রসূলুল্লাহ (স.) জুমআর দিনে যা করতেন।

0
26

 

হযরত জাবের বিন সামুরাহ (রা.)-সহ প্রমুখ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ (স.) জুমআর দিনে ২টি খোতবা দিতেন। মাঝে বসে পড়তেন, কোরআন শরীফের তেলাওয়াত করতেন এবং লোকদের প্রয়োজনীয় নসীহত করতেন। রসূলের নামায না লম্বা ছিলো, না সংপ্তি ছিলো। বরং নামায ও খোতবায় একটা মাঝামাঝি অবস্থান ছিলো। এর বিস্তারিত বর্ণনাও আবু দাউদ শরীফের হাদীসে রয়েছে। রসূল (স.) এসেই মিম্বরে চলে যেতেন। মোয়াজ্জিন আযান দিতো, আযান হয়ে যাওয়ার পর রসূল (স.) দাঁড়িয়ে খোতবা দান করতেন, বসা অবস্থায় চুপ থাকতেন। তারপর পুনরায় দাঁড়িয়ে খোতবা দান করতেন। হযরত ওমর বিন হুরাইস (রা.) বলেছেন, জুমআর খোতবার সময় রসূলের মাথায় কালো পাগড়ি বাঁধা ছিলো, যার দু পাশ তার দু কাঁধের ওপর লটকে থাকতো। (মুসলিম)

হযরত ইয়ালা বিন উম্মিয়া (রা.) বলেছেন, রসূল (স.) একবার তার খোতবায় এই আয়াত তেলাওয়াত করেছেন-

জাহান্নামীরা জাহান্নামের আগুনের তাপদাহে থগ্ধ হয়ে অসহ্য হয়ে চীৎকার করে বলবে- হে জাহান্নামের মালিক দারোগা তুমি আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে আমাদের জন্যে দোয়া করো যেন আমাদের মৃত্যু দিয়ে দেয়। সে বলবে- হে কাফেররা তোমার মৃত্যুর তো মৃত্যু হয়ে গেছে। এখন তোমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে এই আযাবের মধ্যেই জ্বলতে হবে।

এবার রসূল (স.)-এর খোতবার একটি বিস্ময়কর ঘটনা শুনুন। ‘একবার রসূল (স.) খোতবা দানের উদ্দেশে জুমআর দিন মিম্বরে আসীন হন। তারপর বললেন, বসে যাও, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) আসতেছিলেন। এখন মাত্র মসজিদের দরজায় এসেছেন তখন রসূল (স.)-এর এই মোবারক শব্দ শুনতে পেলেন যে রসূল (স.) বসে যাওার হুকুম করেছেন। তখন তিনি সাথে সাথে বসে পড়েন। আর এক কদমও সামনে বাড়েননি। রসূল (স.) যখন দেখলেন আবদুল্লাহ বিন মাসউদ সেখানে বসে আছেন তখন দ্বিতীয় ইশারা করলেন আবদুল্লাহ সামনে এসে যাও, এখানে এসে বসে পড়ো। (আবু দাউদ)

আপনারা কি সাহাবায়ে কেরামের আদেশ পালনের প্রতি ল্য করেছেন? আদেশমূলক শব্দ কানে আসা মাত্র পালন করে ফেলেন। এমন না যে, কোনো চালাকি করলেন বা করেছেন। সত্যিকার আনুগত্য এটিই। আমাদেরও আল্লাহ তায়ালা তাওফিক দিন। আমীন। জুমআর দিন আসন পেতে, কাপড় ছড়িয়ে, আরামে নিজের প্রসার করে বসা নিষেধ। কেননা তাতে ঘুম এসে যায় এবং খুতবার প্রতি মনোযোগ থাকে না। তবে যদি এসব আশংকা না থাকে তবে সমস্যা নেই। (তিরমিযী, আবু দাউদ প্রমুখ হাদীস গ্রন্থ)

বসতে বসতে যদি ঘুম এসে যায় তবে জায়গা পরিবর্তন করে বসতে হবে। তাতে ঘুম চলে যাবে। (তিরমিযী)

কাউকে তার জায়গা থেকে উঠিয়ে সেখানে নিজে গিয়ে বসে পড়ো না। বোখারী মুসলিমের হাদীসের রয়েছে যে, রসূল (স.) এমন কাজ করতে নিষেধ করেছেন। ইমামের খোতবা দেয়ার সময় নিজেদের মধ্যে পরস্পর কথাবার্তা বলা হারাম। হাদীসে রয়েছে, এমন ব্যক্তির উদাহরণ হচ্ছে গাধার ন্যায়। যার ওপর কিতাবের বোঝা বহন করা হয় কিন্তু তার বুঝার মতা রাখে না। তার তো জুমআই হয়নি। (মোসনাদে আহমদ) যে ব্যক্তি বিনা কারণে অলসতা করে তিন জুমা ছেড়ে দিলো তার ওপর আল্লাহর মহর লেগে যায়। (নাসাই ইত্যাদিতে এই হাদীস রয়েছে)

গোলাম, নারী, কঠিন রোগী এবং বান্দাদের ওপর জুমআ ফরজ নয়। (আবু দাউদ) এরা যোহরের নামায পড়ে নিবে। মুসলিম শরীফে রয়েছে, রসূল (স.) বলেছেন, আমার ইচ্ছা হয় যে ব্যক্তি জুমআর নামাযে হাজির হবে না, তাদের ঘর জ্বালিয়ে দেই। যে ব্যক্তি জুমআর নামায ছেড়ে দিলো সে তো মোনাফেক। পিয়ারা নবী (স.) বলেছেন, জুমআর দিন হলো তামাম দিনগুলো সর্দার। এই দিন আল্লাহর দরবারে সব দিনের চেয়ে বেশী সম্মানার্হ ও ইযযতদার। বরং ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা থেকেও আল্লাহর কাছে উত্তম। এ দিন সম্পর্কে পাঁচটি বিস্ময়কর কথা রয়েছেÑ

(১) এই দিনে আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন।

(২) এদিনে তিনি দুনিয়ায় আগমন করেন।

(৩) এ দিনে তাঁর মৃত্যু হয়।

(৪) এ দিনে এমন একটা সময় আছে, যে সময় আল্লাহ পাকের কাছে যা প্রার্থনা করা যায় তাই তিনি দান করবেন।

(৫) এই দিনে কেয়ামত সংঘটিত হবে। সকল মুকাররব ফেরেশতা, আসমান যমীন, বাতাস, পাহাড় পর্বত, নদী সাগর, তীর সবকিছু এই ভয়ে থাকে যে, কখন কেয়ামত হয়ে যায়। (আহমদ)

দোয়া কবুলের যে কথা বলা হয়েছে তা হযরত ইমাম সাহেব মিম্বরে আসাকালীন সময় থেকে জুমআর নামাযের সালাম ফিরানো পর্যন্ত। কিংবা আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত। অতএব জুমআর দিন সূর্য ডুবার পূর্বে হলেও আল্লাহর দিকে ফিরে যাও। এ সময় গাফিলতির সময় নয়। এ দিনের বিশেষ অযিফা হচ্ছে নবী করীম (স.)-এর ওপর বেশী বেশী দরূদ পড়া। এ দিনে সূরা কাহাফের তেলাওয়াত করা একান্ত প্রয়োজন। রসূল (স.)-এর একটি সুন্দর নিয়ম ছিলো। তিনি যখনই মিম্বরে খোতবা দিতে উঠতেন তখনই মুসল্লিদের দিকে ফিরে বলতেন- আসসালামু আলাইকুম। পরে আবু বকর (রা.) হযরত ওমর (রা.)-ও রসূলের সেই সুন্নতের অনুরূপ আমল করতেন। (যাদুল মায়াদ)

রসূল (স.) অধিকাংশ খোতবা আল্লাহর কাছে মা প্রার্থনা করে শেষ করতেন। আবু দাউদ শরীফে রয়েছে খোতবাদানকালে অধিকাংশ সময়ে রসূল (স.)-এর হাতে লাঠি থাকতো। কখনো কখনো (সম্ভবত জিহাদের ময়দানে) রসূল (স.) কামানে ঠেক লাগিয়ে দাঁড়াতেন। প্রয়োজনীয় বিষয় ও যৌক্তিসিদ্ধ পরিণামদর্শিতা সম্পর্কে খোতবা দিতেন। যখন যে জিনিসের কথা বলা প্রয়োজন হতো তখন সে বিষয়ে কথা বলতেন। আল্লাহ তায়ালার মাহাত্ব্য, দয়া, অনুগ্রহ, পুরস্কার, নিয়ম কানুন, জান্নাত, জাহান্নাম, তাকওয়া, হেদায়াত আল্লাহর গযব থেকে বাঁচার উপায়। তার সন্তুষ্টি লাভের উপায় সম্পর্কে প্রত্যেক বিষয়ে খোতবায় পেশ করতেন।

রসূল (স.) কখনও কখনও তার খোতবায় বলতেন- হে লোকেরা! আমি তোমাদের যা নির্দেশ করি তা সব তোমরা পালন করা কখনো সম্ভব না এবং করতে পারবেও না। তাই আমি বলবো যে, তোমরা সঠিক থাকো, হেদায়াতের ওপর অটল থাকো, যতোটা সম্ভব সুন্নতের রীতি-নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, এমন কোনো কারণ নেই যে, যা তোমাদের হতাশ করতে পারে, সন্তুষ্ট থাকো এবং মাগফেরাতের কামনা করতে থাকো। একবার রসূল (স.) খোতবা পড়তেছিলেন। এ সময় রসূল (স.)-এর নাতি হযরত হাসান হোসাইন চলে আসেন। তারা লাল রংয়ের লম্বা জামা পরে ছিলো। তারা পড়ে যাচ্ছিলেন। এ অবস্থা দেখে রসূল (স.) খোতবা রেখে দু নাতিকে উঠিয়ে তারপর মিম্বরে এসে তিনি বললেনÑ আল্লাহ তায়ালা খুবই সত্য বলেছেন যে, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সন্তান তোমাদের জন্যে ফেতনা এবং পরীার বিষয়। ঐ দুটি শিশুকে জামার কারণে পড়ে যেতে দেখে তো আমার ধৈর্য কুলালো না, সহ্য হলো না। খোতবা ছেড়ে তাদের কোলে উঠিয়ে নিয়েছি। (যাদুল মায়াদ)

মুসলিম ভাইয়েরা আমার! আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতি দয়া করুন। জুমআর ব্যাপারে আরো কি বয়ান শুনে নাও। আল্লাহ তায়ালা এই দিনটি বিশেষ মর্যাদার সাথে আমাদের দান করেছেন। শনিবার ছিলো ইহুদীদের দিন আর খৃষ্টানদের দিন ছিলো রোববার। অনুরূপভাবে এই উম্মত মর্যাদার দিক থেকে ‘আলহামদু লিল্লাহ’ সেই উম্মতদের থেকে এগিয়ে আছে। এই দিনের নাম ফেরেশতাদের মাঝে ‘ইয়াওমুল মযীদ’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার পুরস্কার ও সম্মানদানের দিন। দুনিয়ার দিন হিসাবে যেন এই দিনে জান্নাতীদের জন্যে জান্নাতে দরবারে আম অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে তাদের জন্যে বহু নেয়ামত বাড়িয়ে দেয়া হবে। যেখানে তারা আল্লাহর কালাম শুনবে এবং আল্লাহর সাথে স্নেহশীল সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। সেদিন (শুক্রবার) ফজরে ফরজ নামাযে প্রথম রাকায়াতে সূরা সেজদা পড়তে ছিলেন এবং দ্বিতীয় রাকাতে ‘সূরা হাল আতা’ পড়েন। এটা সুন্নতি তরীকা। কিন্তু আফসোস অনেক মুসলমান এই কারণে এই সুন্নত ছেড়ে দেন যে, ফিকাহর কিতাবে এই সুন্নতকে গ্রহণ করা হয়নি। আপনারা বিস্ময় ও হতাশ এর সাথে শুনবেন যে, ফকীহরা লিখেছেন যে, এমনটা করা মাকরূহ। নাউযুবিল্লাহ। এর পরিষ্কার অর্থ এই যে, সুন্নতে রসূলের ওপর আমল করা মাকরূহ। এ েেত্র একজন মুসলমানের ওপর ফরয যে, উচ্চস্বরে আল্লাহ তায়ালা ও মাখলুককে স্যা রেখে বলে দেয়া যে, আল্লাহর রসূল (স.) সত্য, হাদীসের বিরোধিতাকারীরা মিথ্যুক। রসূল (স.)-এর আমল আমল করার উপযোগী। ঐ সুন্নতকে মাকরূহ সাব্যস্তকারীদের কথা আমাদের কাছে মাকরূহ এবং ঘৃণিত।

জুমআর দিনে এক বিশেষ হুকুম এটাও যে, বেলা ডুবার সময় নামায নিষিদ্ধ নয়। হাদীসে রয়েছে যে, এই দিন জাহান্নামের আগুন জ্বালানো হয় না। জুমআর দিনে রসূল (স.) সাধারণত ‘সূরা সাব্বিহিসমা’ প্রথম রাকাতে এবং দ্বিতীয় রাকাতে ‘হাল আতাকা’ পড়তেন। কিংবা ‘সূরা জুমআ’ ও ‘সূরা মোনাফেকুন’ পড়তেন। জুমার দিনের মসজদিকে সুগন্ধিময় করো। খলিফাতুর রসূল হযরত ওমর (রা.) হযরত নাঈমকে বিশেষ করে এ কাজে নিয়োজিত করেন। তিনি জুমআর দিন মসজিদকে আতর দিয়ে ভরে দিতেন। সেজন তাঁকে ‘নাঈম মুজমার’ নামে ডাকা হতো। মুসনাদে আহমদের হাদীসে রয়েছে, রসূল (স.) বলেছেন, ইহুদীদের এই জুমআর ওপর, কাবার কেবলা হওয়ার এবং ইমামের পিছনে আমিন বলার ব্যাপারে কঠিন বিদ্বেষ ছিলো। জুমআর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য এটাও যে, শুধু এদিন ইচ্ছা করে রোযা রাখা নিষেধ। মোসনাদে আহমদে রয়েছে, হযরত জুনাদা আযদী তার বংশের লোক এবং অন্য লোকদের সাথে জুমরআন দিন রসূলের খেদমতে হাজির হন। এ সময় রসূল (স.) নাস্তা করছিলেন। রসূল (স.) তাদেরকেও নাশতা করার জন্যে ডাকলেন। তারা বললো, আমরা তো রোযা রেখেছি। রসূল (স.) বললেন, কালকে রোযা রেখেছো? তারা বললো, না। তিনি বললেন, আগামীকাল রোযা রাখবে? আমরা বললাম, না। এরপর তিনি বললেন, তাহলে আজকের রোযা ভেঙ্গে ফেলো, ইফতার করো। আমরা সবাই রসূল (স.)-এর সাথে বসে পড়ি এবং রোযা ভেঙ্গে ফেলি। এরপর তিনি মসজিদে আসেন জুমআর নামায পড়েন। মিম্বরে বসে পড়েন এবং পানি এনে সকলকে দেখিয়ে পানি পান করেন তাতে তিনি সকলকে বুঝিয়ে দেন যে, জুমআর দিন হুজুর (স.) রোযা রাখেন না।

মোকটথা, জুমআর দিন বড়ই ফযিলতের দিন। এর বিশেষ মর্যাদা রা করো। জুমআর নামায হুজুর (স.) সূর্য ঢলে পড়ার পর আদায় করতেন। রসূলের সময়ে একবারই আযান হতো। রসূল (স.) যখন মিম্বরে বসে যেতেন। জুমআর এক রাকাতও যে ব্যক্তি জামায়াতের সাথে পাবে না সে যোহরের চার রাকাত নামায আদায় করে নিবে। ইমাম খোতবা দিবেন দাঁড়িয়ে। কোরআন হাদীস থেকে এটাই প্রমাণিত। বরং যে ব্যক্তি বিনা কারণে বসে খোতবা দিবে সেটা বেদআত।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে এবং সকল মুসলমানকে মা করে দিন। আমাদের ওপর দয়া করুন আপনি অতিশয় উত্তম দয়াবান। আর আমাদের সাহায্য করুন সকল কাফেরের ওপর। আপনাদের প্রতি সালাম ও শাস্তি বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত নাযিল হোক।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY