হযরত হাতেম আসাম্মের তেত্রিশ বছরে আটটি মাসয়ালা শেখা

0
38

একদিন হযরত শাকীক বলখী (র.) তার ছাত্র হাতেম আসাম্ম (র.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কতো বছর ধরে আমার সাহচর্যে রয়েছো? তিনি বললেন, তেত্রিশ বছর। হযরত শাকীক বলখী (র.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দীর্ঘ সময়ে তুমি আমার কাছ থেকে কি শিখেছো?
হাতেম আসাম্ম (র.) বললেন, আপনার সাহচর্যে তেত্রিশ বছর পর্যন্ত অবস্থান করে আমি আটটি মাসয়ালা শিা করেছি। তার উত্তরে শকীক বলখী (র.) বললেন, ইন্না লিল্লাহ  … তোমাকে নিয়ে আমার সময়ই নষ্ট হলো শুধু। এ দীর্ঘ সময়ে তুমি শুধু আটটি মাসয়ালা শিা করেছো। হাতেম বললেন, মাননীয় ওস্তাদ, আমি আটটি মাসয়ালার বেশী শিখিনি। আর মিথ্যা বলা আমি অপছন্দ করি। এবার শকীক বলখী (র.) বললেন, ঠিক আছে, তুমি এ দীর্ঘ সময়ে যে আটটি মাসয়ালা শিখেছো তার বর্ণনা দাও তো, আমি শুনি। হযরত আসাম্ম (র.) নিুরূপে তাঁর শেখা আটটি মাসয়ালার বর্ণনা দেন।
মাসয়ালা : ১. আমি মানুষকে দেখে অনুধাবন করেছি, প্রত্যেক মানুষেরই পছন্দনীয় একটা কিছু থাকে, যা কবর পর্যন্তই তার সাথে থাকে। যখন সে কবরে যায়, তখন পছন্দনীয় বস্তু তার থেকে পৃথক হয়ে যায়। তাই আমি পুণ্য কর্মকেই আমার পছন্দনীয় সাব্যস্ত করেছি। যখন আমি কবরে যাবো তখন আমার প্রিয় পছন্দনীয় বস্তুও আমার সাথে থাকবে।
হযরত শকীক বলখী (র.) বললেন, তুমি অত্যন্ত উত্তম মাসয়ালা শিখেছো। এবার অবশিষ্ট সাতটির বর্ণনা দাও।
মাসয়ালা : ২. যে ব্যক্তি নিজের রবের সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং স্বীয় আত্নাকে কামনা বাসনা থেকে নিবৃত্ত রেখেছে- আমি এ আয়াত সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে আমি হৃদয়ঙ্গম করতে সম হয়েছি, আল্লাহর কথাটাই সঠিক। তাই প্রবৃত্তির কামনা বাসনা দূর করার জন্যে আত্নার ওপর কিছু পরিশ্রম চাপিয়েছি। অবশেষে তা আল্লাহর আনুগত্যে স্থির হয়ে গেছে।
মাসয়ালা : ৩. আমি এ দুনিয়াকে নিরীণ করেছি। এতে দেখতে পেলাম, কারো মূল্যবান কোনো বস্তু সামগ্রী থাকলে সে তা উঠিয়ে রাখে এবং যথাযথ সংরণ করে। অতপর যখন দেখলাম, আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করছেন-
‘তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তা সবই নি:শেষ হয়ে যাবে এবং যা আল্লাহর কাছে রয়েছে তাই অবশিষ্ট থাকবে।’ (সূরা নাহল, আয়াত ৯৬)
সুতরাং মূল্যবান যা কিছু আমি লাভ করেছি, তা সবই আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দিয়েছি, যাতে তা তাঁর কাছে বর্তমান থাকে।
মাসয়ালা : ৪. আমি মানুষজনকে দেখেছি, সবারই ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, বংশীয় আভিজাত্য এবং মর্যাদার প্রতি ঝোঁকপ্রবণতা ও মানসিক আকর্ষণ রয়েছে। আমি এসব বিষয় সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে সব কিছুকেই নিরর্থক মূল্যহীন বলে হৃদয়ঙ্গম করেছি। অতপর আল্লাহর ঘোষণা সম্পর্কে চিন্তা করেছি। তিনি ঘোষণা করেন-
‘তোমাদের মাঝে সে-ই সবচাইতে বেশী সম্মানিত, যে সবচাইতে বেশী আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৩)
তাই আমি তাকওয়া অবলম্বন করেছি, যাতে আল্লাহর কাছে আমি সম্মানিত হতে পারি।
মাসয়ালা : ৫. আমি মানুষকে দেখেছি, তারা একে অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করে, একে অন্যকে মন্দ বলে। এর একমাত্র কারণ হলো হিংসা-বিদ্বেষ। বলা হয়, কোনো মানুষই হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত নয়। অতপর আমি আল্লাহর নিুোক্ত ঘোষণা বাণী সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করেছি। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন-
‘আমি মানুষের মাঝে তাদের জীবিকা বন্টন করেছি।’
তাই আমি হিংসা বিদ্বেষ পরিহার করে মানুষজন থেকে পৃথক হয়ে গেছি। আমি জেনেছি, মানুষের জীবিকা বন্টনের কাজটা আল্লাহর প থেকেই হয়। অতএব, আমি মানুষের প্রতি শত্রু তা পরিহার করেছি।
মাসয়ালা : ৬. আমি মানুষকে দেখেছি, তারা একে অন্যের বিদ্রোহ করে, পরস্পরের রক্ত ঝরায়, খুনখারাবী করে। এ বিষয়ে আমি যখন আল্লাহর ঘোষণার প্রতি প্রত্যাবর্তন করি তখন আমি দেখতে পাই, আল্লাহ্ তায়ালা ঘোষণা করছেন-
‘নি:সন্দেহে শয়তান তোমাদের দুশমন, অতএব তোমরা তাকে দুশমন হিসাবেই গ্রহণ করো। শয়তান নিজের দলবলকে আহ্বান জানায় যেন তারা জাহান্নামী হয়ে যায়।’
এ আয়াতের আলোকে আমি শয়তানকেই আমার একমাত্র শত্রু সাব্যস্ত করেছি। আমি তার থেকে আত্নরক্ষা করে চলি। শয়তানকে একমাত্র শত্রু সাব্যস্ত করে অবশিষ্ট সকলের শত্রু তা আমি পরিত্যাগ করেছি।
মাসয়ালা : ৭. প্রত্যেক মানুষকেই আমি পেয়েছি, তারা এক টুকরা রুটির প্রত্যাশী। এর জন্যেই তারা নিজের আত্নাকে কলুষিত অপদস্থ করে। এক টুকরা রুটির প্রত্যাশায় তারা এমন সব কাজে প্রবৃত্ত হয় যা তাদের জন্যে বৈধ নয়। এ বিষযে আমি আল্লাহর বাণী নিয়ে চিন্তা ভাবনা করি। তিনি এরশাদ করেন-
‘এমন কোনো প্রাণী নেই, যার জীবিকা আল্লাহর ওপর ন্যস্ত নয়।’
অতএব, আমি হৃদয়ঙ্গম করেছি, আমিও আল্লাহর তায়ালার সেসব প্রাণীর শামিল, যার জীবিকার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর ওপর ন্যস্ত। তাই আমি জীবিকানেষণের চিন্তা পরিহার করে আল্লাহর হকসমূহ আদায়ে নিমগ্ন হয়েছি।
মাসয়ালা : ৮. আমি প্রত্যেক মানুষকেই কোনো না কোনো বস্তুর ওপর নির্ভরশীল পেয়েছি। কেউ জমিজমার ওপর, কেউ ব্যবসায়ের ওপর, কেউ শিল্প নৈপুণ্যের ওপর, কেউ শারীরিক সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল। অতপর দেখতে পেলাম, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন-
’যে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহই তার জন্যে যথেষ্ট।’
অতএব, আমি এক আল্লাহর ওপর নির্ভর করি, তিনিই আমার জন্যে যথেষ্ট।
হযরত হাতেম আসাম্ম (র.)-এর এ বর্ণনার পর হযরত শাকীক বলখী (র.) বলেন, হাতেম! আল্লাহ তায়ালা তোমাকে তাওফীক দিয়েছেন। আমি যখন কোরআন, তাওরাত, যবুর ও ইঞ্জীলের শিার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, তখন সে সবের সারমর্ম তোমার বর্ণিত আটটি মাস্য়ালায় দেখতে পাই। কোরআন, তাওরাত, যবুর ও ইঞ্জীলের সব এলেমই তোমার আটটি মাসয়ালায় নিহিত রয়েছে।
বাস্তবে এটাই হচ্ছে এলেম, যা আম্বিয়ায়ে কেরামের যথার্থ উত্তরাধিকার এবং দুনিয়া আখেরাতে সাফল্যের নির্যাস। আজকাল আমরা যে বিষয়ের নাম এলেম (জ্ঞান) রেখেছি, তা এ মহাজন বাক্যের উদাহরণের মতো- ‘এলেম যদি দেহের উপরিভাগে শোভা পায় তাহলে তা হবে আগুন।’untitled-22

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY