আবু তালেব সমীপে কোরায়শ প্রতিনিধিদল

0
58

ইবনে ইসহাক বলেন, কোরায়শদের অভিজাত নেতৃস্থানীয় ক’জন লোক আবু তালেবের কাছে গিয়ে বললো, আবু তালেব, আপনার ভ্রাতুস্পুত্র আমাদের উপাস্যদের নিন্দাবাদ করছে, মন্দ বলছে, গালাগাল করছে, আমাদের দ্বীনের দোষত্র“টি বের করছে এবং আমাদের জ্ঞান বিবেককে নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করছে। এমনকি আমাদের পূর্বপুরুষদেরও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করছে। কাজেই হয়তো আপনি তাকে এসব থেকে বিরত রাখুন, অথবা তার এবং আমাদের মাঝখান থেকে আপনি সরে দাঁড়ান। কেননা আপনিও আমাদের একই ধর্মে বিশ্বাসী। তার সাথে বোঝাপড়ার জন্যে আমরা নিজেদেরই যথেষ্ট মনে করি।
কোরায়শ প্রতিনিধিদলের জবাবে আবু তালেব নরম ভাষায় কথা বলেন এবং পক্ষপাতিত্বপূর্ণ বাচনভংগি গ্রহণ করেন। অতএব তারা চলে যায়। অন্যদিকে  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই নিয়মে অব্যাহতভাবে দ্বীনের তাবলীগ এবং প্রচার প্রসারে নিবিষ্ট থাকেন।
হাজীদের বাধা দেয়ার জন্যে পরামর্শ সভা
সে দিনূলোতে কোরায়শদের সামনে আরো একটি সমস্যা এসে উপস্থিত হলো। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর হথের মেথসুম এসে পড়ে। কোরায়শরা জানতো, আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিধি দল এ সময় মক্কায় আসবে। তাই তারা  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এমন সব কথা বলা দরকার মনে করছিলো, যাতে তাদের মনে তাবলীগের কোনো প্রভাব না পড়ে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্যে তারা ওলীদ ইবনে মুগীরার কাছে একত্রিত হয়। ওলীদ বললো, প্রথমে তোমরা সবাই একমত হও, তোমরাই একজনের কথা অন্যজন মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে না। আগন্তুকরা বললো, আপনিই আমাদের বলে দিন, আমরা কি বলবো। ওলীদ বললো, তোমরাই বলো, আমি শুনবো। এরপর কয়েকজন বললো, আমরা বলবো, তিনি একজন গণক জ্যোতিষী। ওলীদ বললো, না, তিনি গণক জ্যোতিষী নন, আমি তাদের দেখেছি, মোহাম্মদ (স.)-এর মধ্যে জ্যোতিষীদের বৈশিষ্ট্য নেই। জ্যোতিষীরা যেভাবে অন্তসারশূন্য কথা বলে তিনি সেভাবে বলেন না।
এ কথা শুনে আগুন্তকরা বললো, তাহলে আমরা বলবো, তিনি একজন পাগল। ওলীদ বললো, না, তিনি পাগলও নন। আমি পাগলও দেখেছি, পাগলের প্রকৃতিও দেখেছি। তিনি পাগলের মতো আচরণ করেন না। পাগলের মতো উল্টাপাল্টা কথাও বলেন না। লোকেরা বললো, তাহলে আমরা বলবো, তিনি একজন কবি। ওলীদ বললো, তিনি কবিও নন। কবিত্বের বিভিন্ন রকম আমার জানা আছে। তার কথা কবিতা নয়। লোকরা বললো, তাহলে আমরা বলবো, তিনি একজন যাদুকর। ওলীদ বললো, না তিনি যাদুকরও নন। আমি যাদুকর এবং তাদের যাদু দেখেছি। তিনি ঝাড়ফুঁক করেন না, যাদুটোনাও করেন না। আগুন্তকরা বললো, তাহলে আমরা কি বলবো? ওলীদ বললো, আল্লা্হর শপথ তার কথা বড়োই মিষ্টি মধুর। তার কথার তাৎপর্য অনেক গভীর এবং প্রত্যেক শাখা প্রশাখা ফলপ্রসূ। তোমরা যে কথাই বলবে, শ্রোতারা সবাই তা বাতিল মনে করবে। তবে তার সম্পর্কে তোমরা সবচেয়ে সমীচীন কথা এ বলতে পারো, তিনি একজন যাদুকর। তিনি যেসব কথা পেশ করেছেন সেসব কথা স্রেফ যাদু, যা শোনার পর পিতা পুত্র, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়। পরিশেষে কোরায়শ প্রতিনিধিদল একথার ওপর একমত হয়ে সেখান থেকে বিদায় হয়।
কোনো কোনো বর্ণনায় বিস্তারিতভাবে একথাও উল্লেখ রয়েছে, ওলীদ আগুন্তকদের সব কথা প্রত্যাখ্যান করলে তারা বললো, তাহলে আপনিই সুচিন্তা অভিমত পেশ করুন। একথা শুনে ওলীদ বললো, আমাকে একটুখানি চিন্তা করার সময় দাও। অতপর সে ভাবতেই থাকে। এমনকি উপরো৩ অভিমত প্রকাশ করে।
উল্লেখিত ঘটনার প্রেক্ষিতে ওলীদ সম্পর্কে আলল্লাহ তায়ালা সূরা মোদদাসসেরের ষোলটি আয়াত নাযিল করেন। যেসব আয়াতে ওলীদের চিন্তা প্রকৃতির চিত্ররূপ অংকন করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সে তো চিন্তা করলো এবংসিন্ধান্ত করলো। অভিশপ্ত হোক সে, কেমন করে সে এ সিন্ধান্ত করলো। আরো অভিশপ্ত হোক সে, কেমন করে সে এ সিন্ধান্তে উপনীত হলো। সে আগে চেয়ে দেখলো। অতপর ভ্রুকুঞ্চিত এবং মুখ বিকৃত করলো। অতপর সে পেছনে ফিরে গেলো, দম্ভ প্রকাশ করলো এবং ঘোষণা করলো, এটা তো লোক পরস্পরায় প্রাপ্ত যাদু ভিন্ন আর কিছু নয়, এটা তো মানুষেরই কথা।’ (আয়াত ১৮-২৫)
উল্লেখিত সিন্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। মক্কার ক’জন মোশরেক হথযাত্রীদের আসার বিভিন্ন পথে অবস্থান নেয় এবং নবী মোহাম্মদ   সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের বিভিন্নভাবে সতর্ক করতে থাকে।
এ কাজে সবার আগে আগে ছিলো আবু লাহাব। হথের সময় সে হথযাত্রীদের ডেরায়, ওকায, মাজেন্না এবং যুল মাজাযের বাজারে  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে লেগে থাকতো। রসূলুল্লাহ (স.) আল্লাহর দ্বীনের তাবলীগ করছিলেন, আর আবু লাহাব তার পেছনে পেছনে থেকে বলছিলো, তোমরা ওর কথা শুনবে না, সে হচ্ছে মিথ্যাবাদী বদদ্বীন।৯
এ ধরনের ছুটোছুটির পরিণামে হথযাত্রীরা ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় জানতে পারলো, নবী করীম  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়ত দাবী করেছেন। এভাবে হথযাত্রীদের মাধ্যমে সমগ্র আরব জাহানে আল্লাহর রসূলের আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY