নবুয়তের চতুর্থ বছরে ইসলামের দাওয়াত প্রকাশ্যে জনসাধারণের: যুলুম নির্যাতন

0
62

যুলুম নির্যাতন
নবুয়তের চতুর্থ বছরে ইসলামের দাওয়াত প্রকাশ্যে জনসাধারণের দৃষ্টিতে এলে তা দমানোর জন্যে মোশরেকরা যেসব কাজ করেছে তার আলোচনা ইতিপূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। এসব অপতৎপরতা মোশরেকরা পর্যায়ক্রমে এবং ধীরে ধীরে চালিয়েছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস এর আগে অগ্রসর হয়নি এবং যুলুম অত্যাচারও শুরু করেনি, কিন্তু তারা যখন দেখলো, তাদের তৎপরতা ইসলামী দাওয়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তারা পুনরায় সমবেত হয়ে কোরায়শ সর্দারদের নিয়ে পঁচিশ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটির প্রধান ছিলো রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের চাচা আবু লাহাব। এ কমিটি পারস্পরিক পরামর্শ ও চিন্তা-ভাবনার পর রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের বিরুীে একটি সিন্ধান্তমূলক প্রস্তাব অনুমোদন করে। তা হচ্ছে, ইসলামের বিরোধিতা, নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের বিভিন্নভাবে যুলুম নির্যাতনে যেন কোনো প্রকার ত্র“টি অবশিষ্ট রাখা না হয়।
মোশরেকরা এ প্রস্তাব গ্রহণ করার পর তা বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে। মুসলমান বিশেষত দুর্বল মুসলমানদের ক্ষেত্রে মোশরেকদের সিন্ধান্ত বাস্তবায়ন অনেক সহজ ছিলো, কিন্তু রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের তা ছিলো খুবই কঠিন। কেননা তিনি ছিলেন অনন্য ব্য৩িত্বের অধিকারী এক অসাধারণ মানুষ। দোস্ত দুশমন সবাই তাঁকে সন্মানের চোখে দেখতো। সন্তসজনকভাবেই তাঁর সামনাসামনি হওয়া যেতো। তাঁর বিরুীে কোনো হীন নীচ আচরণ প্রদর্শনের দুঃসাহস আহমক নির্বোধরাই করতে পারতো। ব্য৩িত্বের এ স্বাতন্ও ছাড়া আবু তালেবের সাহায্যও তিনি পাচ্ছিলেন। আবু তালেব মক্কার হাতেগোনা সেসব লোকের অন্তর্ভুক্ত এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক থেকে এমন মর্যাদার অধিকারী ছিলেন, যাতে তাকে ডিংগিয়ে তার বংশের লোকদের ওপর হাত তোলার সাহস কারো ছিলো না। এ পরিস্থিতিতে কোরায়শরা নিদারুণ মর্মপীড়ার মধ্যে দিন যাপন করছিলো, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে দ্বীনের প্রচার প্রসার তাদের ধর্মীয় আধিপত্য এবং পার্থিব নেতৃত্ব কর্তৃত্বের শেকড় কেটে দিচ্ছিলো, সে দ্বীনের ব্যাপারে আর কতোকাল তারা ধৈর্য ধারণ করবে? পরিশেষে মোশরেকরা আবু লাহাবের নেতৃত্বে নবী মোহাম্মদ সালল্লালহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালাতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে তাঁর সাথে আবু লাহাবের আচরণ প্রথম দিন থেকেই এ রকমই ছিলো, যখন কোরায়শরা তাঁর ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালানোর কথা চিন্তাও করেনি। বনী হাশেমের মজলিস এবং সাফা পাহাড়ের ওপর এই দুর্বৃত্ত যে আচরণ বলেছিলো, ইতিপূর্বে কথা আলোচিত হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে, তাঁকে হত্যার উদ্দেশে আবু লাহাব সাফা পাহাড়ের ওপর একটি পাথরও ছুঁড়েছিলো।
নবুয়ত পাওয়ার আগে আবু লাহাব তার দুই পুত্র ওতবা এবং ওতায়বাকে রসূল সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের দুই কন্যা রোকায়া এবং উম্মে কুলসুমের সাথে বিয়ে দিয়েছিলো, কিন্তু তিনি নবুয়ত পাওয়ার পর সে অত্যন্ত কঠোরতা এবং রূঢ় আচরণের মাধ্যমে নবীর তাদের তালাক দিতে তার পুত্রদ্বয়কে বাধ্য করে।
নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের দ্বিতীয় পুত্র আবদুল্লাহর ইন্তেকালের পর আবু লাহাব এতো খুশী হয়েছিলো যে, তার বন্ধুদের কাছে দেথড়ে তাদের সুসংবাদ শুনিয়েছিলো, মোহাম্মদ নির্বংশ হয়ে গেছে।
ইতিপূর্বে এও উল্লেখ করা হয়েছে, হথ মেথসুমে আবু লাহাব নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে বাজার এবং বিভিন্ন জনসমাবেশে তাঁর পেছনে লেগে থাকতো। তারেক ইবনে আবদুলল্লাহ মোহারেবীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, আবু লাহাব নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামকে শুধু মিথ্যা প্রতিপন্ন করতেই ব্যস্ত থাকতো না; বরং তাঁকে পাথরও নিক্ষেপ করতো। এতে তাঁর পায়ের গোড়ালি রক্তাক্ত হয়ে যেতো।
আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল, যার প্রকৃত নাম আরওয়া, সে ছিলো হারব ইবনে উমাইয়ার কন্যা এবং আবু সুফিয়ানের বোন, সেও নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের শএুতায় তার স্বামীর চেয়ে পেছনে ছিলো না। সে নবী করীম (স.)-এর চলাচলের পথে এবং দরজায় কাঁটা ছড়িয়ে রাখতো। সে ছিলো  অত্যান্ত অশ্লীলভাষায় এবং ঝগড়াটে। নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামকে গালাগাল দেয়া এবং কূটনামি, নানা ছুতোয় ঝগড়া, ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি এবং সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা ছিলো তার কাজ। এ কারণে কোরআন তাকে লাকড়ি বহনকারিণী বলে অভিহিত করে।’
আবু লাহাবের স্ত্রী যখন জানতে পারলো, তার এবং তার স্বামীর নিন্দা করে কোরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে, তখন সে রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের খোঁজে বের হয়। তিনি সে সময় কাবা ঘরের কাছে মাসজিদে হারামে অবস্থান করছিলেন। তাঁর সাথে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-ও ছিলেন। আবু লাহাবের স্ত্রীর হাতে ছিলো এক মুঠি পাথর। সে রসূলুল্লাহ (স.)-এর সামনা সামনি হলে আল্লাহ তায়ালা তার দৃষ্টি কেড়ে নেন, সে তাঁকে দেখতে পায়নি। হযরত আবু বকরকে দেখতে পাচ্ছিলো। তাঁর সামনে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো, তোমার সাথী কোথায়? আমি শুনেছি সে আমার নামে নিন্দাবাদ করে। আল্লাহর শপথ, যদি আমি তাকে পেয়ে যাই তবে তার মুখে এ পাথর ছুঁড়ে মারব। দেখো, আল্লাহর শপথ, আমিও একজন কবি। এরপর সে এ কবিতা শোনায়, ‘মোযাম্মামান-১৯ ‘আছাইনা ওয়া আমরাহু আবাইনা ওয়া দ্বীনাহু কালাইনা’। অর্থাৎ আমি মোযাম্মের অবাধ্যতা করেছি, তার আদেশ অমান্য করেছি এবং ঘৃণা ও অবজ্ঞাভরে তার দ্বীন প্রত্যাখ্যান করেছি। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বললেন, ইয়া রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম, সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি? তিনি বললেন, না, সে আমাকে দেখতে পায়নি, আল্লাহ তায়ালা তার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন।
আবু বকর বাযযারও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি এটুকু অতিরি৩ সংযোজন করেছেন, আবু লাহাবের স্ত্রী যখন হযরত আবু বকরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন সে একথাও বলেছিলো, আবু বকর, তোমার বন্ধু আমার নিন্দাবাদ করেছে। আবু বকর বললেন, না, এ ঘরের প্রভুর শপথ, তিনি কবিতা রচনা করেন না এবং কবিতা মুখেও উচ্চারণ করেন না। এ কথায় আবু লাহাবের স্ত্রী বললো, তুমি ঠিকই বলেছো। আবু লাহাব ছিলো রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের প্রতিবেশী এবং চাচা। তার ঘর রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের ঘরের কাছাকাছি ছিলো। তবু সে রসূল (স.)-এর সাথে এ ধরনের আচরণ করতো। আবু লাহাবের মতো অন্য প্রতিবেশীরাও তাঁকে কষ্ট দিতো।
ইবনে ইসহাক বলেন, যেসব লোক রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামকে ঘরের মধ্যে কষ্ট দিতো তাদের নাম হলো, আবু লাহাব, হাকাম ইবনে আবুল আস ইবনে উমাইয়া, ওকবা ইবনে আবু মোয়ায়ত, আদী ইবনে হামরা ছাকাফী, ইবনুল আছদা হোযালী প্রমুখ। এরা সবাই ছিলো তাঁর প্রতিবেশী।
এদের মধ্যে হাকাম ইবনে আবুল আস ব্যতীত অন্য কেউ মুসলমান হয়নি। তাদের রসূল (স.)-কে কষ্ট দেয়ার পীতি ছিলো, যখন তিনি নামায আদায় করতেন তখন তাদের কেউ বকরীর নাড়িভুঁড়ি খুঁজে এমনভাবে ছুঁড়ে মারতো, যা সোজা গিয়ে তাঁর গায়ে পড়তো। আবার উনুনের ওপর হাঁড়ি চাপানো হলে বকরীর নাড়িভুঁড়ি এমনভাবে নিক্ষেপ করতো, যা সোজা গিয়ে হাঁড়িতে পড়তো। রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম পরে নিরাপদে নামায আদায়ের জন্যে বাধ্য হয়ে ঘরের ভেতর জায়গা করে নিয়েছিলেন, যাতে নামায পড়তে অত্যান্ত তাদের অত্যাচার থেকে বেঁচে থাকতে পারেন।
রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের ওপর নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপের পর তিনি সেূলো একটি কাঠির মাথায় নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘হে বনী আবদে মানাফ, এটা কেমন ধরনের প্রতিবেশীসুলভ ব্যবহার? এরপর তা পথে ফেলে দিতেন।’
ওকবা ইবনে আবু মোয়ায়ত ছিলো জঘন্য দুর্বৃত্ত ও দুষ্কৃতিতে সবার চেয়ে অগ্রগামী। সহীহ বোখারীতে হযরত আবদুলল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সালল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা ঘরের পাশে নামায আদায় করছিলেন। আবু জাহল এবং তার কয়েকজন বন্ধু সেখানে বসে ছিলো। এমন সময় একজন অন্যজনকে বললো, কে আছো, অমুকের উটের নাড়িভুঁড়ি এনে মোহাম্মদ যখন সাজদায় যাবে, তখন তার পিঠে চাপিয়ে দেবে? এরপর গোত্রের সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি ওকবা ইবনে আবু মোয়ায়ত ২৩ উটের নাড়িভুঁড়ি এনে অপেক্ষা করতে লাগলো। নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাজদায় যাওয়ার পর সেই নাড়িভুঁড়ি তাঁর উভয় কাঁধের মাঝখানে রেখে দেয়। আমি সব কিছু দেখছিলাম, কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম না। হায়, যদি আমার তাঁকে রক্ষা করার শান্তি থাকতো।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, এরপর দুর্বৃত্তরা হাসতে হাসতে একজন অন্যজনের গায়ে ঢলে পড়ছিলো। এদিকে রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাজদায় পড়ে রইলেন, মাথা তুললেন না। ইতিমধ্যে হযরত ফাতেমা (রা.) খবর পেয়ে ছুটে এসে নাড়িভুঁড়ি সরিয়ে ফেললে তিনি সাজদা থেকে মাথা তোলেন। এরপর তিন বার বললেন, ‘আল্লাহুম্মা আলাইকা বে-কোরায়শ’। অর্থাৎ হে আল্লাহ তায়ালা, কোরায়শদের পাকড়াও করো। এ বদদোয়া তাদের দুক্ষিত ফেলে। কেননা তারা বিশ্বাস করতো, এ শহরে দোয়া কবুল হয়ে থাকে। এরপর রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাম ধরে ধরে বদদোয়া করলেন, হে আল্লাহ, আবু জাহলকে পাকড়াও করো। ওতবা ইবনে রবিয়া, শায়বা ইবনে রবিয়া, ওলীদ ইবনে ওতবা, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং ওকবা ইবনে আবু মোয়ায়তকেও পাকড়াও করো।’
রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সপ্তম জনের নামও বলেছিলেন, কিন্তু বর্ণনাকারী সে নাম ভুলে গেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, সে সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব কাফেরের নাম উচ্চারণ করে বদদোয়া করেছিলেন, বদরের কুয়ায় তাদের সবার লাশ পড়ে থাকতে আমি দেখেছি।
উমাইয়া ইবনে খালফের অভ্যাস ছিলো, সে যখনই রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতো তখনই নানা কটূউক্তি করতো এবং অভিশাপ দিতো। আল্লাহ তায়ালা তার সম্পর্কেই ‘ওয়ায়লুল লেকুলি– হুমাযাতিল লুমাযাহ’ আয়াত নাযিল করেন। অর্থাৎ দুর্ভোগ তার জন্যে, যে পেছনে ও সামনে লোকের নিন্দা করে। ইবনে হেশাম বলেন, ‘হুমাযা’ সে ব্যাক্তি, যে প্রকাশ্যে গালাগাল দেয় এবং চোখ বাঁকা করে ইশারা করে আর ‘লুমাযা’ সে, যে পশ্চাতে মানুষের নিন্দা করে এবং কষ্ট দেয়।
উমাইয়ার ভাই উবাই ইবনে খালফ ছিলো ওকবা ইবনে আবু মোয়ায়তের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওকবা একদিন নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের কাছে বসে ইসলামের কিছু কথা শুনেছিলো। উবাই একথা শুনে ওকবাকে কিছু কোমল কঠোর কথা বলে, তিরস্কার করে এবং তাকে রসূলুল্লাহ (স.)-এর মুখে থুতু নিক্ষেপ করে আসার নির্দেশ দেয়। ওকবা তাই করে। উবাই ইবনে খালফ একবার একটি পুরনো হাড় গুঁড়ো করে তা বাতাসে ফুঁ দিয়ে দিয়ে নবী রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের প্রতি উড়িয়ে দেয়।
আখনাস ইবনে শোরায়ক ছাকাফীও রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামকে কষ্টদাতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কোরআন করীমে তার নয়টি বদভ্যাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই তার কর্মকান্ড সম্পর্কে ধারণা করা যায়। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, ‘এবং অনুসরণ করো না তার, যে কথায় কথায় শপথ করে, পশ্চাতে নিন্দাকারী, একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়, কল্যাণের কাজে বাধা প্রদান করে, সীমালংঘনকারী, পাপিষ্ঠ, রূঢ় স্বভাব, তদুপরি জারজ।’ (১০-১৩, ৬৮)
আবু জাহল কখনো কখনো রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের কাছে এসে কোরআন শুনতো, কিন্তু শোনা পর্যন্তই শেষ, ঈমান আনতো না, তাঁর আনুগত্য করতো না এবং তাঁকে সন্মান মর্যাদা করতো না। তার আচার আচরণে মনে হতো, সে যেন কোনো উল্লেখযোগ্য কর্ম সম্পন্ন করে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে ফেলেছে। পবিত্র কোরআনের নিুো৩ আয়াতসমূহ আল্লাহ তায়ালা তার সম্পর্কেই নাযিল করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘সে সদকা দেয়নি এবং নামায আদায় করেনি, বরং মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এরপর সে দম্ভভরে তার পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে গেছে। দুর্ভোগ, তোমার জন্যে দুর্ভোগ। (৩১-৩৫, ৭৫)
আবু জাহল প্রথম দিনই নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামকে নামায আদায় করতে দেখে তাঁকে এ থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করে। একবার তিনি মাকামে ইবরাহীমের কাছে নামায আদায় করছিলেন। আবু জাহল সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। সে বললো, মোহাম্মদ, আমি কি তোমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করিনি? সাথে সাথে সে হুমকিও দেয়। নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামও হুমকি দিয়ে জবাব  দেন। এরপর আবু জাহল বললো, মোহাম্মদ, আমাকে কিসের ধমক দিচ্ছো? দেখো, এ উপত্যকায় (মক্কায়) আমার মজলিস হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো। আবু জাহলের উীত কথায় আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাযিল করেন, ‘আচ্ছা, সে তার মজলিসওয়ালাদের ডাকুক (আমিও শাস্তির ফেরেশতাদের ডাক দিচ্ছি)।’
এক বর্ণনায় রয়েছে, রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম আবু জাহলের চাদর গলার কাছে ধরে বললেন, ‘দুর্ভোগ, তোমার জন্যে দুর্ভোগ। আবার দুর্ভোগ, তোমার জন্যে দুর্ভোগ।’
একথা শুনে আল্লাহর দুশমন আবু জাহল বললো, হে মোহাম্মদ, আমাকে হুমকি দিচ্ছো? খোদার কসম, তুমি এবং তোমার পরওয়ারদেগার আমার কিছুই করতে পারবে না। মক্কার উভয় পাহাড়ের মাঝে চলাচলকারীদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশি সন্মানিত মানুষ।
যাক, এ হুমকি সত্ত্বেও আবু জাহল তার নির্বুদ্ধিতামূলক আচরণ থেকে বিরত থাকেনি; বরং তার দুষ্কৃতি আরো বেড়েই গিয়েছিলো। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন আবু জাহল কোরায়শ সর্দারদের বললো, মোহাম্মদ কি তোমাদের সামনে নিজের চেহারা ধুলায় লুটিয়ে রাখে? কোরায়শ সর্দাররা বললো, হাঁ। আবু জাহল বললো, লাত এবং ওযযার শপথ, আমি যদি তাকে এ অবস্থায় দেখি, তবে তার ঘাড় ভেথে দেবো, তার চেহারা মাটিতে হেঁচড়াবো। এরপর একদিন সে রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামকে নামায আদায় করতে দেখে তাঁর ঘাড় মটকে দেয়ার জন্যে অগ্রসর হয়, কিন্তু সবাই দেখলো, আবু জাহল পেছন পায়ে ফিরে আসছে আর উভয় হাতে নিজেকে রক্ষা করছে। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আবুল হাকাম, তোমার কি হয়েছে? সে বললো, আমি দেখলাম, আমার এবং মোহাম্মদের মাঝখানে আূনের একটি পরিখা। সে পরিখায় ভীষণ দাউ দাউ করে আূন জ্বলছে। একথা শুনে রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম বললেন, ‘যদি সে আমার কাছে আসতো, তবে ফেরেশতা তার একেকটি অথ ছিঁড়ে নিয়ে যেতো।
রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের সাথে এ ধরনের যুলুম অত্যাচারপূর্ণ আচরণ করা হচ্ছিলো। মক্কার সাধারণ ও বিশিষ্ট মানুষদের মনে তাঁর স্বতন্ত ব্যাত্তিত্বের প্রভাব ও সন্মান মর্যাদা ছিলো এবং তাঁর প্রতি মক্কার সবচেয়ে সন্মানিত এবং প্রভাবশালী ব্য৩িত্ব আবু তালেবের সমর্থন সহায়তা ছিলো, তা সত্ত্বেও তাঁর ওপর এসব অত্যাচার করা হচ্ছিলো। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলমানদের, বিশেষত দুর্বল মুসলমানদের প্রতি অত্যাচার নির্যাতন ছিলো আরো ভয়াবহ, আরো নির্মম। প্রত্যেক গোত্র তাদের গোত্রের ইসলাম গ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রকারে শাস্তি দিচ্ছিলো। যারা মক্কার কোনো গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না তাদের ওপর বদমাশ উচ্ছৃংখল এবং নেতৃস্থানীয় লোকেরা এমন সব অত্যাচার নির্যাতন চালাতো, যেসব শুনলে শত মনের মানুষও তড়পাতে থাকে।
কোনো সম্ভন্ত সন্মানিত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে শুনলে আবু জাহল তাকে গালমন্দ ও অপমান করতো। এছাড়া সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করারও হুমকি দিতো। কোনো দুর্বল মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে প্রহার করতো এবং অন্যদেরও এ কাজে উৎসাহিত করতো।
হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তার চাচা তাকে খেজুরের চাটাইয়ের মধ্যে জড়িয়ে নীচে থেকে ধুঁয়া দিতো।’৩২
হযরত মোসয়াব ইবনে ওমায়র (রা.)-এর মা তার ইসলাম গ্রহণের খবর শোনার পর পানাহার বন্ধ করে তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। হযরত মোসয়াব ছোটো বেলা থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে আরাম-আয়েশে জীবন কাটিয়েছিলেন। পরিস্থিতির কঠোরতায় তিনি এমন অবস্থার স€§ুখীন হয়েছিলেন যাতে তাঁর গায়ের চামড়া এমনভাবে ছিলে যায়, যেমন সাপ খোলস ছাড়ে।৩৩
হযরত বেলাল (রা.) ছিলেন উমাইয়া ইবনে খালফ জুমাহীর ক্রীতদাস। ইসলাম গ্রহণের পর উমাইয়া হযরত বেলাল (রা.)-কে গলায় দড়ি বেঁধে উচ্ছৃংখল বালকদের হাতে তুলে দিতো। তারা তাকে মক্কার পাহাড়সমূহে ঘোরাতো। এতে তার গলায় দড়ির দাগ পড়ে যেতো। উমাইয়া নিজেও তাকে বেঁধে নির্মম প্রহারে জর্জরিত করতো। এরপর জোর করে উত্তপ্ত বালির ওপর বসিয়ে রাখতো। এ সময় তাকে খাদ্য পানি না দিয়ে অভু৩ পিপাসার্ত অবস্থায় রাখা হতো। কখনো কখনো ভর দুপুরের উত্তপ্ত রোদে মরু বালুকার ওপর শুইয়ে বুকের ওপর ভারি পাথর চাপা দিয়ে রাখতো। এ সময় সে বলতো, আল্লাহর কসম, তোমার মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত এভাবেই ফেলে রাখা হবে। তবে বাঁচতে চাইলে মোহা€§দের পথ ছাড়ো, কিন্তু তিনি এমনি কষ্টকর অবস্থায়ও বলতেন ‘আহাদ, আহাদ’। একদিন তার ওপর এরকম নির্যাতন চলতে দেখে হযরত আবু বকর (রা.) খুবই ব্যথিত হন। তিনি হযরত বেলাল (রা.)-কে একটি কালো ক্রীতদাসের পরিবর্তে মতান্তরে দুশো দেরহাম রূপার পরিবর্তে ক্রয় করে মু৩ি দেন।৩৪
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা.) ছিলেন বনু মাখযুমের ক্রীতদাস। তিনি এবং তার পিতামাতা ইসলাম গ্রহণের পর তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন শুরু হয়। আবু জাহলের নেতৃত্বে মোশরেকরা তাদের উত্তপ্ত রোদে বালুকাময় প্রান্তরে শুইয়ে রেখে কষ্ট দিতো। একবার তাদের এভাবে শাস্তি দেয়া হচ্ছিলো। এ সময় নবী করীম রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘হে ইয়াসের পরিবার, ধৈর্য ধারণ করো, তোমাদের ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।’
অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অবশেষে হযরত ইয়াসের (রা.) ইন্তেকাল করেন। তার স্ত্রী, হযরত আম্মারের মা হযরত ছুমাইয়া (রা.)-এর লথাস্থানে দৃর্বৃত্ত আবু জাহল বর্শা নিক্ষেপ করে। এতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম মহিলা শহীদ। হযরত আম্মারের ওপর তখনো অব্যাহতভাবে অত্যাচার চালানো হচ্ছিলো। তাকে কখনো উত্তপ্ত বালুকার ওপর শুইয়ে রাখা হতো, কখনো বুকের ওপর ভারি পাথর চাপা দেয়া হতো, কখনো পানিতে ডুবানো হতো। মোশরেকরা তাকে বলতো, যতোক্ষণ পর্যন্ত তুমি মোহাম্মদকে গালি না দেবে, লাত ওযযা সম্পর্কে প্রশংসনীয় কথা না বলবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমাকে ছাড়তে পারি না। হযরত আত্নার (রা.) বাধ্য হয়ে তাদের কথা মেনে নেন। এরপর কাঁদতে কাঁদতে রসূলুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লামের কাছে হাযির হয়ে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করেন। তখন পবিত্র কোরআনের এ আয়াত নাযিল হয়, ‘কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরীর জন্যে হৃদয় উন্মু৩ রাখলে তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তার জন্যে আছে কঠোর শাস্তি, কিন্তু তার জন্যে নয়, যাকে কুফরীর জন্যে বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত থাকে।
হযরত ফোকায়হ, যার নাম ছিলো আফলাহ। তিনি বনী আবদুর দার গোত্রের গোলাম ছিলেন। তার এ মালিকেরা পায়ে রশি বেঁধে তাকে যমীনের ওপর হেঁচড়াতো।
হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত (রা.) খোযায়া গোত্রের উম্মে আনমার নামক এক মহিলার ক্রীতদাস ছিলেন। মোশরেকরা তার ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালাতো, মাথার চুল টেনে তুলে ফেলতো, ঘাড় মটকে দিতো। কয়েকবার তাকে জ্বলন্ত কয়লার ওপরে শুইয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিলো, যাতে তিনি ওঠতে না পারেন।
যিন্নীরাহ,৩৮ নাহদিয়া এবং তাদের কন্যা উম্মে ওবায়স- সবাই ছিলেন ক্রীতদাসী। তারা ইসলাম গ্রহণ করে মোশরেকদের হাতে কঠোর শাস্তি ভোগ করেন, যার কিছু দৃষ্টান্ত ওপরে তুলে ধরা হয়েছে। বনু আদী গোত্রের একটি পরিবার বনু মোয়াম্মেলের এক দাসী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) ছিলেন আদী গোত্র সংশ্লিষ্ট। তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি সে দাসীকে প্রহার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বলতেন, তোর প্রতি কোনো মানবিকতার কারণে নয়; বরং নিজে ক্লান্ত হয়েই তোকে ছেড়ে দিয়েছি। পরিশেষে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) হযরত বেলাল এবং আমের ইবনে ফোহায়রার মতো এসব দাসীকেও ক্রয় করে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
মোশরেকরা ইসলাম গ্রহণকারীদের শাস্তি দেয়ার এক বীভৎস উপায় অবলম্বন করেছিলো। তা হলো, তারা কোনো কোনো সাহাবীকে উট এবং গাভীর কাঁচা চামড়ার ভেতর জড়িয়ে রোদে ফেলে রাখতো। কাউকে কাউকে লোহার বর্ম পরিয়ে জ্বলন্ত পাথরের ওপর শুইয়ে রাখতো। আল্লাহর পথে যারা অত্যাচার নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলো, প্রকৃতপক্ষে তাদের তালিকা খুবই দীর্ঘ এবং বড়োই বেদনাদায়ক।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY