আখেরী নবী মুহাম্মদ (স.) বলেন : আমি তোমাদেরকে দোযখের আগুনের ভয় দেখাচ্ছি।

0
40

খোতবা দানকালে আখেরী নবী মুহাম্মদ (স.) বলেন, আমি তোমাদেরকে দোযখের আগুনের ভয় দেখাচ্ছি, হে লোকেরা! জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার আমলের দিকে তোমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। এই কথা বলার সময় পিয়ারা নবীর আওয়ায অনেক উচ্চ ওঠে ছিলো। এমনকি আমার এখান থেকে বাজারের লোকদের কাছে পর্যন্ত সেই আওয়ায পৌঁছে যায়। বারবারই বলছিলেন, এমনকি তাঁর মনের জোশে এবং বক্তব্যের ধারভারে কাঁধের চাদর পায়ের ওপর গিয়ে পড়েছে। (হাকেম)

রসূল (স.) তাঁর এক খোতবায় বলেছেন, হে মুসলমানরা, আল্লাহ তায়ালা যে জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হতে ও লোভ করতে তোমাদের বলেছেন, সেই জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হও। সেই কাজগুলো অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে করো। আর যে জিনিসের প্রতি আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বিরত থাকতে বলেছেন এবং ভয় দেখিয়েছেন সেইসব জিনিস থেকে বিরত থাকো, দূরে থাকো। মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে তার শাস্তি ও আযাব এবং জাহান্নামের ভয় দেখিয়েছেন। তোমরাও সেগুলোকে ভয় করে চলো এবং সদাসর্বদা তাকে ভয় করে চলো। এবার আসো আমি তোমাদের জন্যে জাহান্নাম ও জান্নাতের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরি। যদি এক ফোঁটা জান্নাত তোমরা এ দুনিয়ায় পেতে তবে দুনিয়ার সবকিছু সুস্বাদু, আকর্ষণীয়, উত্তম জিনিসে পরিণত হয়ে যেতো। আর এক কনা জাহান্নাম যদি তোমাদের এ দুনিয়ায় পেতে তবে একথা বিশ্বাস করো যে অবশ্যই সারা দুনিয়ার কোনো কিছুই ব্যবহার করার আর উপযোগী থাকতো না। সবকিছু বিকৃত, নিকৃষ্ট নোংরা জিনিসে পরিণত হতো।
ভাইয়েরা আমার! কুরআনে কারীমে নবী করীম (স.)-কে নির্দেশ করেছে-
‘আমার বান্দাদের এ খবর দিয়ে দাও যে, আমি ক্ষমাকারী ও অতিশয় দয়াবান। সাথে সাথে এটাও জেনে রেখো যে, আমার আযাব তো বড়োই পীড়াদায়ক।
আহ! আল্লাহ তায়ালা জানেন আমাদের কী হলো? কি পরিমাণ আমাদের অন্তর শক্ত হয়ে গেছে। আমরা আমাদের গুনাহের দিকে একবারও চোখ তুলে তাকাই না। আর আল্লাহর আযাবের প্রতি একবারও ভ্রƒক্ষেপ করি না। দুনিয়াবী সামান্য কষ্টের কিংবা কোনো বিপদ দেখলে তো আমরা চোখের পানিতে গন্ড ভিজিয়ে ফেলি। কিন্তু দোযখের শাস্তির কথা মোটেও খেয়াল করি না। এ ব্যাপারে না আমাদের চোখের পানি ঝরে, না মনে কোনো দাগ কাটে।
ভাইয়েরা আমার! এখন বলুন কি বলবো, কেমন আছি? আর কেমন আছেন আপনারা। যাক গোটা দুনিয়া থেকে মূল্যবান ও উত্তম প্রিয় নবী আর একখানা খোতবা শুনুন।
একবার প্রিয় নবী মোহাম্মদ (স.) খোতবা দানকালে বলেন, হে আমার উম্মতেরা! খবরদার! দুটি বড়ো জিনিসকে ভুলো না। অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নামকে। একথা বলতেই প্রিয় নবীর চোখ থেকে ঝর ঝর করে পানি বের হতে থাকে। আল্লাহর ভয়ে তিনি এতোটাই কাঁদলেন যে, দু চোখের পানিতে নবীজীর দাড়ি মোবারক ভিজে গেছে। এরপর বললেন, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ আখেরাতের যেসব বিষয়ে আমার জানা আছে যদি তোমরা তা জানতে তবে তোমরা জঙ্গলে চলে যেতে এবং নিজের কপালে মাটি ঢালতে।
প্রিয় ভাইয়েরা আমার, আপনারা দেখতে পেলেন পিয়ারা নবীর কি অবস্থা ছিলো, কি পরিমাণ আল্লাহর ভয় ছিলো। আমরা আখেরাতের বিষয়টিকে যেন মন থেকে বের করে দিয়েছি। মেহেরবানীর পর মেহেরবানী অব্যাহত রয়েছে। আমরা নাফরমানীর পর নাফরমানী করেই চলছি। ডর, ভয়, শংকা, লোভ, ভালোলাগা, ভালোবাসা, স্বাদ-বিস্বাদ কিছুই নেই।
ভাইয়েরা আমার! আল্লাহর রহমতের আশা করুন, আকাংখা রাখুন। তার ভয়ানক আযাবের ভয় করুন। আপনাদের কি একথা খেয়াল ছিলো যে, আল্লাহর রসূল এবং রসূলগণের সরদার হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর নামাযে এই অবস্থা হতো। সাহাবা (রা.) বলেছেন-
অর্থাৎ নামায পড়ার সময়ে রসূল (স.) অঝোরে কাঁদতেন। আর কান্নার আওয়ায বন্ধ করার কারণে তাঁর বুকে সেটা ঘুরপাক খেতো এবং এমন গড়গড়া হতো যেন চাকা চলছে।
প্রিয় ভাইয়েরা আমার! মনে রাখবেন, নরম দিলে আল্লাহকে ভয় করে চোখের পানি বইয়ে রাব্বুল আলামীনের কাছে বিনয়ের সাথে কাকতি মিনতি করা, আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন। হাদীস শরীফে রয়েছেÑ একদিকে চোখ আল্লাহর ভয়ে পানি ঝরাচ্ছে, অপরদিকে সারা শরীর জাহান্নাম থেকে হারাম হয়ে যাচ্ছে। যে অপরাধের জন্যে আল্লাহর ভয়ে চোখের পানি ফেলছে তার ওপর কেয়ামতের দিন বেইজ্জতি ও কষ্ট হারাম হয়ে যাবে। চোখের এক একটি ফোঁটা আগুনের এক একটি পাহাড়কে নিভিয়ে দিচ্ছে। প্রিয় রসূল (স.) বলেন, আল্লাহর কাছে সেই রক্তবিন্দু অধিক পছন্দনীয় যা আল্লাহর জন্যে ঝরেছে।
আর সেই চোখের পানি যা আল্লাহর ভয়ে চোখ থেকে বের হয়। ভাইয়েরা আমার! নিজের দিলকে নরম করে ভীত কম্পমান, নিজের চোখকে কান্নায় ভিজিয়ে রাখো। তিরবানীর হাদীসে রয়েছেÑ দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুনে স্পর্শ করবে না, বরং জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যাবে। তার কারণ এই যে, বান্দাহ গভীর রাতে আল্লাহর ভয়ে কাঁদে এবং আল্লাহর পথে মুসলমানদের নিরাপত্তা পাহারায় সারারাত সজাগ থাকে।

প্রিয় নবী একবার তার প্রদত্ত খোতবায় জান্নাত জাহান্নাম এবং আল্লাহর ভয় সম্পর্কে বয়ান করেন। খোতবা শুনে উপস্থিত একজন সাহাবী (রা.) ডুফরে কাঁদতে শুরু করেন। রসূল (স.) বলেছেন, যদি আজকের এ সমাবেশে সকল মোমেন উপস্থিত থাকতো যাদের মাথার ওপর পাহাড়সম গুনাহর বোঝা আছে তবে এই ব্যক্তির কান্নার কারণে সকলকে ক্ষমা করে দেয়া হতো। কেননা তার কান্নায় ফেরেশতারাও কান্না শুরু করে দিয়েছে। তারা সবাই তার জন্যে দোয়া করছে। তারা এই দোয়াও করছে যে, যিনি কাঁদছেন আর যারা কাঁদছেন না তাদের সকলের গুনাহ মাফ করে দাও।
আপনারা দেখলেন যে, আল্লাহর ভয়ে কান্নার কি ফযিলত।
পাক কোরআনের একখানা আয়াত আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেন। আয়াতটি হলো-
হে ঈমানদাররা! তোমরা তোমাদের এবং তোমাদের পরিবারের লোকদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’
যখন এ আয়াতটি নাযিল হলো। তখন আয়াতখানা একদিন রসূল (স.) সাহাবাদের শুনালেন। এবং সেই জাহান্নামের ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যেখানে আল্লাহর একজন শক্তিশালী ফেরেশতা রয়েছেন। যিনি আল্লাহর হুকুম পালনে বিন্দুমাত্র কসুর করেন না। এবং যে হুকুম দেয়া হয় তা যথাযথ পালন করেন।
এই আয়াত শুনিয়ে বললেন, দোযখের আগুন তো এক হাজার বছর পর্যন্ত উত্তপ্ত করা হয়েছে। তারপর তা লাল রং ধারণ করে। এই লাল রঙের আগুন পুনরায় এক হাজার বছর পর্যন্ত জ্বালানো হয় তারপর সাদা রং ঃধদারণ করে। এরপর শুভ্র আগুনকে পুনরায় এক হাজার বছর পর্যন্ত জ্বালানো হয় তারপর তা কালো রং ধারণ করে। তার শিখা অনির্বাণ। এই হলো জাহান্নামের চিত্র এবং আল্লাহর শাস্তির বর্ণনা। এ বর্ণনা শুনে রসূলের সামনেই হাবশী এক সাহাবী বসা ছিলেন তিনি চিৎকার দিয়ে ওঠলেন। এবং বেলবেলিয়ে কান্না শুরু করে দিলেন। এমনকি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আ.) নাযিল হলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার সামনে ক্রন্দনকারী ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, এক হাবশী সাহাবী এবং নেক ব্যক্তি। হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আমি এসেছি আল্লাহ তায়ালার একখানা বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্যে এবং আপনার মাধ্যমে আপনার উম্মতকে জানানোর জন্যে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, আমার ইজ্জতের কসম! আমার জালালতের কসম! এবং আমার শ্রেষ্ঠত্বের কসম! যিনি আরশে আজীমে অধিষ্ঠিত আছেন। যে ব্যক্তি আমার ভয়ে কান্নাকাটি করবে। সদা সর্বদা তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসে হাসিমুখে রাখবো। এবার রসূল (স.) ঐ যুবকের কাছে আসেন। তার বুকের ওপর হাত রাখেন। দেখতে পেলেন বুকে হৃৎপিন্ড কাঁপছে। এবং শরীর জ্বরাক্রান্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর ভয় তার কলিজা যেন টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। পিয়ারা নবী (স.) বললেন, হে যুবক বলো- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। সে সাথে সাথে বললো, এরপর রসূল (স.) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। সাহাবারা বললেন, আমাদের মাঝে শুধু কি তিনি? জবাবে রসূল (স.) বললেন, তোমরা কি আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা শুনোনি- ‘এতো সেই ব্যক্তির জন্যে যে আমার সামনে দন্ডায়মান হতে ভয় রাখে মনে এবং আমার ভয় প্রদর্শন ও ধমকে সদা সর্বদা কম্পমান থাকে।’
আপনারা দেখতে পেলেন যে, আল্লাহর ভয় মনে রাখা আর আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করার কি মর্যাদা ও মর্তবা? তাই আমি বলবো যে পরিমাণ ভয় মনে পোষণ করবে ততোই আল্লাহর পিয়ারা বান্দা হতে পারবে। সুতরাং নিজের চোখকে কান্নার চোখ বানাও। কেয়ামতের দিন আসার আগ পর্যন্ত কাঁদতে থাকো। তা না হলে কেয়ামতের মাঝে যুগ যুগ ধরে কাঁদলেও কোনো ফায়দা হবে না।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY