আবু তালেব সমীপে কোরায়শ প্রতিনিধিদল:প্রতিরোধের বিভিন্ন ধরন।

0
46

কোরায়শরা যখন দেখতে পেলো, মোহাম্মদ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাবলীগে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখার কেন পন্থাই কাজে আসছে না, তখন তারা নতুন করে চিন্তা করে এবং তাঁর দাওয়াতের মূলোৎপাটনের জন্যে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। সে পন্থা পদ্ধতির সারাৎসার নিুরূপ-

প্রথম ধরন

রসূলুল্লাহ (স.)-এর দাওয়াত প্রতিরোধে কাফের মোশরেকদের গৃহীত প্রথম পন্থা পদ্ধতি ছিলো, তাকে হাসি-ঠাট্টা, বিদ্রুপ-উপহাস এবং মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা। এর উদ্দেশ্য ছিলো মুসলমানদের মনোবল ভেংগে দেয়া। এ লক্ষ্য অর্জনে মোশরেকরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অহেতুক অপবাদ এবং গালাগালের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। কখনো কখনো তারা তাকে পাগল বলতো। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর ওসব কাফেররা বললো, যার ওপর যেকের (কোরআন) নাযিল হয়েছে, নিশ্চয়ই সে একটা পাগল।’ (৬-১৫)

কখনো কখনো তাঁর ওপর যাদুকর এবং মিথ্যাবাদী হওয়ার অপবাদ দেয়া হতো। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ওরা বিস্ময়বোধ করছে, ওদের কাছে ওদেরই মধ্য থেকে একজন সতর্ককারী এসেছে এবং কাফেররা বলে, এ তো এক যাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী।’ (৪-৩৮)

কাফেররা আল্লাহর রসূলের সামনে দিয়ে পেছন দিয়ে ক্রুীভাবে চলাচল করতো এবং রোষ কষায়িত চোখে তাঁর প্রতি তাকাতো। এ সম্পর্কেআল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কাফেররা যখন কোরআন শ্রবণ করে তখন তারা যেন তাদের তীক্ষè দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছড়ে ফেলবে এবং তারা বলে, এ তো নিশ্চিত পাগল।’ (৫১-৬৮)

নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোথাও যেতেন এবং তাঁর আশেপাশে দুর্বল ও অত্যাচারিত সাহাবায়ে কেরাম থাকতেন, তখন তাদের দেখে মোশরেকরা ঠাট্টা করে বলতো, ‘আচ্ছা, এরাই কি তারা, আমাদের মধ্যে থেকে যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেন?’ (৫৩, ৬)

তাদের এ উওরের জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ কি কৃতজ্ঞ লোকদের সমন্ধে সবিশেষ অবহিত নন?’ (৫৩, ৬)

কোরআনে সাধারণভাবেআল্লাহ তায়ালা কাফেরদের অবস্থার নিুরূপ চিত্র অথন করেছেন-

‘যারা অপরাধী তারা মোমেনদের উপহাস করতো এবং ওরা যখন মোমেনদের কাছ দিয়ে যেতো, তখন চোখ টিপে ইশারা করতো এবং যখন ওদের আপনজনের কাছে ফিরে আসতো, তখন ওরা ফিরতো উৎফুল্ল হয়ে এবং যখন তাদের দেখতো, তখন বলতো, ওরা তো পথভ্রষ্ট। অথচ তাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠানো হয়নি।’ (২৯, ৩৩, ৮৩)

দ্বিতীয় ধরন

কাফের মোশরেকদের  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত প্রতিরোধের দ্বিতীয় ধরন পীতি ছিলো, তাঁর শিক্ষাকে বিকৃত করা, সন্দেহ অবিশ।াস সৃষ্টি করা, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করা, দ্বীনের শিক্ষা এবং দ্বীনী ব্য৩িত্বদের নিরর্থক বিতর্কের লক্ষ্যবস্তু বানানো। তারা এসব কাজ এতো বেশী করতো যাতে জনসাধারণ  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করার সুযোগই না পায়। অতএব মোশরেকরা পবিত্র কোরআন সম্পর্কে বলতো, ‘এগুলো তো পূর্ববর্তীদের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে, এখন এগুলো সকাল সন্ধ্যা তার কাছে পাঠ করা হয়।’ (৫, ২৫)

‘এটা মিথ্যা ব্যতীত কিছুই নয়, যা সে গড়ে নিয়েছে এবং কিছু লোক তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে।’ (৪, ২৫)

মোশরেকরা এ কথাও বলতো, ‘এ কোরআন তো তাকে শিক্ষা দেয় একজন মানুষ।’ (১০৩, ১৬)

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর তাদের অভিযোগ ছিলো, ‘এ কেমন রসূল, যে আহার করে এবং হাটে বাজারে চলাফেরা করে।’ (৭, ২৫)

কোরআন শরীফের বহু জায়গায় মোশরেকদের অভিযোগসমূহ খন্ডন করা হয়েছে, কোথাও কোথাও তাদের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কোথাও কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।

তৃতীয় ধরন

মোশরেকদের রসূল (স.)-এর দাওয়াত প্রতিরোধের তৃতীয় ধরণ হচ্ছে, কোরআনকে পূর্ববর্তী লোকদের কাহিনীর সাথে তুলনা করা এবং মানুষকে তাতেই ফাঁসিয়ে রাখা। অতএব নযর ইবনে হারেস একবার কোরায়শদের বললো, হে কোরায়শরা, আল্লাহর শপথ, তোমাদের ওপর এমন আপদ এসে পড়েছে, তোমরা এখনো তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার কোনো উপায় বের করতে পারোনি। মোহাম্মদ তোমাদের মধ্যে বড়ো হয়েছেন, তোমাদের সবচেয়ে পছন্দনীয় মানুষ ছিলেন, সবার চেয়ে বেশী সত্যবাদী এবং সবচেয়ে বড় আমানতদারও ছিলেন। আজ তার কানের কাছে চুল যখন সাদা হয়েছে, তখন তিনি তোমাদের কাছে কিছু কথা নিয়ে এসেছেন। অথচ তোমরা বলছো, তিনি যাদুকর।আল্লাহর শপথ, তিনি যাদুকর নন। আমি যাদুকর ও তাদের যাদুটোনা এবং ঝাড় ফুঁক দেখেছি। তোমরা বলছো, তিনি গণক জ্যোতিষী, না, তিনি তাও নন। আমি গণক জ্যোতিষীদেরও দেখেছি। তাদের উল্টাপাল্টা আচরণও দেখেছি। তোমরা বলছো, তিনি কবি, আল্লাহর শপথ, তিনি কবিও নন। আমি কবিদের দেখেছি, তাদের কবিতা শুনেছি। তোমরা বলছো, তিনি পাগল, না, আল্লাহর শপথ, তিনি পাগলও নন। আমি পাগল এবং পাগলের পাগলামিও দেখেছি। তাঁর মধ্যে পাগলামির কোনো প্রকার চিহ্ননেই। হে কোরায়শের লোকেরা, তোমরা গভীরভাবে চিন্তা করো, তোমাদের ওপর বিরাট আপদ এসে পড়েছে।’

এরপর নযর ইবনে হারেস হীরায় গিয়ে সেখানে বাদশাহদের বিভিন্ন ঘটনা এবং রুস্তম ও এসফানদিয়ারের কাহিনী শিখে মক্কায় ফিরে আসে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো মজলিসে বসে আল্লাহর কথা বলতেন এবং তাঁর পাকড়াও সম্পর্কে লোকদের ভয় দেখাতেন, তখন সে ওখানে গিয়ে লোকদের বলতো, আল্লাহর শপথ, মোহাম্মদের কথা আমার কথার চেয়ে ভালো নয়। এরপর সে পারস্যের বাদশাহদের এবং রুস্তম ও এসফানদিয়ারের কাহিনী শোনাতো। এরপর বলতো, কিসে মোহাম্মদের কথা আমার কথার চেয়ে ভালো হবে?

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা থেকে এ কথাও জানা যায়, নযর ইবনে হারেস কয়েকজন দাসী ক্রয় করে রেখেছিলো। যখন সে কোনো মানুষ সম্পর্কে শুনতো, সে নবী করীম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আকৃষ্ট রয়েছে, তখন তার ওপর একজন দাসীকে লেলিয়ে দিতো। দাসী সে লোককে পানাহার করাতো, গান শোনাতো। এক পর্যায়ে সে লোকের ইসলামের প্রতি কোনো আকর্ষণ অবশিষ্ট থাকতো না। এ প্রসংগে আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেন, ‘কিছু লোক এমন রয়েছে, যারা ক্রীড়া কেথতুকের কথাবার্তা ক্রয় করে, যাতে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরানো যায়।

চতুর্থ ধরন

মোশরেকদের রসূল (স.)-এর দাওয়াত ও তাঁকে প্রতিরোধের চতুর্থ ধরন পীতি ছিলো অপপ্রচার। যার মাধ্যমে তাদের প্রচেষ্টা ছিলো, ইসলাম এবং জাহেলিয়াত মাঝপথে একটি আরেকটির সাথে মিশে যাবে। যার সারকথা হচ্ছে, কিছু লও আর কিছু দাও- এ মূলনীতিতে আল্লাহর রসূল মোশরেকদের কিছু কথা গ্রহণ করবেন এবং পেথত্তলিকরাও তাঁর কিছু কথা গ্রহণ করবে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে এ সম্পর্কে বলেন, ‘ওরা চায়, আপনি নমনীয় হবেন, তাহলে তারাও নমনীয় হবে।’ (৯, ৬৮)

ইবনে জরীর এবং তাবারানীর এক বর্ণনায় রয়েছে, মোশরেকরা আল্লাহর রসূলের কাছে প্রস্তাব পেশ করে, এক বছর তিনি তাদের উপাস্যদের উপাসনা করবেন, আর এক বছর তারা তাঁর প্রভুর উপাসনা করবে। আবদ ইবনে হোমায়দের এক বর্ণনায় রয়েছে, মোশরেকরা বললো, আপনি যদি আমাদের উপাস্যদের মেনে নেন, তবে আমরাও আপনার আল্লাহর এবাদাত করবো।

ইবনে ইসহাক বলেন,  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা ঘরের তাওয়াফ করছিলেন। এ সময় আসওয়াদ ইবনে মোত্তালেব ইবনে আসাদ ইবনে আবদুল ওযযা, ওলীদ ইবনে মুগীরা, উমাইয়া ইবনে খালফ ও আস ইবনে ওয়ায়েল ছাহমী তাঁর কাছে আসে। তারা ছিলো নিজ নিজ গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি। তারা বললো, এসো মোহাম্মদ, তুমি যার পূজা করছো, আমরা তার পূজা করবো। আর আমরা যাকে পূজা করছি, তুমিও তার পূজা করবে। এতে তুমি এবং আমরা এ কাজে সমঅংশীদার হবো। যদি তোমার মাবুদ আমাদের মাবুদের চেয়ে ভালো হন তবে আমরা তার কাছ থেকে কল্যাণ লাভ করবো আর যদি আমাদের মাবুদ তোমার মাবুদের চেয়ে ভালো হন তবে তুমি তার কাছ থেকে কল্যাণ লাভ করবে। তাদের কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা ‘সূরা কাফেরূন’ নাযিল করেন। এতে ঘোষণা করা হয়, ‘হে কাফেররা, তোমরা যাদের উপাসনা করো আমি তাদের উপাসনা করতে পারি না।

এ সিন্ধান্তমূলক জবাবের মাধ্যমে মোশরেকদের হাস্যকর বক্তব্যের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। রেওয়ায়াতসমূহের বিভিন্নতার সাম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, এ ধরনের প্রতারণাপূর্ণ চেষ্টা বার বার করা হয়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY