নারী জাতির বর্তমান দুরবস্থা ও অধপতন

0
84

যেহেতু আমাদের আলোচনা সম্পূর্ণত নারীদের নিয়ে, তাই নারী জাতির বর্তমান দূরবস্থা ও তাদের সার্বিক অধপতন সম্পর্কেই আমরা আমাদের বর্তমান আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। সমাজের নারীদের বর্তমান দুঃখজনক দূরবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধারণা না থাকলে আমাদের পে এ মহাপ্লাবনের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
এ কথাটি আমরা সবাই বলি যে, সমাজে নারীদের আগের মতো এখন আর তেমন মূল্য ও মর্যাদা নেই। একদিন যে নারীকে মানুষ মায়ের জাত বলে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতো, এখন তাদের তারা পণ্যদ্রব্যের মতো একটি সাধারণ বাজারী বস্তুর মতোই মনে করে। এ কথাটাকে যদি সত্য বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে জিজ্ঞেস করতে হয় এর জন্যে কারা দায়ী।
এ কথা সত্য যে, আমাদের বস্তুনির্ভর এ সমাজে নারীত্বের মর্যাদা অনেকেই দিতে জানে না। পুরুষদের চোখে আজ কাল আর নারীরা মায়ের জাত নয়, এখন তারা নিতান্ত ভোগের সামগ্রী মাত্র। ভোগের সামগ্রীকে প্রয়োজন অনুযায়ী সে কখনো কাছে টেনে নেয়, আবার সে প্রয়োজন ফুরালে কলার খোসার মতো তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কোনো সমাজের চিত্র যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে, সে সমাজে নারীত্বের কোনো কল্যাণই সম্ভব নয়।
কিন্তু এ জন্য কি শুধু পুরুষরাই দায়ী? আমি তো মনে করি আমাদের এ অবস্থার জন্যে আমাদেরই এক শ্রেণীর যুবতীদের উশৃংখলতা ও বেহায়াপনাই বেশী দায়ী। সমাজের নৈতিক অবয়ের জন্যে আজ এসব নারীরূপী শয়তানরাই যে মূখ্যত দায়ী- নারী হয়েও আমাকে তা স্বীকার করতে হবে।
আগে মেয়েদের সবাই সম্মান করতো এখন আর করে না, কিন্তু এমনটি হলো কেন? সম্মানের এই উঁচু মর্যাদা থেকে তারা কি নিজেরাই নেমেছে না অন্য কেউ তাদের নামিয়ে দিয়েছে?
তখন আমরা ঢাকায় থাকি। এক বান্ধবী একদিন তার বাস জার্নির অভিজ্ঞতা বললেন-
‘এই তো সেদিনের কথা। আমি বাসে উঠছিলাম। ভীষণ ভীড়। আমি দ্বিধাগ্রস্থ, ভাবছিলাম, উঠবো কি উঠবো না। মাত্র মাইল দুয়েক পথ অথচ ট্যাক্সীতে উঠতে হলে অনেকগুলো টাকা চলে যাবে। শেষ পর্যন্ত আর্থিক দিকটা চিন্তা করে আমাকে বাসেই উঠতে হলো। আমরা উঠবার পর বাসের অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়ালো যে একজন যাত্রী ঘাড় ফিরাতে গেলে আরেক জনের মাথায় ধাক্কা লাগে। চাপাচাপি করে কোনো রকমে আমরা ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসলাম। বাস ছাড়বে, ঠিক সেই মুহূর্তে এক তরুণী হন্তদন্ত হয়ে ওঠে- দু’হাতে পুরুষদের ঠেলে মহিলা সিটের কাছে আসতে চাইলে অত্যন্ত ভীড়ে একটা ছেলের হাতের ধাক্কা লাগলো তার গায়ে। এই নিয়ে বচসা বাঁধলো, সে কী ভীষণ ঝগড়া। তখন আমি ফিরে তাকালাম। তরুণীর নিটোল স্বাস্থ্য, সুন্দর গায়ের রং, দামী শাড়ী পরনে, সংপ্তি কোর্সের ব্লাউজ, চোখে গগলস ঝুলছে, নানান সরঞ্জামে আটকানো মাথার খোঁপা, সর্বাঙ্গে উৎকট প্রসাধনের গন্ধ। হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ। মেয়েটা পুরুষের মত ভঙ্গিতে একজন যাত্রীর দিকে তাকিয়ে বলছিলো, ‘মেয়েদের সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয় জানা না থাকলে বাড়ী গিয়ে শাড়ী পরুন।’ ছেলেটা নেহায়েত রসিকতার সুরে জবাব দিলো, ‘শাড়ীর আজ-কাল বেজায় দাম ম্যাডাম, দয়া করে আপনার পরনের শাড়ীটাই …।’
মেয়েটা হঠাৎ প্তি হয়ে বললো, ‘সাবধান হয়ে কথা বলবেন, পায়ে স্যান্ডেল আছে।’ ছেলেটা সে ভাবেই রসোচ্ছলে বললো, ‘পায়ে আমারও জুতো আছে অবশ্য নতুন নয় এবং কিছুটা ছেঁড়াও। মেয়েটা চেচিয়ে উঠলো, অসভ্য, নচ্ছার, বে-শরম, লোকটা আমাকে এভাবে অপমান করবে আর আপনারা সবাই হা করে তাকিয়ে থাকবেন! আপনাদের কি কারো মা-বোন নেই?’
ছেলেটার পাশে দাঁড়ানো একজন প্রৌঢ় গোছের ভদ্রলোক এবার মুখ খুললেন। তিনি যা বললেন তার সার কথা হচ্ছে, মা-বোন কেন থাকবে না, অবশ্যই আছে, কিন্তু তারা তো ম্যাডাম আপনার মতো নন। আপনাদের মতো এই এক শ্রেণীর উগ্র আধুনিকারাই হাজার হাজার যুবককে পথভ্রষ্ট করছে, শত শত পরিবারে কলহ আর অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আমাদের অধপতনের মূলে তো আপনারাই। আপনার শরীরে ওর হাতের ধাক্কা লেগেছে বলে আপনি তার গায়ে স্যান্ডল ব্যাহারের ঘোষণা পর্যন্ত করলেন। আপনার সম্মান জ্ঞান যদি এতোই টনটনে হয়ে থাকে তাহলে কেন উঠলেন এই ভীড়ের মধ্যে? পয়সার আপনার অভাব আছে অবস্থা দেখে তা তো মনে হয় না। মা বোনের কথা তো বললেন, আমাদের মা বোন এভাবে যেখানে সেখানে যেভাবে সেভাবে নেচে বেড়ায় না। এই প্রচন্ড ভীড় ঠেলে এতগুলো পুরুষের ছোঁয়া শরীরে লাগিয়ে উঠতে পারলেন, আর এই ছেলেটার হাত লাগাতেই সবটা মহাভারত আপনার অশুদ্ধ হয়ে গেলো! মেয়েটা মাঝে মাঝে প্রতিবাদ করে উঠছিলো; কিন্তু ভদ্রলোক থামেননি একটানা সব কথা বলে তারপর থামলেন। কিন্তু অন্য একজন ভদ্রলোকও সাথে মন্তব্য করলেন, ‘আগে মেয়েদের দেখলেই পুরুষ যাত্রীরা সরে স্থান করে দিতো, এখন মেয়েদের ইজ্জত মেয়েরাই তুলে নিয়েছে।’
মেয়েটা প্রবল প্রতিবাদ করে উঠতেই চারদিকের লোকেরা ব্যাপারটায় হস্তপে করে থামিয়ে দিতে চাইলো; কিন্তু ব্যাপারটা তখনও বেড়েই চলছিলো। আমি অবশ্য ওদিকে আর মন দিতে পারলাম না, নাকে একটা উৎকট গন্ধ অনুভূত হলো, দেখলাম ড্রাইভারের ঠোঁটে সিগারেট। বাসে উঠবার সময় বাসের এক পাশে লেখা দেখেছিলাম ‘ধুমপান নিষেধ’।
ড্রাইভারের মুখ নিঃসৃত একগাল ধোয়া কুন্ডুলি পাকাতে পাকাতে আমার নাকে এসে লাগলো। ওদের বচসা সমান গতিতে তখনও চলছিলো। গন্তব্যস্থল এসে পড়ায় আমি নেমে গেলাম, তখনো মেয়েটা তাদের সাথে তর্ক করে যাচ্ছিল। সমস্ত ঘটনাটা চিন্তা করে আমি মনে মনে কাকে সমর্থন করবো তা নির্ণয় করতে পারলাম না। বার বার ভদ্রলোকের একটা কথাই মানসপটে ভেসে উঠলো, ‘যুবকদের নৈতিক অধপতনের মূলে তো আপনারাই’।
বান্ধবী তার এক ট্রেন জার্নির কথাও বললেন, তিনি এভাবে বললেন- আরামে যাবো ভেবে সেকেন্ড কাশের টিকিট করেছিলাম, কিন্তু বৃথা আশা। উঠে দেখলাম সব থার্ড কাশের বিনা টিকিটের যাত্রীতে বগী ভর্তি। কোনোমতে একটু জায়গা করে বসলাম। এ সময় একজন কেতাদুরস্ত অত্যাধুনিক মহিলা (সংপ্তি পোশাকে অবশ্য) এসে কর্নারে বসা একজন ভদ্রলোককে উঠতে বললেন। ভদ্রলোক নিশ্চুপ রইলেন। মহিলাটি কয়েকবার ভদ্রলোককে উঠতে বললেন, মহিলার সাথী ছোকড়াটিও বললো, ভদ্রলোক উঠলেন না। এবার মহিলাটি বিরক্তির সংগে সাথের ছোকড়াটাকে উদ্দেশ্য করেই বললোঃ ‘বলো না উনাকে উঠতে। উনি তো মনে হয় লাট সাহেব। বিরাট সম্পত্তির মালিক উনি, সম্পত্তি ছাড়বেন কেন! ছোট লোক! নিশ্চয়ই মা বোন নেই, থাকলে মেয়েদের সম্মান করতে জানতো। ছিঃ ছিঃ কি অসামাজিক মানুষ!’
ভদ্রলোক এবার বললেন, আপনারা মেয়ে নাকি! আপনারা তো পুরুষের চেয়েও শক্তিশালী। নারীত্বের শালীনতা যেসব মেয়েদের মধ্যে আছে তাদের সবাই সম্মান করে’। এরপর উভয় পরে আরো অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। শেষ তক থেমেছে বচসা। ট্রেন তখনো ছাড়েনি। ন’টার গাড়ী তো এখানে ন’টায় এমন কি সাড়ে দশটায়ও ছাড়ে না। এ সময় আরেকজন মহিলা ট্রেনে উঠলেন। ভদ্রমহিলা বোরখা পরিহিতা। আগের মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সম্ভবত বোরখাধারী মহিলাও দাঁড়িয়ে রইলেন। তার সঙ্গী ভদ্রলোকটিও এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপ করে রইলেন। এ সময় সেই কর্নারের ভদ্রলোকটি নিজে উঠে মহিলাটিকে বসতে দিলেন। আগের মহিলা কটমট করে তখনও দাঁতে দাঁত পিষছিলো।
বান্ধবীর পরপর এ দুটো জার্নির অভিজ্ঞতা শুনে আমি শুধু ভাবছিলাম, সত্যিই দিনে দিনে মেয়েদের বেহায়াপনা মারাত্নক পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছে। নতুন ভূষণে, নতুন ফ্যাশনে, নতুন আবরণে মেয়েরা নিজেদের আবিষ্কার করছে। প্রতিদানে তারা হারাচ্ছে তাদের মান সম্মান, শ্রদ্ধা, পাচ্ছে অসম্মান, অপমান ও নানা প্রকার অবহেলা।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ জাতীয় মহিলাগুলো আমাদের সমাজে আসলো কোত্থেকে? নিশ্চয়ই এরা আকাশ থেকে তৈরী হয়ে আসেনি। ওরা কোনো বাপ মায়েরই সন্তান। বাপ-মায়ের আদর্শ ও শিানুযায়ীই হয়তো ওরা বড় হয়েছে। বাপ-মায়ের নিয়ন্ত্রণ বা শাসন থাকলে তারা এই নারকীয় আদর্শে গড়ে উঠতো না। এক ধরনের উচ্ছৃংখল মহিলাদের কারণেই আমাদের সমাজ চরিত্র আজ ধ্বংস প্রায়। আজ সমাজকে সংশোধন করতে হলে একদিকে যেমন যুব গোষ্ঠীকে অন্যায় অনাচার থেকে রা করে ইসলামের আলোকোজ্জ্বল পরিমন্ডলে আনতে হবে-তেমনি এসব উচ্ছৃংখল ও বেহায়া নারীদেরও সঠিক পথে আনা প্রয়োজন। এসব নারীদেরকে তাদের কার্যকলাপ অবাধে চালাতে দিলে সমাজ সংশোধনের যাবতীয় কর্মসূচীই ব্যর্থ হবে। একান্ত প্রয়োজন এদের অবাধ চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা। নারীর সংযত আচরণের ওপর যুব চরিত্র বহুলাংশে নির্ভরশীল এ কথাটা সবারই বুঝতে হবে। এসব ‘আলট্রা মডার্ন মেয়ে’রা সমাজে কি বিষ ছড়াচ্ছে, কতো অঘটনের জন্ম দিচ্ছে-তা আজকাল কম বেশী সবাই জানেন।
হত্যা, হত্যা, হত্যা। হত্যার যেন আর শেষ নেই। এই হত্যা, সেই হত্যা, ওই হত্যা, অমুক হত্যা, তমুক হত্যা- এ যেন হত্যার যুগ শুরু হয়েছে। আর নারী হত্যার খবর হলে কাগজও চলে ভালো। আজ মুনীরা হত্যা, কাল শিউলী হত্যা, পরশু রুবিনা হত্যা, নীহার হত্যা, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের লোমহর্ষক ছাত্র হত্যা। এ যেন আসলেই হত্যার তান্ডব। কোনো নিপুন পরিচালকের নির্দেশনায় যেন একের পর এক হত্যাকান্ডগুলো পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু কেন? কেন এমন হচ্ছে? কেন রুবিনা মরেছে, মুনিরা মরেছে, কেন শিউলী মরেছে? কেনই বা নীহার মরেছে। এসব মৃত্যুর জন্যে কে দায়ী? এদের মৃত্যুর রহস্যটা আসলে কী? পুলিশ কি এর কোনো সুরাহা করতে পেরেছে? না পারেনি। পারবে কি করে? পাশ্চাত্য সভ্যতার বিষে যখন ওদের সারা দেহ বিষাক্ত হয়ে পড়েছিলো তখন পতন ছাড়া যে ওদের কোনো গত্যন্তর ছিলো না।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY