রাখাল থেকে রাজা: দাউদ (আ.)

0
76

হযরত ঈসা (আ.) এর আবির্ভাবের এগার শত বছর আগে বণী ইসরাইলীরা মুসা (আ.) এর দেখানো সৎ পথ ভুলে গিয়ে পাপ পথ শিরক ও বেদায়াতে লিপ্ত হয়। তারা অন্যায় কার্য-কলাপ সীমা অতিক্রম করে গেলে আল্লাহ তায়ালা তাদের শত্র“দেরকে তাদের উপর বিজয়ী করে দেন। শত্র“ পক্ষ ফিলিস্তিনীরা তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করে ও অসংখ্য লোক বন্দী করে নিয়ে যায়। আর বহু শহর তারা দখল করে নেয়। এমনকি শত্র“রা তাদের বিজয়ের চাবিকাঠি-তাদের কাছে রক্ষিত বিশেষ সিন্দুকটি নিয়ে যায়। আমালেকা সম্রাট জালুত বণী ইসরাইলীদের উপর এই ধংসযজ্ঞ চালায়। বণী ইসরাইলীরা পরাজয়ের গ্লানি মোচন ও অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সে সময়ের নবী হযরত শামুয়েল (আ.) এর কাছে একজন বাদশাহ নিযুক্ত করার প্রার্থনা জানান। হযরত শামুয়েল (আ.) তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, তারা যেন যে কোন অবস্থায় নব নিযুক্ত বাদশাহর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে। বণী-ইসরাইলীরা এ কথায় সম্মত হয়।

শামুয়েল নবী তাদের অঙ্গীকারে বিশ্বাসী হয়ে তাদের বাদশাহ হিসাবে তালুতের নাম ঘোষণা করলেন। তালুতে ছিলেন গরীব, তিনি রাজকীয় পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেননি। তিনি লেখাপড়া শিখে বণী ইসরাইলীদের মধ্যে বড় জ্ঞানীরূপে খ্যাতি লাভ করেন। তালুত দেখতেও ছিলেন খুব সুন্দর। একদিন যুবক তালুত তার বাবার হারানো গাধার খোঁজে বের হয়ে ছিলেন। পথে যখন তিনি শামুয়েল নবীর বাড়ির সামনে এসে পৌঁছলেন তখন আল্লাহ তাঁকে ইঙ্গিত করেন যে, এই ব্যক্তিকেই আমি বণী ইসরাইলীদের বাদশাহ নিযুক্ত করেছি। হযরত শামুয়েল নবী ইসরাইলীদেরকে ডেকে তালুতকে তাদের রাজা হিসেবে ঘোষণা করলেন। যেহেতু তালুত কোনও রাজবংশ বা ধনী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেননি, তাই বণী ইসরাইলীগণ প্রথমে তাঁকে রাজা হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। আবার কেউ কেউ বলেন-তিনি একজন রাখাল ছিলেন। অবশ্য পরে নবীর আদেশক্রমে তাঁর রাজা সুলভ নিদর্শন দেখে তারা তাঁকে রাজা হিসেবে মেনে নেয়।

তালূত আশি হাজার সৈন্য নিয়ে জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেন। তালূত সৈন্যদেরকে পরীক্ষ করতে চাইলেন কারা কঠিন সময় টিকে থাকতে পারবে। এ সময় ছিল খুবই গরম, কঠিন পিপাসায় তারা পানি প্রার্থনা করল। যাত্রা পথের এক মনজিল অতিক্রমের পর দ্বিতীয় মনজিলে যখন তারা উপস্থিত হন তখন সামনে একটি নির্ঝর লক্ষ্য করে নবী সকলকে বললেন, “আল্লাহ এই পানি দ্বারা তোমাদের ঈমান ও ধৈর্য পরীক্ষা করবেন। তোমরা যেন কেউ পানি পান না কর, যে করবে সে আমার দলভুক্ত নয়। তবে যে ব্যক্তি এক অঞ্জলি পরিমাণ পান করবে সে অপরাধী হবে না।” কিন্তু তাদের সামান্য কয়েকজন ছাড়া বাকী সবাই প্রচুর পানি পান করল। যারা পানি পানে সীমা অতিক্রম করল তারা নদী পার হতে পারল না।

অতি অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তালুত আমালেক দেশে পৌঁছে জালুত ও তাঁর সেনা বাহিনীর সম্মুখীন হলেন। তালুতের অল্প সংখ্যক সৈন্য জালুতের বিরাট বাহিনী দেখে ভীত হয়ে পড়ল। তারা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাল, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ধৈর্য ধারণের বিপুল শক্তিদান করুন, আমাদের পদক্ষেপ সুদৃঢ় করুন এবং কাফেরদের উপর আমাদের বিজয় দান করুন।”

এ সময় দাউদ (আ.) অতি অল্প বয়স্ক এক যুবক ছিলেন। তিনি তাঁর বড় ভাইয়ের মেষ চড়াতেন। এ সময় শামুয়েল নবীর কাছে অহী আসে যে দাউদ নামক একজন যুবক আছে তার হাতে জালুতের মৃত্যু নির্দিষ্ট হয়েছে। নবী খোঁজ করে যুবক দাউদেকে বের করলেন। তিনি দাউদের পিতার কাছে থেকে অনুমতি নিয়ে তাঁকে সাথে নিয়ে আসেন। নবী তাঁকে নিজ বর্ম ও যুদ্ধাস্ত্র প্রদান করলে তিনি তা গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন, কারণ তিনিতো রাখাল মাত্র; এসব যন্ত্র চালানোর প্রয়োজনীয় কোনও জ্ঞানতো তাঁর নেই। তিনি নদী থেকে পাঁচটি পাথর খণ্ড তুলে নিলেন, যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন জালুত বলল, যে আমাকে হত্যা করবে সে আমার রাজত্ব ও বাদশাহী পাবে। হযরত দাউদ (আ.) অহংকারী জালুতের দিকে ঐ সকল পাথর নিক্ষেপ করেন। জালুত ঐ পাথরের আঘাতে নিহত হয়, এই ঘটনায় তিনি সমগ্র ইসরাইলীদের নিকট অত্যন্ত প্রিয় পাত্র হয়ে পড়লেন। তালুত নিজের কন্যা তাঁর নিকট বিবাহ দিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনিই ইসরাইলীদের নেতা ও শাসক হলেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY