মহান আল্লাহর গুণাবলী : প্রশংসা ও তাঁর কঠোরতার পরিচয়।

0
110

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

পৃথিবীর সমস্ত গাছগুলোকে কেটে যদি কলম বানানো হয় আর পৃথিবীর সমস্ত পানিকে কালি বানিয়ে রাব্বুল আলামীন-এর হামদ ও সানা (প্রশংসা ও স্তুতি) লেখা হয় তবে কলম ক্ষয় হয়ে যাবে, কালি শুকিয়ে যাবে তবু মহান আল্লাহর গুণাবলী এবং তার প্রশংসা লিখা শেষ হবে না। পৃথিবীর জন্ম থেকে নিয়ে কেউ যদি হায়াত পায় আর পৃথিবীর শেষ হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং এ সময়ে যদি সে আল্লাহর কোনো অগণিত নেয়ামতের ১টিরও শোকরিয়া আদায় করতে চায় তবে তার পক্ষে শোকরিয়া আদায় করা সম্ভব হবে না। প্রতিটি নিশ্বাসে যদি আল্লাহ তায়ালার তাসবীহ ও তাকবীর পড়তে থাকে তবে তার পবিত্রতা ও মর্যাদার মোকাবেলায় কিছুই না। বাতাসে উড়ন্ত পাখী, গুহায় বাসকারী পশু, মাথা নিচু করে বিচরণকারী চতুস্পদ জন্তু, মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে বিচরণকারী কীটগুলো, গহীন জঙ্গলে রাজত্ব পরিচালনাকারী হিংস্র জন্তু, আকাশের গায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো পাহাড়সমূহ, প্রশস্ত যমীন, গন্তব্যের অভিমুখে ছুটে চলা নদী, ঢেউ তোলা সমুদ্র, নীরব বৃক্ষ, সুশৃংখল ফেরেশতা, আগ ও খাকের সৃষ্টিকূল, তীব্র বেগে আওয়ায ও গর্জন সৃষ্টিকারী বস্তুসমূহ, উঁচু ও পৃথিবীর গায়ে লাগানো আকাশ, চমকানো তারকাসমূহ এবং চাঁদ ও সূর্য সৃষ্টিকূলের প্রতিটি অনুকণা আল্লাহর প্রশংসায় মশগুল। সেই পবিত্র এলাহাল আলামীন ওয়াহদাহু লা শারীক আল্লাহর জন্যে যার প্রতি সকলেই মাথা ঝুঁকে আছে, সবাই তার দান খাচ্ছেন। তার হাতের ইশারা ব্যতীত কারো একটি নিঃশ্বাস ফেলা, মুখের মাছি তাড়ানোর শক্তি ক্ষমতা নেই। তার মাহাত্নের সামনে আর সবাই ম্লান। তার দাপটের সামনে আর সবাই লীন। এমন কোনো প্রাণ আছে যে, তার কাছে আশা করে না? আর এমন কোনো জীবন আছে যে, তাকে ভয় পায় না? সকলের মালিক, সকলের রিযিকদানকারী, তিনিই ইযযত দানকারী ও অসম্মানকারী, আমীর ও গরীব তার হাতেরই কারসাজি, গোটা জাহানের মালিক তিনি একাই। মৃত্যু দানকারী, জীবন দানকারী, সুস্থ, অসুস্থকারী তিনি। ক্ষুধা নিবারণকারী, পিপাসা নিবারণকারী, ঘুমন্ত অবস্থায় হেফাযতকারী, যার জ্ঞানের অধীন সব কিছু, যার কুদরতে ছোটো বড়ো হয়, যার শোনা ও দেখার জন্যে অনুভূতির প্রয়োজন নেই। যিনি পানিকে পাথর বানাতে, আগুনকে বাগান সৃজন করতে, দুশমনকে বন্ধুতে পরিণত করতে এবং যিনি রহমতকে যহমত করতে সক্ষম।
তিনি তো সেই সত্তা যিনি আসমান ও যমীনের একচ্ছত্র অধিকারী, ক্ষমতাধর। যার আদেশ সবকিছুর ওপর বিরাজমান। যার কোনো কাজ উদ্দেশ্যবিহীন নয়। আর কোনো আদেশ লংঘন হবার নয়। যার কোনো হুকুম পরিবর্তন হয় না। যার কোনো মন্ত্রী নেই, পরামর্শদাতা নেই। যার কোনো অসংগতি নেই, না আছে কোনো উদাহরণ। তার কোনো শরীক নেই। যার কোনো ছেলে সন্তান নেই, পিতা-মাতা নেই, কোনো বংশ নেই। নেই ভাই বেরাদার, যিনি সব সময় আছেন এবং থাকবেন। ফুলে খুশবু তারই দেয়া। আকর্ষণীয় দৃশ্যাবলী সব তারই সাজানো, চেহারার সৌন্দর্য তারই দান। স্বামী স্ত্রীতে, সন্তান ও পিতা মাতার মধ্যে মহব্বত ও ভালোবাসা তারই দান। ফলমূলের মধ্যে তিনি স্বাদ সৃষ্টি করেন, পাতার মধ্যে রং-বেরং সৃষ্টি, সমুদ্রে গতিবেগ তিনিই দান করেন। চাঁদ সুরুজের আলো, যবানের বাকশক্তি, চোখের দৃষ্টিশক্তি, কানের শ্রবণশক্তি, অন্তরের বুঝশক্তি, হাতের ধরার ক্ষমতা, পায়ের চলার ক্ষমতা, আর পেটের হজম ক্ষমতা তিনিই দান করেছেন। আমরা তার ওইসব অগণিত নেয়ামত তারই কাছ থেকে পেয়েছি। কিন্তু আমাদের অক্ষমতা সেরকমই যা ঐসব নেয়ামত পাওয়ার আগে ছিলো। কখনো তার অমুখাপেক্ষিতা শেষ হয়নি আর কখনও আমাদের অক্ষমতা দূর হয়েছে। সকলের বক্তব্য শ্রবণকারী, গুনাহগারদের দয়া প্রদর্শনকারী, কাউকে তার দয়া থেকে না মাহরুমকারী, বিপদগ্রস্তদের সাহায্যকারী, মৃতকে জীবন দানকারী, দূরের কাছের সকলের দোয়া শ্রবণকারী।
তিনি কে? যিনি তোমাদের প্রতি তোমাদের চেয়ে বেশী মেহেরবান? তিনি কে? যিনি তোমাদের মায়ের পেটে তোমাদের লালনকারী? তিনি কে? যিনি দুনিয়ার আগমন করার সাথে সাথে তোমাদের আহারের ব্যবস্থা করেন? তিনি কে? যিনি চোখ, কান নাক এবং যবান খুলে দেন। তিনি কে? যিনি তোমাকে খাবার খাওয়ান, পান করান, ঘুম দেন আর জাগিয়ে তোলেন? বিবি বাচ্চা বন্ধু বান্ধব কে দিয়েছে? আকাশ থেকে পানি বর্ষান, তাতে যমীন থেকে সবজি উদগীরণ করেন? যার অবস্থান আরশে তিনিই তো, যার হুকুম সব জায়গাতে প্রতিফলিত, যার রাজত্বি অদৃশ্য। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। তিনি অতিশয় দয়াবান, তিনি অতিশয় করুণাময় এবং বিশ্বের প্রতিপালক। তিনি একমাত্র এবাদত পাওয়ার একমাত্র উপযুক্ত।
হযরত আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, রসূল (স.) আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তাঁর পিছনে ছিলো চামড়ার তাঁবু। তিনি বলেছেন- শোনো, জান্নাতে কেবল সেই ব্যক্তিই যাবে যে মুসলমান আল্লাহর রসূলের অনুসারী। হে লোকেরা! শপথ করে বলো, আমি কি তোমাদের কাছে পয়গাম পৌঁছাইনি? আমরা সবাই বললাম, অবশ্যই (আপনি আপনার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছেন)। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো। তারপর বললেন, তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট যে, জান্নাতের এক চতুর্থাংশ সংখ্যা তোমরা হবে? সবাই বললো, জি হাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তাতে খুশী। তারপর বললেন, আচ্ছা, জান্নাতের এক তৃতীয়াংশ সংখ্যা যদি তোমরা হও, তাতে কি তোমার খুশী? আমরা সবাই সমস্বরে বললাম, জি হাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ। এবার তো আমরা আরো বেশী খুশী। তারপর বললেন, শোনো আল্লাহর কাছে আমার তামান্না বরং অবশ্যই আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, জান্নাতীদের সংখ্যা দু’ভাগ হবে। অর্ধেক তো হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত উম্মতের মুসলমানরা। আর অর্ধেক আমার উম্মতের লোক হবে। শোনো, তোমাদের ব্যতীত অন্য উম্মতদের মোকাবেলায় তোমাদের গণনায় এতোটাই কম যে, যেমন সাদা রংয়ের ষাঁড়ের শরীরের ওপর কিছু কালো চুল। প্রকাশ থাকে যে, একটা সাদা রংয়ের বলদের সাদা রংয়ের তুলনায় ঐ কালো রংয়ের চুল একেবারেই নগন্য। অনুরূপই তোমরা অন্য উম্মতদের মোকাবেলায় হবে। অর্থাৎ কুফফারদের তুলনায় মুসলমান হওয়ার কারণে খুবই কম হবে। কিংবা এভাবেও বলা যায় যে, কালো রংয়ের ষাঁড়ের মধ্যে এক গোছা কালো চুল।
রসূল (স.) আরো বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে বলবেন, হে আদম! হযরত আদম (আ.) বলবেন হাজির হে মহান আল্লাহ! আমার সৌভাগ্য যে, আমি আপনার আরো হুকুম পালনের জন্যে প্রস্তুত। এলাহী সকল কল্যাণ তোমারই হাতে রয়েছে। এরপর আল্লাহ তায়ালা বলবেন, উঠো, তুমি তোমার সন্তানদের মধ্য থেকে জাহান্নামীদের অংশ পৃথক করো। হযরত আদম আরজ করবেন কতো থেকে কতো? আল্লাহ তায়ালা বলবেন, প্রত্যেক হাজার থেকে ৯৯৯ জন। এটা ওই সময় হবে যখন বাচ্চা বুড়ো হয়ে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত ঘটবে। তুমি দেখতে পাবে লোকেরা উদ্ভ্রান্ত কিন্তু তারা মদের নেশায় আক্রান্ত নয়। বরং আল্লাহর আযাব বহু কঠিন। একথা শুনে সাহাবারা চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েন। তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে রসূল (স.)-কে প্রশ্ন করলো, হে আল্লাহর রসূল! প্রতি হাজারে ১ জনই নাজাত পাবে? আল্লাহ জানে সেই সৌভাগ্য কার অর্জন হয়? রসূল (স.) বললেন, হতাশা দূর করো, এবার তোমাদের একটা খোশখবরী শোনাবো, ইয়াজুজ মাজুজের এক হাজার আর তোমাদের একজন। এরপর নবী (স.) বললেন, শোনো- সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, আমার আকাংখা যে, জান্নাতের এক চতুর্থাংশ কেবল তোমরাই হবে। এবার সাহাবায়ে কেরামের অন্তর খুলে যায় তারা খুশী হয়ে যান। আল্লাহর হামদ ও সানা বয়ান শুরু করতে থাকেন। আর অকস্যাৎ যবান থেকে তাকবীর ধ্বনি বের হয়ে যায়। এরপর রসূল (স.) বললেন- তোমরা শোনো এবং সন্তুষ্ট হও, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আমার তো আকাংখা যে, তোমরা বরং বিশ্বাস করো যে, তামাম জান্নাতীদের মাঝে এক তৃতীয়াংশ তোমরা হবে। সাহাবারা একথা শুনে আরো বেশী হামদ ও তাকবীর ধ্বনি দিতে থাকেন। এরপর রসূল (স.) বললেন, সেই মহান সত্তার কসম! যিনি আমার জীবনের মালিক, আমার একান্ত বিশ্বাস যে, তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। অর্থাৎ অর্ধেক অন্যান্য উম্মত আর বাকি অর্ধেক কেবল আমার উম্মতরা হবেন। তোমাদের উদাহরণ হবে অন্য উম্মতদের তুলনায় যেমন কালো রংয়ের ষাঁড়ের মধ্যে সাদা রংয়ের পশমের ন্যায়। কিংবা চিহ্নিত পশুর সামনের পায়ের ওপরের পশম।

এই নেয়ামত এবং রহমত এখানে হবে আর ঐ অভিশাপ ও শাস্তি ওখানে হবে। এবার যে লোক যা ইচ্ছা আমল করুক। দু রাস্তাই খোলা আছে। জাহান্নামীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- হে কাফেররা এবং মোশরেকরা এবার নিজের অপকর্মের শাস্তি ভোগ করো। শোনো, এবার তোমাদের জন্যে শাস্তি আর শাস্তি বৃদ্ধি পেতে থাকবে। সাজার পর সাজা, কঠোর থেকে কঠোরতম হবে। এখন তোমরা অসীম দয়াবানের দয়া থেকে, অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলে। তাদের মোকাবেলায় আবার জান্নাতবাসী মানুষদের অবস্থা সম্পর্কে কুরআন বলছে-
অর্থাৎ ‘তারা সেখানে যা কিছু চাইবে সবই পাবে সবই তাদের জন্যে রয়েছে এবং আরো নেয়ামত বাড়িয়ে দেয়া হবে।’
মোটকথা, বড়োই কঠিন একটি দিন হবে কেয়ামতের দিন। কেউ পাবে শাস্তি, হবে গ্রেফতার, কেউ পাবে মুক্তি ও পুরস্কার।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY