় ঈমানদারদের একটি দল তৈরী হয়, যে দল ভ্রাতৃত্ব এবং সহায়তার ওপর কায়েম ছিলো। তারা আল–াহর পয়গাম পেঁথছাচ্ছিলো এবং এ পয়গাম তার যথার্থ অবস্থানে উন্নীত করার চেষ্টা করছিলো। এরপর ওহী নাযিল হয় এবং রসূল (স.)-এর প্রতি তাঁর গোত্রকে প্রকাশ্যে দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দেয়ার, বাতিল শ৩ির সাথে সংঘাত এবং তাদের পূজ্য মূর্তিূলোর বাস্তব দিকূলো তুলে ধরার নির্দেশ দেয়া হয়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY