মসজিদে প্রবেশ করেই ২ রাকাত সংক্ষিপ্তভাবে নামায আদায় করার গুরুত্ব

0
44

ভাইয়েরা আমার! এর আগেও একটি পরিপূর্ণ খোতবা আপনাদের সামনে পেশ করেছি। যার উদ্দেশ্য ছিলো সুন্নতের ইক্তেদা (অনুশীলন) করা। সেটাই আবারও আপনাদের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস পাবো।
আপনাদের কি মনে নেই? ঈমান ইসলাম অর্থ হলো রসূলের বক্তব্য শোনার সাথে সাথেই তা মাথা পেতে নেয়া। সুতরাং রসূল (স.)-এর বক্তব্য হলো যখন জুমরআন দিনে মাসজিদে এসে যাবে এ সময় ইমাম খোতবা দিচ্ছেন তখন দু রাকাত নামায আদায় করে নিবে। সুতরাং খোতবা শুরু হওয়ার আগেই মাসজিদে হাজির হয়ে যাও এবং কমপক্ষে দু’ রাকাত নামায আদায় করে নাও। তা না হয় যেভাবে সহজ হয় পড়ে আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত আদবের সাথে চুপচাপ বসে পড়ো। তারপর কুরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর যিকির এবং নফল নামায পড়ে সময় অতিবাহিত করো। অবশ্য যদি কখনো দেরী হয়ে যায়। এমন সময় যদি মাসজিদে খোতবা চলতে থাকে তবে মাসজিদে প্রবেশ করেই ২ রাকাত সংক্ষিপ্তভাবে নামায আদায় করে নাও। নামায পড়া ছাড়া বসে পড়ো না। যদি কেউ বলেও যে ওমুক ইমাম সাহেব নিষেধ করেছে। আর ওমুক মাযহাবে এ সময় নামায পড়ার বিধান নেই। তখন তুমি জবাব দিয়ে দাও যে, সেই ইমামের ইমাম বরং নবীদের ইমাম এবং বিশ্ব জাহানের ইমাম আল্লাহর হাবীব প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) হুকুম করেছেন (খোতবা চলাকালীন হলেও) দু’ রাকাত নামায আদায় করতে। তিনি তার সামনেই এই হুকুম কার্যকর করেছেন। এবং আমভাবে এই আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং হুজুর (স.) এর আদেশ সকল হুকুমের ওপর প্রাধান্য রয়েছে। সুতরাং তিনি যে হুকুম করেন অন্যরা তা কেন নিষেধ করবে? এ অবস্থায় রসূলের আদেশ অমান্য করে অপর কারো নির্দেশ মেনে নেয়া ঈমানের বরখেলাফ করা হয়। আমাদের ইমাম হযরত ইমাম আবু হানীফা (র.)-ও বলেছেন, যে ব্যক্তি সহীহ হাদীসের ওপর আমল করবে সে আমার মাযহাবে রয়েছে। এভাবে ইমাম সাহেবের আরো গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা বিদ্যমান রয়েছে।
এই সুন্নতটি হচ্ছে সুন্নতে মোয়াক্কাদা। মারওয়ান ইবনে হাকামের আমলে সরকারী আদেশ জারি করা হয়েছিলো যে, যখন রাষ্ট্র প্রধান খোতবা পড়তে থাকে তখন কেউ যেন ২ রাকাত নামায না পড়ে। কেননা এটা হচ্ছে শাহী ফরমানের অবমূল্যায়ন করা। কিন্তু সাহাবী হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) এমন সময় মসজিদে পৌঁছেন এবং তিনি ঐ কানুনের কোনো তোয়াক্কা না করে বরং দু’ রাকাত নামাযের নিয়ত বাঁধতেন। নামায পড়ার কারণে সরকারের পুলিশ বাহিনী তাকে মারলেও কিন্তু এরও পরোয়া করতেন না বরং এই সুন্নতকে আদায় করে নিতেন এবং বলতেন সুন্নতে রসূলকে কোনো বাদশাহর হুকুম ও আদেশের দ্বারা কোরবানী করা যায় না বরং বাদশাহর সকল কানুন এক সুন্নতের বাম পায়ের নীচে ফেলে রাখা যেতে পারে।
উল্লেখ, খোতবা চলাকালীন দু রাকাত নামায না পড়ার বিধান মারওয়ানী বেদআত। সেই বাদশাহ ঈদের খোতবা নামাযের আগে দিতো। অথচ রসূল (স.) নামাযের শেষে খোতবা পড়তেন। অতএব এটা জেনে নেয়া ভালো যে, সুন্নতের মোকাবেলায় কারো কর্ম কিংবা বক্তব্যের কোনো গুরুত্ব নেই।
হযরত আবু হোরায়রা এবং ইবনে ওমর (রা.) বলেছেন যে, আমরা মিম্বরে খোতবা দানকালে নবী (স.)-এর কাছ থেকে একথাও শুনেছি যে, তিনি বলেছেন- হয়ত লোকেরা জুমআতে হাজির না হওয়া থেকে বিরত থাকবে তা না হলে আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিবেন যাতে তারা একেবারে গাফেল হয়ে যায়।
হযরত আবদুল্লাহ বিন বুছর (রা.) বলেছেন, জুমআর দিনে যখন রসূল (স.) খোতবা দিচ্ছিলেন এ সময় এক লোক এসে লোকদের ঘাড়ের ওপর ডিঙ্গিয়ে সামনে আসা শুরু করে দিয়েছে। রসূল (স.) তাকে এ রকম করতে দেখে বললেন, বসে যাও, তুমি কষ্ট দিচ্ছো এবং দেরী করাচ্ছো। (আহমদ)
উক্ত হাদীস থেকে জানা গেলো যে, যেখানে জায়গা পাওয়া যায় সেখানেই  বসে যেতে হবে। লোকদের ডিঙ্গিয়ে লাইন ভেঙ্গে ভেঙ্গে সামনে বেড়ে যেয়ো না। এটা হারাম। একে তো দেরী করে এসেছে অপরদিকে অন্যদের কষ্ট দিচ্ছে বরং তিরমিযী শরীফের হাদীসে রয়েছে যে, এমন ব্যক্তি যেন জাহান্নামের ব্রীজের উপর উঠে চলছে। তাবারানীর এক রেওয়ায়াতে রয়েছে, নামায শেষ করে হুজুর (স.) তাকে জিজ্ঞেস করলো, আমাদের সাথে জুমা আদায় করতে তোমাকে কিসে বাধা দিয়েছো? উদ্দেশ্য এই ছিলো যে, তুমি যেহেতু লোকদের মাথার ওপর দিয়ে ডিঙ্গিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলো তাতে তোমার জুমআর সাওয়াব চলে যচ্ছিলো। তুমি এমন কাজ কেন করছিলে? সে বললো, আমি চেয়েছিলাম এমন কাছাকাছি জায়গায় বসলে তাতে আপনার নজর আমার ওপর পড়ে। তিনি বললেন, আমি তো দেখলাম যে তুমি তাদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে ডিঙ্গিয়ে চলছো এবং তাদের কষ্ট দিচ্ছো, শোনো! যে মুসলমানকে কষ্ট দেয়; সে যেন আমাকে কষ্ট দেয়। আর আমাকে কষ্ট দেয়া মানে আল্লাহকে কষ্ট দেয়া।
হযরত জাবের (রা.) বলেছেন, রসূল (স.) তাঁর প্রদত্ত এক খোতবায় বলেছেন, হে লোকেরা! আল্লাহর দিকে ফিরে যাও তোমার মৃত্যু আসার পূর্বে। মৃত্যুর পূর্বে তাওবা করে নাও। কোনো বিপদ এসে যাওয়ার আগে নেক কাজ করে নাও। সেই সম্পর্ক তোমার ও আল্লাহ ওয়ালার সাথে জুড়তে বেশী বেশী আল্লাহর যিকির করো। গোপনে গোপনে এবং প্রকাশ্যে দান সদকা করো। এতে তোমাদের রুজি রোজগারে বরকত হবে। তোমরা শত্র“র ওপর বিজয় লাভ করবে, প্রত্যেক ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবে। আল্লাহর যিকির ও  দান খয়রাতে এই উপকার হয়।
হে লোকেরা! তোমাদের ওপর আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর জুমআকে ফরজ করে দিয়েছেন। আমার এই স্থানে, আজকের দিনে, এই মাসে এবং এই বছরে। তা আজ থেকে দুনিয়া যতোদিন থাকবে ততোদিন পর্যন্ত ফরজ থাকবে। কেয়ামত পর্যন্ত এই ফরজ টিকে থাকবে। যে ব্যক্তি আমার জীবদ্দশায়, আমার মৃত্যুর পর ছেড়ে দেয়, ইমাম সে সময় ইনসাফকারী হোক কিংবা যালিম হোক, তাকে হাল্কা মনে করে ছেড়ে দেয় কিংবা বিরোধিতা করে, তার জন্যে আমার অভিশাপ। হে আল্লাহ! তার সকল কাজ দ্বিধানি¦ত করে দাও। তার অন্তরকে কখনো প্রশান্তি দিও না, আল্লাহ করুক তার কাজে কোনো বরকত না হয়। মনে রাখবে, এভাবে যারা জুমআর নামায ছেড়ে দিবে তার নামায কবুল হবে না। তার যাকাত নেই। তার কোনো হজ্জও নেই। তার কোনো রোযাও নেই। যতোক্ষণ না সে তাওবা করে, আল্লাহ তায়ালা তার কোনো নেকী গ্রহণযোগ্য হবে না। হাঁ, সাচ্চা মনে কেউ তাওবাকারীদের তাওবা আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করবেন। সম্মানিত ভাইয়েরা আমার! অত্যন্ত আফসোসের বিষয় যে, ঐসব নামধারী মুসলমানের কাছে আজ জুমআর নামাযের কোনোই গুরুত্ব নেই। আল্লাহ রব্বুল আলামীনের এই সাধারণ মাহফিলে হাজিরা দিচ্ছো না। আমাকে তাই বলতে হচ্ছে এইসব লোক আল্লাহর নিমকহারাম নিকৃষ্টপ্রকৃত মানুষ। জুমআর গুরুত্ব সম্পর্কে হুজুর (স.)-এর খুতবাটি আপনাদের পেশ করলাম। যা আয়াতে কারীমের তাফসীর তুল্য।
হে মোমেন বান্দারা! জুমআর আযান শুনতেই আল্লাহর যিকিরে দৌঁড়িয়ে আসো, তোমার কাজ কাম, ব্যবসা বাণিজ্য এবং দুনিয়াবী আর সব কার্যক্রম ছেড়ে দেও। সেগুলোকে জুমআর আযান তোমার জন্যে হারাম করে দিয়েছে। তোমরা যদি জ্ঞান বুদ্ধি রাখতে তবে এটা তোমাদের জন্যে খুবই উত্তম হতো।
প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহর কসম! কলিজা কাঁপছে, শরীরের পশম দাঁড়িয়ে উঠছে। একদিকে মুসলমানরা এই ফরয আদায়ে এতোটা গাফিলতি করছে। অপরদিকে এক গোষ্ঠী জুমআর ফরজিয়ত নিয়ে বিরোধিতা করছে, তারা পরিস্কার বলছে, গাঁও গেরামে জুমআ পড়া জায়েয নেই। এটাকেই বলে আল্লাহর কালামকে বদলে দেয়া, এটাই হলো ফরজকে হারাম সাব্যস্ত করা।
মুসলমানরা! কোরআনের আয়াতের প্রতি আবার নজর দাও। আয়াতে প্রত্যেক ঈমানদারের জন্যে জুমআ ফরজ করে দিয়েছে। চাই গ্রাম হোক কি শহর।
প্রিয় নবী হযরত (স.) এ বিষয়ে ফরজিয়াতের ওপর জোর তাগিদ দেয়ার জন্যে পরিস্কার ভাষায় গুরুত্বের সঙ্গে বয়ান করেছেন। রসূল (স.) থেকে শুরু করে কেয়ামত পর্যন্ত এর ফরজ সাবেত ও প্রতিষ্ঠিত থাকবে বলে জোর ঘোষণা দিয়েছেন।
আবু দাউদসহ প্রমুখ হাদীসগ্রন্থে রয়েছে, রসূল (স.) বলেছেন-জুমআ প্রতিষ্ঠিত এবং জামায়াতের সাথে অবশ্য পালনীয় বিধান প্রতি মুসলমানের জন্যে। অর্থাৎ চাই সে গ্রামে কিংবা শহরে নগরে কিংবা বন্দরে যেখানেই থাকুক তার ওপর জুমআ ওয়াজিব। দারে কুতনীতে হাদীস রয়েছে- আল্লাহও কেয়ামত দিবসে যাদের ঈমান আছে, তার ওপর জুমআর দিন জুমআন নামায ফরজ। কিন্তু এক গোষ্ঠী লোক বলছে, অর্ধেকের কম মানুুষের প্রতি ফরজ, আর অর্ধেকের বেশী মুসলমানদের ওপর ফরজ নয়। প্রকৃত কোরআন ও হাদীসের কোথাও এমন কথা নেই। ফকীহদের বক্তব্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটলো যে, ইমামদের যুক্তিকে দ্বীনের মাঝে প্রবেশ করিয়ে আজ আল্লাহর ফরজকেও বাদ দিতে বসেছি? পূর্বে আমি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছি, আল্লাহর কালাম ও রসূল (স.)-এর সালাম ও মানুষের কথায় ইসলাম থেকে অব্যাহতি নিচ্ছে।
অতএব আল্লাহকে মানো, তার রসূলকে মানো, কুরআনকে মানো এবং হাদীসকে মানো এবং শহর গ্রাম সর্বত্র জুমআ কায়েম করো। তা না হলে রসূল (স.)-এর বদদোয়া লেগে যাবে। জীবনভর পেরেশানীর মধ্যে কাটাবে, বরকত চলে যাবে, নেক কাজ বরবাদ হয়ে যাবে এবং গুনাহ অবধারিত। শোনো, ইসলামে প্রথম জুমআ হযরত আসআদ বিন জারারাহ (রা.) পড়িয়েছিলেন। তিনি বাকীয় নামক এক গ্রামে এ নামায পড়িয়েছিলেন। গ্রামটি মদীনা শরীফের পার্শ্ববর্তী একটি গ্রাম। সে সময় এ গ্রামে মুসলমানের সংখ্যা ছিলো ৪০। হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) বলেছেন, মিম্বরে খোতবা প্রদান কালে রসূল (স.)-এর যবান মুবারক থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন, জুমআর দিন মুসল্লীদের উচিত গোসল করে মাসজিদে আসা।যদিও গোসল ফরজ ওয়াজিব কোনোটাই নয়। তবু গোসল করার ব্যাপারে বিশেষ তাকিদ দেয়া হয়েছে। এমনকি হাদীসে রয়েছে, জুমআর দিন প্রত্যেক বালেগ ব্যক্তির জন্যে গোসল করা ওয়াজিব। সেজন্যে জুমআর দিন গোসল করা প্রয়োজন। রসূল (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমআর দিন খুব ভালো করে গোসল করে আগে আগে মসজিদে পায়ে হেঁটে হেঁটে যায় এবং কোনো যানবাহনে করে না গিয়ে ইমাম সাহেবের কাছাকাছি বসে এবং মনোযোগ সহকারে খোতবা শোনে আর কোনো বেহুদা কথা না বলে থাকে এবং সানি খোতবার সময়ও কোনো কথা না বলে তার এক এক কদমে এক এক বছরের এবাদতের সাওয়াব পাবে, অর্থাৎ পুরো বছরের রোযার ও রাতে দাঁড়িয়ে নামায পড়ার সাওয়াব পাবে। (আবু দাউদ প্রমুখ)
হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রা.) বলেছেন, আমি আমার নিজ কানে রসূল (স.)-কে জুমআর দিন প্রদত্ত খোতবা থেকে শুনেছি, কি সমস্যা ধনী বিত্তবান দানশীল প্রশস্ত মনের লোক যদি জুমআর সাধারণ পোশাক রেখে আলাদা পোশাক পরে আসে। যদিও দরকার নেই তবুও খুবই উত্তম। (ইবনে মাজা) অতএব, যতোটা সম্ভব জুরআর দিনে ভালো পোশাক পরে নামায পড়তে আসো। আতর লাগাও, মসজিদে সুগন্ধিতে ভরে দাও, ময়লা নোংরা হয়ে এসো না, ছেঁড়া ফাঁড়া কাপড় পরে এসো নয়, এটা তোমাদের জন্যে ঈদের দিন। এদিন দাঁতকে খুব ভালো করে পরিস্কার করে আসবে। খুব ভালো করে মেসওয়াক করবে তাতে মুখের গন্ধ দূর হয়ে যাবে। সমাবেশে খারাপ আবহাওয়া ছড়াবে না, একে অপরকে কষ্ট দিয়ো না। এসব গুণ জুমআর ৮ দিনের গুনাহ মাফ করে দেয়। এটা বড়োই ফজিলতের দিন। এ দিনের সম্মান করো। হাদীসে রয়েছে, এ দিন নৈকট্য লাভ করবে। জুমআর দিনে জুমআতে হাজির হতে যে পরিমাণ দেরী করবে তবে জান্নাতে যাবে তবে পিছে পিছে থাকবে। এই দিন জুমা মসজিদের দরজায় দুইজন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে থাকে, তারা মসজিদে আগত মুসল্লিদের নাম ও নম্বর দিতে থাকে। ইমাম সাহেব মিম্বরে উঠার সাথে সাথে ফেরেশতারা তাদের দফতর বন্ধ করে দেয়। সুতরাং সামনে অগ্রসর হও। পিছনে থেকো না।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY